Loading...

‘নারী নির্যাতন’ - সিনেমার গল্পে নতুন ধারায় মিল-অমিল

| Updated: August 28, 2022 18:32:44


ছবি: আইএমডিবি ছবি: আইএমডিবি

গৃহ নির্যাতন ও সম্পর্কের তিক্ততা মানুষকে নানাভাবে নাড়া দেয়, ভাবিয়ে তোলে এবং সে অনুযায়ী পদেক্ষপ নেয়ায়। ডারলিংস সিনেমায় বদরু বেছে নেয় স্বামীকে অপহরণ করার পন্থা, আবার থাপ্পাড়ে দেখি আইনী লড়াইয়ে যাওয়া। গল্প ভেদে সিনেমায় গৃহ নির্যাতন উঠে এসেছে নানাভাবে।

এর জন্য যেমন তৈরি হয়েছে গুরুগম্ভীর তথা চিন্তার উদ্রেক করে- এমন সিনেমা, আবার কোনো ক্ষেত্রে নেয়া হয়েছে হাস্যরসের মাধ্যমে দর্শক-সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা। আজকের লেখা এই ধারার সিনেমাগুলো নিয়েই।

প্রোভোক্ড (২০০৬)

পরিবারের সম্মতিতে বিয়ে হয় কিরণজিৎ আর নবীনের। বিয়ের পর দুজনেই ইংল্যান্ডে পাড়ি দেন। তাদের বৈবাহিক জীবনের শুরুর দিক ভালোই যাচ্ছিলো।‌ তবে কিছুদিন যেতেই নবীনের ভিন্ন সত্ত্বা দেখতে পান কিরণ।

তাকে ক্রমাগত গালিগালাজ করা, গায়ে হাত তোলা ছিল নবীনের প্রতিদিনের ঘটনা। তো একদিন আর সহ্য করতে না পেরে প্রতিবাদ করে কিরণ। ঘাত-প্রতিঘাতে দুর্ঘটনায় মারা যায় নবীন। কিরণকে দেয়া হয় আমরণ কারাবরণের শাস্তি।

সামাজিক সংগঠন ও  ব্রিটেনের আদালতে আইনী লড়াইয়ের মাধ্যমে অবশেষে ন্যায় বিচার পান কিরণজিৎ। প্রোভোক্ড বাস্তব ঘটনার ওপরেই নির্মিত একটি সিনেমা যেখানে স্পষ্ট বলে দেয়া হয় যে গৃহ নির্যাতন এমন কিছু নয় যা শুধু গরীব পরিবারগুলোতেই সীমাবদ্ধ। শহরের একেবারেই সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেনীর নারীরাও এর শিকার হিয়ে থাকেন। প্রোভোক্ড সেই সব নারীদের কথাই বলে আরো সূক্ষ্মভাবে।

সাত খুন মাফ (২০১১) 

বিশাল ভারদওয়াজের সিনেমা সাত খুন মাফ। অ্যাঙ্গলো-ইন্ডিয়ান লেখক রাসকিন বন্ডের ছোট গল্প সুজানাস সেভেন হাজব্যান্ডসের ওপর সিনেমাটি নির্মিত। 

সত্যিকারের ভালোবাসার সন্ধানে থাকা একজন নারী প্রতিবার কোনো পুরুষের ওপর ভরসা করে প্রেমে পড়ে। তারপর বিয়েতে গড়ায়। কিন্তু প্রতিবারেই তার আশা ভঙ্গ হয়। 

সাতজনের ছয়জনেরই কোনো না কোনো সমস্যা থাকে। প্রথমজন সন্দেহপ্রবণ, দ্বিতীয়জন সবসময় নেশাগ্রস্ত থাকে, তৃতীয়জন যৌনাচরণে অত্যাচার করে আনন্দ পায়, আরেকজন লোভী। এরকম সবাই কোনো না কোনো ভাবে তাকে কষ্ট দেয়।

সিনেমায় ভিন্নভাবে হলেও পুরুষতন্ত্রের নানারূপ দেখানো হয়েছে, আর নারী কীভাবে এই অন্যায়, অত্যাচার নিপীড়নকে সাথে নিয়ে যুদ্ধ করে তা দেখানো হয়েছে। যদিও অন্যসব সিনেমা থেকে সাত খুন মাফ ভিন্ন এ জায়গায় যে এখানে কোনো ধরনের আইনী সুরাহার বদলে কষ্টের বাধ ভাঙ্গা স্বরূপ অত্যাচারীর হত্যাকেই দেখানো হয়েছে।

তবে পুরুষতন্ত্রের নানারূপ তথা মানুষের নানা স্বভাব, অপরাধ ও ধরন গভীরভাবেই তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে সিনেমাটিতে।

পারচড (২০১৫)

পারচড সিনেমায় সমাজের একাধিক সমস্যাকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করা হয়। বাল্যবিবাহ, বৈবাহিক ধর্ষণ, গৃহ নির্যাতন, যৌনতা ছিল এই সিনেমার উপজীব্য বিষয়। 

গুজরাটের মরু এলাকার অনগ্রসর সমাজের চিত্র এই পারচ্ড সিনেমা। বাল্যবিবাহ, যৌতুক আর গৃহ নির্যাতনের বিষয় এর আগেও‌ নানাভাবে, নানা আঙ্গিকে সিনেমার পর্দায় জায়গা পেয়েছে। তবে বৈবাহিক ধর্ষণ, সন্তান জন্ম না হওয়ার স্ত্রীর দোষ এবং সেকারণে তার ওপর সমাজ ও পরিবারের বিদ্বেষী দৃষ্টি ভারত তথা উপমহাদেশের মানুষের জন্য নতুন।

