কাজী নজরুল ইসলামের জীবনী পড়ার সময় এই প্রজন্মের পরিচয় লেটোগান- শব্দটির সাথে। পিতার মৃত্যুর পর নজরুল সংসার চালাতে মাত্র দশ বছর বয়সে লেটোর দলে যোগ দিয়েছিলেন।
লেটোগান একপ্রকার আসর সঙ্গীত। রাঢ় বাংলার আবহমান লোকসংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। অধুনা পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান, বীরভূম অঞ্চলে এর উৎপত্তি। এটি একপ্রকার যাত্রাপালার গান। পালা আকারে রচিত হয় এবং বাদকদলের বাজনার তালে তালে কুশীলবগণ নৃত্য ও অভিনয়ের মাধ্যমে পরিবেশন করেন।
লেটোগানের ইতিহাস কয়েকশ বছরের পুরনো। ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে রাঢ় অঞ্চলে এটির উৎপত্তি। তবে উনবিংশ ও বিংশ শতাব্দীতে লেটোগান জনপ্রিয়তার শীর্ষে আরোহণ করে। শুরুর দিকে পৌরাণিক আখ্যান উপাখ্যান, রাজা-রাজড়ার যুদ্ধ-বিগ্রহের কাহিনীকে কেন্দ্র করে লেটোর পালাগুলো রচিত হত। পরবর্তীতে পালারচয়িতাগণ সমসাময়িক সামাজিক জীবন, প্রথা, আচার-অনুষ্ঠান, রঙ্গ-রস থেকে পালা রচনা শুরু করেন।
লেটোগান অনেকটা কবিগানের মতো করে গাওয়া হয়। দু’টো দল মুখোমুখি বসে পালা পরিবেশনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতা করে। দলের প্রধানকে বলা হত ‘গোদা কবি'। তার নামেই দল পরিচিতি পায়। সাধারণত তিনিই দলের জন্য পালা রচনা করেন এবং সার্বিক নির্দেশনা দেন। কয়েকজন কণ্ঠশিল্পী ও বাজনাদার নিয়ে গোদা কবি দল গঠন করেন। লেটোর আসরে ছেলেরাই মেয়ে সেজে মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করে। সবচেয়ে সুদর্শন ছেলেকে রাজকন্যা বা রাজরানির চরিত্র প্রদান করা হয়। তার নাম ‘রানি'। অন্যান্য নারী চরিত্রে অভিনয় করা ছেলেদের বলা হয় ‘বাই’, ‘ছোকরা’ বা ‘রাঢ়’। রাজা,মন্ত্রী, সেনাপতি ইত্যাদি চরিত্রে অভিনয়কারী কুশীলবগণকে বলা হয় ‘পাঠক'। সঙ সেজে নাচ, গান, অভিনয়ের মাধ্যমে যারা শ্রোতাদের হাসাত তারা ‘সঙগাল'।
লেটোগান শুরু হয় বন্দনা দিয়ে। একজন গোদা কবি তার অংশের গীত শেষ করার আগে অপর গোদা কবির কাছে একটি প্রশ্ন রেখে যান। পরেরজন উঠে গীত ও অভিনয়ের মাধ্যমে সে প্রশ্নের উত্তর দেন। কাজী নজরুল ইসলাম লেটোর দলে প্রথমে পালা লেখার কাজ করতেন। জানা যায়, পরবর্তীতে তিনি সঙগাল হয়েও মঞ্চে নেমেছিলেন।
নজরুলের লেটোগানের গুরু ছিলেন কাজী বজলে করীম। তার কাছে শিক্ষালাভ করে নজরুল পালা রচনা, সুরারোপ এবং বাদ্যযন্ত্রে সিদ্ধহস্ত হয়ে ওঠেন। বজলে করীম একান্তে নজরুলকে লেটোর নৃত্য-গীত ও অভিনয় প্রশিক্ষণ দিতেন। বজলে করীম ছাড়াও নজরুলের লেটোগানের গুরু ছিলেন কবি বাসুদেব ও শেখ চকোর। এঁদের কাছেও নজরুলের শিক্ষা পরিপুষ্টতা লাভ করেছিল। নজরুল পুরাণ, ধর্ম, সংস্কৃতের জ্ঞান লেটোর দল থেকেই পেয়েছিলেন। লেটোগানের প্রভাব নজরুলের পরবর্তী সাহিত্য-গীতে গভীরভাবে পরিলক্ষিত হয়েছে। তিনি স্বরবৃত্ত ছন্দ ও ঝুমুর তালের সুন্দর ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহার লেটোর দল থেকে শিখেছিলেন।
নজরুলের সব লেটোগান পাওয়া না গেলেও কিছু কিছু এখনও রাঢ় অঞ্চলে প্রচলিত। নজরুল রচিত লেটোগানগুলো পরিচিত হয়েছিল ‘দুখুমিয়ার গান' হিসেবে। লেটোগান রচনায় মুন্সিয়ানা দেখানোর জন্য তিনি লাভ করেছিলেন ‘ভ্রমর কবি' উপাধি। তার গুরু তাকে আদর করে ‘ব্যাঙাচি' ডাকতেন আর বলতেন, ‘এই ব্যাঙাচি বড় হয়ে মস্তবড় সাপ হবে'। নজরুল রচিত লেটোপালার মধ্যে চাষার সঙ, রাজপুত্রের সঙ, আকবর বাদশা, শকুনি বধ, দাতা কর্ণ, রাজপুত্র কবি কালিদাস অন্যতম।
এই যুগে লেটোগানকে যিনি বাঁচিয়ে রেখেছেন, বলা যায় এই শতাব্দীর লেটোগানের একচ্ছত্র সম্রাট তিনি পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম জেলার মহম্মদবাজারের বাসিন্দা শ্রী হরকুমার গুপ্ত। দারিদ্র্যের চরম কশাঘাত সহ্য করেও বৃদ্ধ হরকুমার এখনও তার লেটোর দল নিয়ে গ্রামান্তরে ছুটে বেড়ান। তার লেটোর দলে আসার গল্প একদম নজরুলের সাথে মিলে যায়। ১২-১৩ বছর বয়সে পকেটে এক টাকা নিয়ে বাড়ি থেকে কাজের সন্ধানে বেড়িয়ে পড়েন। এদিক ওদিক ঘোরাঘুরির পরে লেটোর দলে এসে ভিড়ে যান। আর ফেরেননি। সম্প্রতি পরিচালক অনীক দত্তের ‘অপরাজিত’ ছবিতে হরকুমার গুপ্ত ইন্দির ঠাকরুণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন।
মেহেদি হাসান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।
mahedi.bcpsc.2016@gmail.com
