রাশিয়ার শুরু করা যুদ্ধ বন্ধের পথ এবং ইউরোপের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সুরক্ষা নিশ্চিতে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছেন জাতিসংঘের মহাসচিব এবং তুরস্ক ও ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্টরা। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
জাপোরিঝিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে নতুন করে গোলাবর্ষণ নিয়ে মস্কো ও কিইভের একে অপরকে দোষারোপের মধ্যে বৃহস্পতিবার এ তিনজনের বৈঠক হয় বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
লভিভে বৈঠক শেষে জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, তিনি জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক কেন্দ্রের পরিস্থিতি নিয়ে ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন।
“জাপোরিঝিয়ার যে কোনো সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি হবে আত্মহত্যার শামিল,” সতর্ক করে বলেছেন তিনি। কেন্দ্রটির আশপাশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম ও সেনা সরিয়ে নেওয়ারও আহ্বান জানিয়েছেন জাতিসংঘ মহাসচিব।
“কেন্দ্রটিকে কোনো সামরিক অভিযানের অংশ হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। বরঞ্চ এটিকে ফের পুরোপুরি বেসামরিক স্থাপনায় রূপান্তর এবং ওই এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিতে চুক্তি করাটা জরুরি হয়ে পড়েছে,” বলেছেন গুতেরেস।
২৪ ফেব্রুয়ারি ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’শুরুর পরপরই জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দখলে নেওয়া রশিয়া জানিয়েছে. তারা প্রয়োজনে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বন্ধ করে দিতে পারে। আর এমনটি করা হলে তা পারমাণবিক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াবে বলে ভাষ্য ইউক্রেইনের।
রাশিয়া এর আগে জাপোরিঝিয়া বিদ্যুকেন্দ্র ও এর আশপাশের এলাকাকে ‘অসামরিক এলাকায়’ পরিণত করার আহ্বান খারিজ করে দিয়েছিল।
রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কেন্দ্রটি এখনও ইউক্রেইনীয় প্রকৌশলীদের দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটি বিশাল এনেরহোদার জলাধারের রুশ নিয়ন্ত্রিত দক্ষিণ তীরে অবস্থিত, ইউক্রেইনীয় বাহিনীর অবস্থান এর উত্তর তীরে।
দুই পক্ষই গত কয়েকদিন ধরে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশপাশের বেসামরিক এলাকায় গোলাবর্ষণের জন্য একে অপরকে দায় দিয়ে আসছে।
রাশিয়া ওই বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ইউক্রেইনের নিয়ন্ত্রণে থাকা জলাধারের বিভিন্ন অংশের শহরগুলোতে হামলা চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছে কিইভ; মস্কো এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়িপ এরদোয়ানের সঙ্গে বৈঠকের আগে গুতেরেসের সঙ্গে একান্তে বসেছিলেন ইউক্রেইনের প্রেসিডেন্ট ভলদোমিরি জেলেনস্কি।
ওই বৈঠক শেষে জেলেনস্কি বলেন, জাতিসংঘ মহাসচিব ও তিনি দুজনই জাপোরিঝিয়া কেন্দ্রে আন্তর্জাতিক আণবিক সংস্থার সম্ভাব্য মিশনের শর্তাবলী নিয়ে একমত হয়েছেন।
“রাশিয়াকে শিগগিরই এবং শর্তহীনভাবে জাপোরিঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এলাকা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে, পাশাপাশি গোলাবর্ষণ ও যে কোনো ধরনের উসকানিও বন্ধ করতে হবে,” বলেছেন তিনি।
পরে তিনজনের বৈঠকের পর তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান বলেন, তিনি, গুতেরেস এবং জেলেনস্কি মার্চে ইস্তাম্বুলে হওয়া শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরু করার বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে যে ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্ট হয়েছে তা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
জাতিসংঘ ও তুরস্কের মধ্যস্থতায় ওই শান্তি আলোচনায় জুলাইয়ে রাশিয়া ও ইউক্রেইনের মধ্যে এক চুক্তির পর রাশিয়া ইউক্রেইনের শস্যের চালানের ওপর অবরোধ তুলে নেয়, পরে অগাস্ট থেকে শস্য রপ্তানি ফের শুরু হয়।
মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট নেটোর সদস্য তুরস্ক তাদের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার রাশিয়ার সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে আসছে, তারা ছয় মাস আগে শুরু হওয়া এই যুদ্ধের ইতি টানতে মধ্যস্থতাও করতে চাইছে।
“ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলেই শেষ হবে। গুতেরেস এবং জেলেনস্কির মতও তেমনই,” বলেন এরদোয়ান।
এ প্রসঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে মস্কোর কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি বলে জানিয়ে রয়টার্স।
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসন ইউক্রেইনে অতিরিক্ত ৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে, এই সহায়তার ঘোষণা এমনকী শুক্রবারেই আসতে পারে বলে ধারণা দিয়েছেন বিষয়টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ তিন কর্মকর্তা।
ইউক্রেইনের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভে রাশিয়ার দুটি পৃথক হামলায় ১৭ জন নিহত ও ৪২ জন আহত হয়েছে বলে বৃহস্পতিবার অঞ্চলটির গভর্নর অভিযোগ করেছেন।
একইদিন মস্কোর দখলে থাকা ক্রাইমিয়া উপদ্বীপে একটি বড় সামরিক বিমানবন্দরের কাছে অন্তত চারটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
এর আগে গত ১০ দিনে ক্রাইমিয়ার রুশ স্থাপনাগুলোতে যত বিস্ফোরণ হয়েছে সেগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার ইঙ্গিত দিয়েছিল কিইভ।
পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বিস্ফোরণগুলো হয়েছে সেভাস্তোপোলে রাশিয়ার কৃষ্ণ সাগর নৌবহরের সদরদপ্তরের উত্তরে বেলবেক সামরিক বিমানবন্দরের কাছে।
সেভাস্তোপোলের গভর্নর মিখাইল রাজভোজায়েভ টেলিগ্রামে তাদের কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি জানিয়ে বলেছেন, রাশিয়ার বিমানবিধ্বংসী বাহিনী ইউক্রেইনের একটি ড্রোনকে ভূপাতিত করেছে।
শুক্রবার ইউক্রেইনের সশস্ত্র বাহিনীর জেনারেল স্টাফ জানিয়েছে, রুশ বাহিনী একের পর এক হামলা চালাচ্ছে এবং তিন বা তার বেশি যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা চালালেও ইউক্রেইনের সেনারা রুশ বাহিনীর সেসব হামলা প্রতিহতে সক্ষম হয়েছে।
দক্ষিণাঞ্চলে ইউক্রেইনের বাহিনী নতুন ভূখণ্ডের কর্তৃত্ব নেওয়ার চেষ্টা করছে; তাদের হামলায় ৭৩ রুশ সেনা নিহত এবং ১৩টি সামরিক সরঞ্জাম ও একাধিক গোলাবারুদের ডিপো ধ্বংস হয়েছে বলেও শুক্রবার ইউক্রেইনের আঞ্চলিক কমান্ড ফেইসবুকে দাবি করেছে।
রয়টার্স এসব দাবির সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করে দেখতে পারেনি।