বিয়ে মানেই যৌনতার প্রকাশ আর সঙ্গম স্ত্রীর অনিচ্ছা সত্ত্বেও যখন - তখন ইচ্ছে স্বাধীন করা যায় এই প্রচলিত ধারণা ভেঙ্গে দেয় এই সিনেমা। 

আমাদের‌ চারপাশে এসব ঘটনা অহরহ ঘটে। তার দেয়ালের আড়ালে প্রতিদিন কেউ না কেউ নির্যাতনের শিকার হয়, বঞ্চনার শিকার হয় তাও মুখ বুজে সয়ে যায় সমাজের এক বায়বীয় ‘সম্মানের’ চাদরে। 

পারচড এই সমাজকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। মরুভূমির রুক্ষতা যে সমাজেরই রুক্ষতা আর চারজন নারীর জীবন যে আত্মসম্মান ও অস্তিত্বের লড়াই তা-ই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এই সিনেমা।

থাপ্পাড় (২০২০)

গৃহ নির্যাতনের মতো সামাজিক সমস্যা গুরুগম্ভীরভাবে বড় পর্দায় দেখানোর যে ট্রেন্ড বর্তমানে যে চালু হয়েছে তার শুরু করার জন্য সংসার করতেই হয় এই সিনেমাকে। কেননা একটি জটিল সমস্যাকে খুব কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করেছে এটি। 

সিনেমায় মূল চরিত্রে অভিনয় করছেন যিনি তিনি এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাছে একজন আদর্শ স্ত্রী। তার মাঝে ঘরের দেখ-ভাল করার যাবতীয় গুণ আছে যা একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজ নারীর মাঝে দেখতে চায়। 

মদ্যপ অবস্থায় একদিন তার স্বামী তাকে চড় মারে। যেহেতু সমাজ পুরুষতান্ত্রিক, যেখানে নারীর গায়ে হাত তোলা একটি স্বাভাবিক ঘটনা সেখানে এই‌ চড় খুবই সাধারণ। আপনাদের মনে খুব সোজা একটি প্রশ্ন জাগতে পারে যে একটি চড়ই তো মেরেছে, এর জন্য বিচ্ছেদ কেন? 

উত্তরসূরুপ আপনারা হয়তো প্রায়ই শুনেছেন যে দাম্পত্য জীবনে এরকম একটু হয়ই, অর্থাৎ ইনিয়ে-বিনিয়ে গায়ে হাত তোলা, বকাঝকা করাকে যুক্তিসঙ্গত বলে দাবি করা।  

থাপ্পাড় ঠিক এই প্রশ্ন এবং এই প্রশ্নের যে গৎবাধা উত্তর ঠিক এখানেই আঘাত করে। দর্শককে ভাবায় আর বোঝাতে শিখায় যে এটি কোনো চড় নয় বরং যুগ যুগ ধরে চলে আসা একটি অসুস্থ রীতি যা প্রায় প্রতিটি নারীই এড়িয়ে যায়।

সিনেমায় স্বামীর মায়ের চরিত্রকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে যে কেন তিনি এতো কিছুর পরও চুপটি মেরে বসেছিলেন?

ডার্লিংস (২০২২)

এরই ধারাবাহিকতায় হালে মুক্তি পাওয়া বিখ্যাত সিনেমা ডার্লিংস। এই সিনেমাতেও উঠে এসেছে গৃহ নির্যাতনের বাস্তবতা। খাবারের লবণ কম হলেও অত্যাচার, আবার পরের দিন সকালে ফুল দিয়ে স্ত্রীকে মানানো। তারপর‌ স্ত্রী ক্ষমা করলে পুনরায় একইরকম ব্যবহার করা। 

অনেকক্ষেত্রে ভালোবাসার কথা বলে এই ধরনের তিক্ত আচরণ করে থাকে পুরুষ। জানায় যে "সে ভালোবাসে," "সে মদ্যপ অবস্থায় ছিল," "বুঝতে পারেনি‌" ওই একই নানান অজুহাত আর বাহানায় তার আচরণকে বৈধতা দেয়। ডার্লিংসে ঠিক এমনটাই দেখানো হয়েছে। তবে গতানুগতিক সিনেমা থেকে একটি জায়গায় ব্যতিক্রম থেকে যায় সিনেমাটি, আর তা হলো কমেডি। এছাড়া ভালো ও মন্দের মাঝে পার্থক্যও বলে দেয় ডার্লিংস, যা এটিকে করে অনন্য।

নারী নির্যাতনের মতো একটি বাস্তব সত্যকে খুব সহজে হাস্যরসাত্মভাবে ফুটিয়ে তুলেছে সিনেমাটি। যাদের ওপর সত্যিকার অর্থেই এরকম জুলুম-নির্যাতন হয়ে থাকে তারা দেখলেই বা কি ভাববে! সাত খুন মাফের মতো কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার নীতি কতটা ঠিক তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। যদিও গল্প বলার ধরন কমেডি হওয়ায় এটিকে ডার্ক কমেডি (কমেডির মাধ্যমে বাস্তবতা তুলে ধরা) বলছেন অনেকে। 

 

মোঃ ইমরান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।

imran.tweets@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic