তিব্বতের রাজধানী লাসাকে বলা হয় নিষিদ্ধ নগরী। বইয়ের পাতায় এই লাইনটি বহুবার পড়া হলেও হয়তো এমন অ্যাখার পেছনের কারণটা অনেকেরই অজানা। ১৬৮ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই শহরটিকে কেন নিষিদ্ধ নগরী বলা হয়?
তিব্বতের রাজধানী হচ্ছে লাসা। লাসা শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘দ্য ল্যান্ড অফ দ্য গডস’ অর্থাৎ ‘ঈশ্বরের স্থান’। এই অঞ্চলটিকে পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচুতম শহরও বলা হয় কারণ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১১,৯৭৫ ফিট উঁচুতে এই শহরটি অবস্থিত।এতো উঁচুতে অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলের বাতাসে অক্সিজেনের মাত্রা অনেক কম।
প্রায় ১৩০০ বছর আগে রাজা সংস্তান গ্যাম্পোর শাসনামলে লাসাকে একটি শহর হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
সেই নবম দশক থেকে এই শহরটি একটি পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে সর্বজন পরিচিত। পুরো শহর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য মঠ ও মন্দির। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য লাসা একটি পরম আরাধ্য স্থান।
লাসার অধিবাসীরা বেশ শান্তিপ্রিয় মানুষ এবং তারা নিজেদের সম্পর্কে অন্যকে জানাতে একটু কমই পছন্দ করে। বাইরের লোকদের এই অঞ্চলে প্রবেশাধিকার ছিল একদম নিষিদ্ধ। আর এই কারণে বহির্বেশ্বের সাথে এই নগরীর পরিচয় ঘটেছে বেশ দেরিতে। পাহাড় ঘেরা এই দুর্গম অঞ্চল ও বৈরি আবহাওয়া তাদের জীবনযাত্রায় খানিকটা ভিন্নতা এনে দিয়েছে।
১৯৫১ সালে চীনা কমিউনিস্টরা লাসার দখল নিয়ে নেয় এবং ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত তারা এখানে স্বায়ত্তশাসন কায়েম করে। স্বাধীনতাকামীদের বিভিন্ন আন্দোলন ও দাঙ্গার কারণে এই অঞ্চলে অন্যান্য অঞ্চল বা দেশের লোকদের আনাগোনার ব্যাপারে কড়া বিধিনিষেধ জারি করা আছে।
এমন একটি পুণ্যস্থানকে তবে কেন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হলো?
মূলত ধর্মীয় অনুভবের জায়গা থেকে এই নগরীটিকে সমগ্র বিশ্বের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে কারণ এখানে রয়েছে অসংখ্য ধর্মীয় স্থাপনা। বৌদ্ধ ধর্মগুরুদের আবাসস্থল এই লাসা নগরী। সাগ-ল্যাগ-খাং ও ক্লু-খাং, প্রাচীন এই মন্দির দুটিও এখানে অবস্থিত। শীতকালীন অবকাশ যাপনের জন্য দালাই লামা এখানে আসেন। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের ধর্মাচারে মুখরিত হয়ে থাকে এই স্থানটি। আর এইসব কারণে জনসাধারণের জন্য নিষিদ্ধ হিসেবে গণ্য করা হয় লাসা নগরীকে।
লাসা নগরীর দর্শনীয় কিছু স্থান
পোটালা প্রাসাদ

ছবি: দা ল্যান্ড অব স্নোজ
লাসার সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও দর্শনীয় স্থান এই পোটালা প্রাসাদ। এটি ইউনেস্কোর ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ লিস্টে’ তালিকাভুক্ত। এই স্থানটি চমৎকার স্থাপত্য শৈলী ও মনোরম পরিবেশের এক অনন্য মিশেল। ১৬৪৫ সালে পঞ্চম দালাই লামা এই প্রাসাদটি নির্মাণ করেন। এই প্রাসাদটি দালাই লামার শীতকালীন আবাসস্থল।
এটি একটি তেরতলা বিশিষ্ট প্রাসাদ। এতে রয়েছে ১০০০ টি কক্ষ, ২০০,০০০ মূর্তি ও ১০,০০০ টি মঠ।
জোখাং মন্দির

ছবি: তিবেতপিডিয়া
বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ তীর্থস্থান। কারণ এখানে শাক্যমুণি বুদ্ধের মূর্তি রয়েছে।
এর মূল ভবনটি চারতলা সমান উঁচু। এই মন্দিরের চূড়া স্বর্ণ দিয়ে নির্মিত। এটি ইউনেস্কোর একটি ‘ওয়ার্ল্ড কালচারাল হেরিটেজ’ হিসেবে স্বীকৃত।
এই মন্দিরের সবচেয়ে প্রাচীন মূর্তিটি প্রায় ২,৫০০ বছর পুরনো এবং স্বয়ং বুদ্ধ এর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
সেরা আশ্রম
ছবি: স্নোলায়ন ট্যুরস
লাসার সবচেয়ে বড় ও পুরনো আশ্রম হচ্ছে এই সেরা আশ্রম। একসময় প্রায় ৫,০০০ এর বেশি বৌদ্ধ ভিক্ষু এখানে বাস করতেন। তবে বর্তমানে এই সংখ্যা এসে কয়েকশোতে দাঁড়িয়েছে।
ডেপুং আশ্রম

ছবি: ডেপুং আশ্রম
পোটালা মন্দির নির্মাণের পূর্বে এটিই ছিল দালাই লামাদের আবাসস্থল। এটি তিব্বতের সবচেয়ে বড় আশ্রম। যখন তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্মের জাগরণ শুরু হয়, সেইসময় প্রায় ১০,০০০ হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষু এখানে বাস করতেন। বর্তমানে এখানে প্রায় ৬০০ জনের মতো বসবাস করেন।
নেচুং ওরাকল মন্দির
এই মন্দিরের প্রধান পাদ্রী বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে দালাই লামাকে পরামর্শ প্রদান করে থাকেন। তাই যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের পূর্বে দালাই লামা এখানে আসেন।
নরবুলিংকা
এটি দালাই লামার গ্রীষ্মকালীন আবাস। অন্যান্য আশ্রমের তুলনায় এটি খানিকটা ভিন্ন ধাঁচের। একটি বিশাল পার্কের মাঝে এটি নির্মিত হয়েছে এবং এর চারপাশে বেশকিছু প্রাসাদ, অসংখ্য গাছপালা, ফুল ও একটি হ্রদ রয়েছে।
একসময় লাসা এমনকি তিব্বতে ভ্রমণের কোনো সুযোগ বা অনুমতি কোনোটাই ছিল না। তবে এখন চীন সরকারের কাছ থেকে ‘তিব্বত ট্রাভেল পারমিট’ নিয়ে ট্রেনে বা প্লেনে করে তিব্বত ভ্রমণের সুযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু ভ্রমণকালীন সময়ে সর্বদা একজন লাইসেন্সধারী ট্যুর গাইড সাথে থাকে এবং বিভিন্ন নিয়মকানুন মেনে চলতে হয়।
