তেল, রিকশার যন্ত্রপাতি, মেকানিকের যন্ত্রপাতি বিক্রির উদ্দেশ্যে রাস্তার পাশের ফুটপাতে গড়ে উঠেছে একটা দোকান। সকাল থেকে রাত অবধি পরিশ্রমে দোকান মালিকের পায়ের নিচে জমেছে ধুলোর আস্তরণ। তবু সারাদিনের কর্মব্যস্ততার মাঝে ভাতঘুমের অভ্যাসটা বুঝি বাঙালীর ছেড়ে দেওয়া চলেনা।
জাগতিক চিন্তা ভুলে, গা এলিয়ে দিবানিদ্রার দেশে ডুব দিয়েছেন তিনি। সেই চিত্রই কলকাতার মানিকতলার রাস্তা থেকে ক্যামেরাবন্দী করে এনেছেন তাবাসসুম বিনতে তাব্রীজ।
সাধারণ মানুষের জীবনের গল্পগুলোকে ছবির রূপ দিতে ভালোবাসেন তাব্রীজ। সেই ভালোবাসা থেকেই করেন স্ট্রিট ফটোগ্রাফি।
স্ট্রিট ফটোগ্রাফি হচ্ছে ফটোগ্রাফির এমন একটি ধারা, যেটি পাবলিক প্লেস থেকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিচ্ছবি তুলে আনে। এটিকে সমাজের আয়নার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।
কারণ যে ব্যক্তি/বস্তু যেভাবে আছে সেভাবেই ছবিতে ফুটিয়ে তোলা স্ট্রিট ফটোগ্রাফির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বেশিরভাগ স্ট্রিট ফটোগ্রাফ ক্যান্ডিড শটে তোলা হয়ে থাকে।
বাংলাদেশে স্ট্রিট ফটোগ্রাফির চর্চা হয় পেশা নয় নেশার বসে। নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায় আপনার বা আমার প্রাণ যখন ওষ্ঠাগত। সেই নাগরিকদের জীবনের বাস্তব গল্প ছবিতে ফুটিয়ে তোলা ই স্ট্রিট ফটোগ্রাফারদের নেশা।
ভ্যাপসা গরম, দূষিত বায়ু কিংবা শব্দের কোলাহল সব কিছুর মাঝে এক টুকরো জীবন খুঁজে বেড়ান তারা।
"সেদিন ছিলো তীব্র গরম, তার মাঝে জ্যাম যেন বাড়তি কষ্টের বাহক। প্রায় দেড় ঘন্টা ধরে এক জায়গায় থমকে থেকে মনে হচ্ছিলো কোন এক স্থবির পৃথিবীতে আটকা পড়েছি আমি বা আমরা। তবে হঠাৎ করে জ্বলে উঠা স্ট্রিট লাইট, মার্কেটের লাইটগুলো শহরের অন্ধকার ও স্থবিরতা কাটাতে যেনো দেবদূত হয়ে এলো"।

আলোকিত শহর। ছবি: তাহমিনা আক্তার মুক্তা
এই ছবিটি তোলার পিছনের গল্প এভাবেই বলছিলেন তাহমিনা আক্তার মুক্তা। চারপাশ থেকে আসা কৃত্রিম আলোর উৎসগুলোর মাধ্যমে তিনি খুঁজে পেয়েছিলেন শহরের জীবনের মূল আলোড়ন। সেই মুহুর্তটিকেই করেছেন ফ্রেমবন্দী।
মোহাম্মদপুর নিবাসী তাহমিনা আক্তার মুক্তা, শখের বসে করেন স্ট্রিট ফটোগ্রাফি। শহরের যান্ত্রিকতার ভীড়ে এভাবেই এর মাধ্যমে খুঁজে বেড়ান শান্তির আভাস।
শুনেছি বন্যরা নাকি বনেই সুন্দর। তবে স্ব লাভের জন্য মনুষ্যত্ব হারিয়ে মানুষ যখন তাদের লোকালয়ে নিয়ে আসেন তখন সে সৌন্দর্য আর বিদ্যমান থাকেনা। তাদের মাঝে দেখা যায় ক্লান্তির ছাপ।
তেমনি একটি মুহূর্ত ক্যামেরায় বন্দী করেছেন কমিউনিকেশনস এডুকো বাংলাদেশ এ কর্মরত শারাবান তাহুরা আলী শারিন। রাজধানীর মগবাজার এলাকা থেকে তোলা এ ছবিতে দেখা যায় একটি হাতির নীরব পদযাত্রা।

বনের সৌন্দর্য যখন লোকালয়ে বন্দী। ছবি: শারাবান তাহুরা আলী শারিন
শারিনের ভাষ্যে, “সমাজের বাস্তবতা ও মানুষের জীবনব্যবস্থার আসল চেহারা খুঁজে পাওয়া যায় কেবল রাস্তায় বের হলে'। শহরের বড় বড় দালানকোঠা ও আলোকসজ্জার ভীড়ে যা আমাদের চোখ এড়িয়ে যায়।সেইসব খন্ডচিত্র গুলো ফ্রেমে বন্দী করার জন্যই তিনি স্ট্রিট ফটোগ্রাফি করেন। এটি শারিনের কাছে বাস্তবতা বোঝার খোরাক।”
তবে নারী হিসেবে লেন্স হাতে রাস্তাঘাটে ছবি তোলা সহজ কোন বিষয় ছিলোনা তার জন্য। এই ধরনের ফটোগ্রাফি যেহেতু মানুষের অনুমতি ছাড়াই বেশিরভাগ সময় করা হয়ে থাকে, তাই সঠিক ছবিটা পেতে তাকে গুণতে হয়েছে অপেক্ষার প্রহর।
স্ট্রিট ফটোগ্রাফির করার পেছনের উদ্দেশ্য সবার ক্ষেত্রে একরকম নয়। আমাদের পরবর্তী সাক্ষাৎকারদাতা স্ট্রিট ফটোগ্রাফি করেন বর্ণময় বা রঙিন কিছুকে ফ্রেমে বন্দী করবেন বলে।

আলো ঝলমলে বর্ণিল মহররম। ছবি: মোঃ ইমরান
নারিন্দা নিবাসী মোঃ ইমরান, নিউজ রুম এডিটর হিসেবে কর্মরত আছেন 'এখন' টিভিতে। পুরান ঢাকার অলি গলিতে ঘুরে সেখানকার প্রাচীনত্বকে রঙিন করে তুলে আনেন স্ট্রিট ফটোগ্রাফির মাধ্যমে।
তার কাছে স্ট্রিট ফটোগ্রাফি হচ্ছে জীবনকে আলোকিত করার মাধ্যম। তাই যখন - ই সময় পান ক্যামেরা হাতে বেড়িয়ে পড়েন বর্ণাঢ্যতার সন্ধানে।
প্রশান্তির সান্নিধ্য আমাদের সকলেরই কাম্য বিষয়। হোক সেটা শহর কিংবা শহরের বাইরে কোথাও। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে বাড়ি ফেরার পথে সেই প্রশান্তি খুঁজে চলেন সানজিদা মালিহা মম।
শহরের যান্ত্রিকতা যখন তার মন কে করে তোলে অশান্ত, ঠিক তখনই ফোনের ক্যামেরার ল্যান্স তার জন্য হয়ে উঠে এ অশান্তি থেকে বের হয়ে আসার মাধ্যম। কারণ এটির মাধ্যমেই তিনি শহর জীবনের শান্ত পরিবেশ, রাস্তাঘাট ও সেখানে থাকা মানুষের জীবনচরিত ফ্রেমবন্দী করেন।

গোধূলি লগ্নে ঢাকার রাস্তা ছবি: সানজিদা মালিহা মম
যান্ত্রিক জীবনে প্রশান্তির খোঁজেই তিনি স্ট্রিট ফটোগ্রাফি করেন। শহর ই যেহেতু তার নিবাস ও কর্মস্থল তাই এই ইট পাথরে ঘেরা শহরের আনাচে - কানাচেই ক্যামেরা হাতে অন্বেষণ করে চলেন নির্মল আনন্দের।
ক্যামেরা বন্দী করে আনেন এমন কিছু মুহূর্ত, যা পরবর্তীতে তাকে স্মৃতি রোমন্থনে সাহায্য করে।
সময়কে স্থির করে দেখার একটি মাধ্যম হচ্ছে ফটোগ্রাফি। স্ট্রিট ফটোগ্রাফিও তার ব্যতিক্রম নয়। তাই যদি এমন ইচ্ছে থাকে তবে ক্যামেরা হাতে সর্বদা তৈরি থাকুন। হঠাৎ একদিন কেউ পেয়ে যেতে পারেন পারফেক্ট ক্লিক।
ফারজানা জামান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন।
farjanazaman305@gmail.com
