Loading...

মুল্লুক চলো: চা শ্রমিকদের প্রায় বিস্মৃত এক ইতিহাস

| Updated: August 19, 2022 20:22:02


অমানুষিক পরিশ্রমে লিপ্ত চা শ্রমিকেরা। ছবি: উইকিমিডিয়াকমনস অমানুষিক পরিশ্রমে লিপ্ত চা শ্রমিকেরা। ছবি: উইকিমিডিয়াকমনস

চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে বৃষ্টি দেখা হয়, গান শোনা হয়, কবিতা পড়া হয়। গল্পে গল্পে মেতে উঠে হারিয়ে যাওয়া হয় সুদূর অতীতে। তবে সেই অতীতের দিকে চোখ রাখলে দেখা যাবে এমন কিছু ঘটনা, যা ভালোবাসার নয়; বরং তীব্র নৃশংসতার। তেমনই একটি প্রায়-বিস্মৃত ঘটনা হলো মুল্লুক চলো আন্দোলন।  

মুল্লুক বা নিজের মুলুকে চা শ্রমিকদের ফিরতে চাওয়ার আকুতি থেকেই এর সূত্রপাত। তবে এর আগে একটু পেছনে ফিরে দেখে নেয়া যাক তাদের এই বাঙাল মুলুকে আসার ঘটনা।

সে গাছে সোনা ঝরে

১৮৪০ সালে চট্টগ্রামে প্রথম পরীক্ষামূলকভাবে চা চাষ আরম্ভ হয়। তবে ১৮৫৪ সালে বৃহত্তর সিলেটের মালনীছড়ায় বাণিজ্যিকভাবে চা চাষের শুরু। ব্রিটিশরা ঔপনিবেশিক শাসনের অংশ হিসেবেই চা চাষ শুরু করায়। তবে স্থানীয় শ্রমিকদের চা শ্রমিক হিসেবে পাওয়া কঠিন ছিলো। কারণ, অমানুষিক শ্রম দিতে হতো।

এ অবস্থায় বিহার, পাটনা, উত্তর প্রদেশ, রাজস্থানসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে হতদরিদ্র শ্রমিকদের নিয়ে আসা হয়। তাদের দেখানো হয় সবুজে মোড়ানো সোনার স্বপ্ন। এক যে আছে দেশ, সেখানে সবুজে ঢাকা পাহাড় আর গাছগুলোয় সুন্দর সোনালি পাতা! আর সেসব শুনে নতুন স্বপ্ন বুনে দলে দলে শ্রমিকেরাও আসে।

টি-টোকেনে বন্দী

শ্রমিকেরা এখানে আসার পরপরই তাদের মোহভঙ্গ হতে থাকে। তাদের আলাদা কোনো মজুরি ছিলো না। সে সময় চা থেকে মুনাফা ৪৫০ শতাংশ পর্যন্ত হলেও তাদের মজুরি দেয়া হতো না। এভাবে পার হতে থাকে দিন। চা শ্রমিকদের জন্য ছিল টি-টোকেন। এটি দেখিয়ে বাগানের ভেতরের বাজার থেকে খাবার নেয়া বা অন্যান্য পণ্য কেনা যেত। তবে বাইরে এই টোকেনের কোনো মূল্যই না থাকায় শ্রমিকেরা চা বাগানে একরকম ফাঁদে আটকা পড়েন। তাদের ওপর তুচ্ছ কারণে চলতো অকথ্য নির্যাতন। এই শ্রমিকদের ব্যবহার করা হতো দাসের মত।  

মজুরি কমে তিন আনা

চা বাগানের মালিক ইংরেজদের মুনাফা দিন দিন বেড়েই চলছিল। কিন্তু শ্রমিকদের অবস্থার কোনো উন্নতি নেই। একসময় টি-টোকেন বাতিল করে দৈনিক মজুরি দেয়া শুরু হয়। এর ভেতর আবার শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। যুদ্ধপরবর্তী সময়ে মুনাফা ঠিক রাখতে শ্রমিকদের বেতন কমিয়ে করা হয় দৈনিক তিন আনা। এর ফলে শ্রমিক অসন্তোষ ক্রমাগত বাড়তে থাকে।

টি-টোকেন সংগ্রহ করছেন চা শ্রমিকরা। ছবি: উইকিমিডিয়াকমনস

৬৭ বছরের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ

১৯২১ সালের কথা। নিম্ন মজুরি ও দাসজীবন নিয়ে শ্রমিকদের অসন্তোষ তখন তুঙ্গে। এ অবস্থায় তারা ঠিক করলেন নিজেদের আদি নিবাস বা মূলুকে ফিরে যাবেন।

কিন্তু মালিকপক্ষ ছাড়ার পাত্র নয়। নিজেদের ব্যবসার উপকরণদের তো আর এভাবে চলে যেতে দেয়া যায় না!  তাই তাদের যোগসাজশে রেল কতৃপক্ষ টিকেট বিক্রি বন্ধ করে দেয়।

এরপরও দমানো যায়নি তাদের। প্রায় ত্রিশ হাজার শ্রমিক পায়ে হেঁটে আসাম থেকে চাঁদপুর অভিমুখে রওনা হন৷ পথে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শ্রমিকের মৃত্যু হয় এরপর কোলকাতার মেয়রের নির্দেশে রেলের টিকেট আবার চালু হয়।

রক্তে লাল প্রমত্তা মেঘনা

শ্রমিকেরা চাঁদপুর মেঘনা জাহাজঘাটে পৌঁছে ঠিক করেন স্টিমারে করে ত্রিপুরা গিয়ে এরপর রেলযোগে ভারতে তাদের নিজ নিজ ভিটায় ফিরে যাবেন। চাঁদপুর তখন ছিলো ত্রিপুরার অভ্যন্তরীণ অঞ্চল। কিন্তু এখানে এসে এক নারকীয় ঘটনার সম্মুখীন হন তারা। প্রথমে ১৯২১ সালের ১৯ মে মেঘনা ঘাটে জাহাজে উঠতে উদ্যত শ্রমিকদের ওপর হামলা হয়। জাহাজের পাটাতন সরিয়ে নেয়ায় অনেকে সরাসরি গিয়ে পড়েন প্রমত্তা মেঘনায়, পলকেই ভেসে যান স্রোতের সঙ্গে।

এরপর এলো সেই ভয়াল রাত। ১৯২১ সালের ২০ মে গভীর রাত (২১ মে)। ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত শ্রমিকেরা তখন চাঁদপুরের বড় হেড স্টেশনে অকাতরে ঘুমিয়ে। এ সময় চা বাগান মালিক ম্যাকফার্সের নির্দেশে হাজার হাজার গোর্খা সৈনিক ও পুলিশ সদস্য সেখানে জড়ো হন।

এরপর মহকুমা প্রশাসক সুশীল সিংহ (প্রথমদিকে শ্রমিকদের প্রতি সহানুভূতিশীল) ম্যাকফার্সের চাপে গোর্খাদের হামলার নির্দেশ দেন। তারপর গুলি আর বেয়নেট নিয়ে তারা সমূলে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘুমন্ত শ্রমিকদের ওপর। যারা রেল প্লাটফর্মে ঘুমে কাতর, তাদের গুলি করে ও বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হতে থাকে। ঘটনাটি ঘটেছিল চাঁদপুর বড় হেড স্টেশনে। সেই একরাতে এত শ্রমিককে হত্যা করা হয় যে, মেঘনা নদীর পানি পুরো লাল হয়ে গিয়েছিলো হতভাগ্য চা শ্রমিকদের তাজা রক্তে।

সুনশান নীরবতা  

এত বড় একটি ঘটনা স্থানীয়ভাবে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করলেও সে সময় একমাত্র যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত ছাড়া আর কাউকে শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে দেখা যায়নি। যতীনবাবু ছিলেন রেল শ্রমিকদের নেতা। তিনি আড়াই মাস ধর্মঘট করেছিলেন। রেল বন্ধ থাকায় তখন সামগ্রিকভাবে একটা চাপ তৈরি হয়েছিল, তবে শ্রমিকদের আবার সেই চা বাগানেই ফেরত যেতে হয়। সাথে জোটে অকথ্য নির্যাতন। মজুরিও থাকে সেরকমই। এছাড়া এই শ্রমিকহত্যার প্রতিবাদ করায় সিলেট, চাঁদপুর ও চট্টগ্রামে মোট ৫,০০০ এর মত রেলওয়ে কর্মী বরখাস্ত হন৷

শুরুতে মহাত্মা গান্ধী আন্দোলনে সমর্থন দিলেও পরে পুঁজিপতিদের বিরুদ্ধে অসহযোগ নয় - বলে আন্দোলন থেকে সমর্থন তুলে নেন।

এমন নৃশংসা ঘটনা শেষ পর্যন্ত অনেকেরই আলোচনার টেবিলে স্থান পায়নি।

এ বছর ঢাকায় মুল্লুক চলো আন্দোলন নিয়ে গণসংগীতের দল সমগীতের আয়োজনে পরীবাগের সংস্কৃতি কেন্দ্রে আলোচনাসভা ও গান হয়েছিলো। সেখানে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ এ বিষয়ে আলোচনা করেন। কফিল আহমেদ, অরূপ রাহী, সমগীতসহ বিভিন্ন শিল্পী/দল গান করেছিলেন। এছাড়া চাঁদপুরের সেই হেড স্টেশনে অনেকেই শোক জানিয়ে ফুল দেন। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য এই নির্মম ঘটনাটির স্মরণে নির্মিত হয়নি একটি শোকস্তম্ভও৷ অবশ্য স্থানীয় চা শ্রমিকেরা তাদের পঞ্চায়েতের হয়ে দিবসটি পালন করে থাকেন 'চা শ্রমিক দিবস' হিসেবে।

মুল্লুক চলো আন্দোলনের ১০১ বছরে সমগীতের আলোচনা সভা। ছবি: সমগীত (ফেসবুক)

আজও ফিরে ফিরে আসে সেই সময়

মনে করি আসাম যাবো / আসাম গেলে তোমায় পাবো
বাবু বলে কাম কাম, সাহেব বলে ধরে আন/ আর ওই সর্দার বলে লিবো পিঠের চাম
হে যদুরাম, ফাঁকি দিয়া চলাইলি আসাম

জনপ্রিয় এই গানটিতে খুব দারুণভাবেই উঠে এসেছে সেই শ্রমিকদের কষ্টের কথা। বর্তমান সময় ও ১০০ বছর আগের সময়ের ভেতর একটা মেলবন্ধন রচনা করেছে এই গান।

আজ থেকে ১০১ বছর আগে মুল্লুক চলো আন্দোলনের ডাক যারা দিয়ে গেছেন তাদের আর ফেরা হয়নি নিজ মুলুকে। আসাম থেকে ফিরতে থাকা সেই মানুষগুলোর যাত্রা থেমে গিয়েছিলো চাঁদপুরেই৷

মাহমুদ নেওয়াজ জয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী 

mahmudnewaz939@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic