Loading...

রেইনিসফিয়ারা: আইসল্যান্ডের কালো বালির সমুদ্রসৈকত

| Updated: September 26, 2022 20:15:45


ছবি: দা ওয়ার্ল্ড ইজ আ বুক ছবি: দা ওয়ার্ল্ড ইজ আ বুক

প্রকৃতি নিজেই এক চমৎকার ক্যানভাস। হরেক রঙের অপূর্ব সব চিত্রপট আঁকা রয়েছে এই প্রকৃতির বুকে। ঘন সবুজ শ্যামল ছায়ায় চোখ দুটো কখনো তৃপ্তি খুঁজে পায়, তো আবার কখনো কৃষ্ণ কালো সমুদ্র সৈকতে চোখ যেন বিস্ময়কে আলিঙ্গন করে নেয়। সাদা বালির সমুদ্র সৈকত সকলের কাছে পরিচিত হলেও কালো বালির সমুদ্র সৈকতের সাথে হয়তো অনেকেরই পরিচয় নেই। তবে আজ পরিচিত হওয়া যাক।

রেইনিসফিয়ারা, এটি কালো বালির সমুদ্র সৈকত যা কিনা বিশ্বের সৌন্দর্যমন্ডিত সেরা দশটি সমুদ্র সৈকতের মধ্যে অন্যতম। আইসল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে এবং রাজধানী শহর রেইকিয়াভিক থেকে প্রায় ১৮০ কি.মি. দূরে এই সমুদ্র সৈকতটি অবস্থিত। ১৯৯১ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক রেইনিসফিয়ারাকে বিশ্বের সেরা দশ চোখ জুড়ানো সমুদ্র সৈকতের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

বালির রং কালো কেন?

আইসল্যান্ড এমন একটি দেশ যেখানে প্রচুর সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে। রেইনিসফিয়ারা মূলত আগ্নেয়গিরির উদগ্রীত লাভা থেকে সৃষ্টি হয়েছে। আরো বিস্তারিতভাবে বললে প্রক্রিয়াটি অনেকটা এরকম-ফুটন্ত লাভা ধীরে ধীরে সৈকতের তীরে আসলে তা ঠান্ডা হতে শুরু করে এবং সমুদ্রের পানির স্পর্শে তা কঠিন আকার ধারণ করে।

এই অবস্থায় সেগুলো দেখতে খানিকটা শিলা পাথরের মতো। কালো শিলা পাথরগুলো সমুদ্রের ঢেউয়ের আঘাতে ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে প্রথমে নুড়িপাথরে পরিণত হয় এবং তারপর আরো চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে কালো বালুতে পরিণত হয়।

রেইনিসফিয়ারার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

কালো সমুদ্র সৈকত ছাড়াও আরো কিছু দর্শনীয় রয়েছে যা চোখ ও মন উভয়কেই প্রশান্তি দিবে। প্রথমেই বলতে হয় পাখির কথা। এখানে প্রচুর সিবার্ড রয়েছে বিশেষত মে থেকে আগস্টের মধ্যে এখানে ভ্রমণ করলে সৈকত থেকেই দেখা মিলবে ‘পাফিনপাখির।

আগ্নেয়গিরির লাভা থেকে তৈরি অসংখ্য বেসল্ট পাথরের খাঁড়া ও ছয়কোণা স্তম্ভ, সুউচ্চ খাদ এবং গুহার দেখা মিলবে। এই বেসল্টের খাঁড়া খাঁড়া স্তম্ভগুলো নিয়ে আইসল্যান্ডের উপকথায় একটি গল্প রয়েছে।

গল্পটা অনেকটা এরকম-কোনো এক যুদ্ধের সময় কিছু দৈত্য তিন মাস্তুলের একটি জাহাজ সাগরের বুক থেকে টেনে তীরের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিল। তবে সে যাত্রায় তাদের পথ পেরুতে বেশ সময় লাগছিল। রাত পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করে কিন্তু দৈত্যগুলো তখনও জাহাজটি নিয়ে তীরে পৌঁছতে পারেনি। ভোরের আলো তাদের শরীরে পড়ার সাথে সাথে তারা যে অবস্থায় যেখানে ছিল, সেখানেই পাথরে পরিণত হয়। আইসল্যান্ডবাসীরা মনে করে, দাঁড়িয়ে থাকা এই বিশাল শিলাগুলোই সেই দৈত্য।

পাহাড়ের পথ বেয়ে রেইনিসফিয়ারার দিকে যাওয়ার সময় পাহাড়ের বুক থেকে অনেকেই নাকি কান্না এবং আর্তনাদের আওয়াজ শুনতে পান এখনও। আইসল্যান্ডবাসীরা ধারণা করেন যে, দৈত্যরা আজও ফিরে যাওয়ার জন্য এইভাবে আর্তনাদ করে।

এখানে সবসময় আটলান্টিক মহাসাগরের নীল জলের তীব্র গর্জন শোনা যায় যেনো আগন্তুককে কোনো হুঁশিয়ারি বার্তা জানান দিচ্ছে।

এখানকার আবহাওয়া প্রায়ই মেঘলা থাকে এবং বৃষ্টি হতেই থাকে যার ফলে সৈকতের বালু সবসময় ভেজা থাকে। তাই পিচ ঢালা রাস্তা আর এই সৈকতের বালুর মধ্যে খুব বিস্তর একটা ফারাক নেই।

তবে হ্যাঁ, শীতকালে আবার এখানে তুষারপাত হয়। কালো বালুর উপর তুষারকণাগুলোকে দেখতে ঠিক যেনো পোস্তদানার মতো মনে হয়। 

রেইনিসফিয়ারায় লুকিয়ে থাকা যে বিপদগুলো একজন পর্যটককে যমদুয়ারে পাঠিয়ে দিতে পারে

অনিন্দ্য সুন্দর এই সমুদ্র সৈকত ভ্রমণে একজন পর্যটককে সবসময় সাবধান থাকতে হয় এবং সজাগ দৃষ্টিতে সচেতন থাকতে হয়। একটু অসাবধান হলেই মৃত্যু হতে পারে।

আটলান্টিক মহাসাগরের এই অংশে এক ধরনের ঢেউয়ের সৃষ্টি হয় যা ‘স্নিকার ওয়েভহিসেবে পরিচিত, অনেকে ‘কিং অব ওয়েভওবলে থাকেন। এটিকে এক ধরনের ঘুমন্ত কিন্তু প্রচন্ড বেগবান ঢেউয়ের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। ঘুমন্ত কারণ এই ঢেউ কখন যে সৃষ্টি হবে তা বলা মুশকিল।

ছোট ছোট অনেকগুলো ঢেউ একসাথে হয়ে বিশাল ও প্রচন্ড শক্তিশালী ঢেউয়ে পরিণত হয়ে সুমদ্র সৈকতে আছড়ে পড়ে এবং সেখানে থাকা মানুষ বা অন্য যেকোনো কিছুকে মুহূর্তে স্রোতের সাথে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সবকিছু একদম চোখের নিমিষে ঘটে যায় তাই কারো পক্ষে সাহায্য করা একদম অসম্ভব।

তাই অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ এড়াতে নিজেকে সবসময় সতর্ক থাকতে হবে। যারা এই সমুদ্র সৈকত ভ্রমণে আসেন তাদেরকে বিভিন্ন সতর্কবার্তা প্রদানের পাশাপাশি সমুদ্র থেকে সবসময় কমপক্ষে ১০০ ফিট দূরে থাকতে বলা হয়। শুধু তাই নয়, এই সৈকতে থাকাকালীন সমুদ্রের দিকে পিঠ ফিরিয়ে থাকতে নিষেধ করা হয় যাতে আসন্ন ঢেউ সম্পর্কে সতর্ক থাকা যায়।

 

শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি  অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।

zabin860@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic