১৯৭৭ সালে নাসা মহাকাশের উদ্দেশ্যে একটি নভোযান পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। উদ্দেশ্য - বৃহস্পতি ও শনিগ্রহ পর্যবেক্ষণ। নাসার এই উদ্দেশ্য সফল হয়ে যায় নভোযান পাঠানোর তিন বছরের মধ্যেই। এরপর নভোযানটি আর ফিরে আসেনি। যেতে যেতে সেটি পৌছে যায় এমন এক দুরত্বে যেখানে মানবনির্মিত কোনো বস্তু যেতে পারেনি।
২০১২ সালে ভয়েজার - ১ প্রথমবারের মত আমাদের সৌরজগৎ পাড়ি দিয়ে ইন্টারস্টেলার বা আন্তঃনক্ষত্রিক মহাশূন্যে পা রাখে। এখনো এটি ঘন্টায় প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার মাইল (প্রতি সেকেন্ডে সতের কিলোমিটার) বেগে ছুটে চলছে।
দেখতে অনেকটা স্যাটেলাইটের মত এই নভোযানটি পাঠানোর উদ্দেশ্য ছিল মহাকাশের আবহাওয়া ও সৌরজগতের গ্রহ সম্পর্কে ধারণা লাভ করা। বিশেষ করে বৃহস্পতি ও শনি গ্রহকে আরো কাছ থেকে দেখা।
১৯৭৭ সালের ৫ সেপ্টেম্বর আমেরিকার ফ্লোরিডা থেকে এটি মহাকাশের উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপণ করা হয়। ভয়েজার - ১ পাঠানোর দুই সপ্তাহ পূর্বে ভয়েজার - ২ নামের আরো একটি নভোযান মহাকাশের উদ্দেশ্যে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু শীঘ্রই ভয়েজার - ১ গতি বাড়িয়ে ফেলে। ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরে এটি ভয়েজার - ২ কে ছাড়িয়ে যায়।
১৯৭৯ সালে ভয়েজার - ১ সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ বৃহস্পতিকে পর্যবেক্ষণ করে। বৃহস্পতির নতুন একটি বলয় আবিস্কৃত হয় যা পৃথিবী থেকে খালি চোখে দেখা যেত না। থিব ও মেটিস নামের বৃহস্পতির নতুন দুটি চাঁদের সন্ধান পাওয়া যায়।
এর প্রায় এক বছর পর ১৯৮০ সালে ভয়েজার - ১ শনিগ্রহের কাছে পৌছে যায়। টাইটান, মিমাস, ডিওনসহ শনিগ্রহের নতুন পাঁচটি চাঁদ কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য লাভ করে নাসার বিজ্ঞানীরা। এই পাঁচটি চাঁদেই বরফের অস্তিত্ব আছে বলে জানা যায়।
ভয়েজার - ১ এর সাথে সংযুক্ত রয়েছে ৮০০ x ৮০০ পিক্সেলের দুটি ডিজিটাল ক্যামেরা যার সাহায্যে এটি মহাকাশের গুরুত্বপূর্ণ ছবিগুলো ধারণ করে। স্যাটেলাইটের মত দেখতে অ্যান্টেনা সব সময় পৃথিবীর দিকে তাক করা অবস্থায় থাকে। এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ সংকেত বা তথ্য পৃথিবীতে পাঠানো হয়। নাসা সেই সংকেতগুলো গ্রহণ করে।
মাত্র তিন বছরের মধ্যে ভয়েজার_ ১ বৃহস্পতি ও শনি গ্রহ পর্যবেক্ষণ সম্পন্ন করে ফেলে। এর ফলে নাসার প্রাথমিক উদ্দেশ্য সফল হয়। এছাড়াও ভয়েজার - ১ এর ছবির সাহায্যে বিজ্ঞানীরা মহাকাশের পরিবেশ - আবহাওয়া ও রেডিয়েশন সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা লাভ করে।
দ্য গোল্ডেন রেকর্ড
গোল্ডেন রেকর্ড হলো বারো ইঞ্চির একটি ডিস্ক যা ভয়েজার - ১ এর সাথে মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল। এই গোল্ডেন রেকর্ডের ভেতর আছে - পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের পঞ্চান্নটি ভাষায় অভিবাদন, মানুষ ও জীবজন্তুর ছবি, বিভিন্ন স্থানের ছবিসহ বিখ্যাত কিছু পশ্চিমা সংগীত। পৃথিবীর সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে ভিনগ্রহের অধিবাসীদের ধারণা দেয়াই এর উদ্দেশ্যে। নাসার দাবী, ভিনগ্রহের প্রাণীরা কখনো এই নভোযানটি খুঁজে পেলে তারা এই গোল্ডেন ডিস্ক দিয়ে পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষ সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারবে।

দ্য গোল্ডেন রেকর্ড ছবি: সায়েন্স ফ্রাইডে
পেইল ব্লু ডট
১৯৯০ সালের দিকে নাসা সিদ্ধান্ত নেয় ভয়েজার - ১ আর ফিরিয়ে আনা হবে না। বরং এর পরবর্তী মিশনের জন্য প্রস্তুতি নেয়া হবে। মহাকাশের তীব্র রেডিয়েশন ও এর জ্বালানি স্বল্পতার কারণে এর ক্যামেরাসহ বেশ কিছু পাওয়ার সার্ভিস বন্ধ করে দেয়া হয় যাতে দীর্ঘদিন এটি চলতে পারে।
১৯৯০ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারী নভোযানটি পৃথিবীর দিকে ঘুরে শেষবারের মত একটি ছবি তোলে। প্রায় ৬ বিলিয়ন কিলোমিটার দূর থেকে তোলা এই বিখ্যাত ছবিটির নাম ‘পেইল ব্লু ডট’ বা ফ্যাকাশে নীল বিন্দু। এই ছবি দেখিয়ে দেয়, মহাবিশ্বের কত ক্ষুদ্র একটি অংশ নিয়ে পৃথিবী। এই ক্ষুদ্র নীল বিন্দুতেই আমাদের জীবনযাপন। পৃথিবীর তুলনায় কত বিশাল এই মহাবিশ্ব। এই মহাবিশ্বে মানুষ কত ক্ষুদ্র, কত একা।

ছবি: নাসা/ফ্লিকার
ভয়েজার - ১ চলছে
ভয়েজারের পরবর্তী লক্ষ্য সৌরজগতের গন্ডি থেকে বের হয়ে ইন্টারস্টেলার বা আন্তঃনক্ষত্রিক মহাশূন্যে পদার্পণ। ইন্টারস্টেলার হলো দুইটি নক্ষত্রের মাঝে অবস্থিত এক বিশাল শূন্যস্থান। এটি এমন এক অঞ্চল যেখানে কোনো নক্ষত্রের প্রভাব খাটে না।
২০১২ সালের আগস্টে ভয়েজার - ১ প্রথমবারের মত এই সৌরজগৎ পাড়ি দিয়ে ইন্টারস্টেলারে পা রাখে।
বর্তমানে এটি পৃথিবী থেকে প্রায় ১৪.৫ বিলিয়ন মাইল দূরে অবস্থান করছে। পঁয়ত্রিশ হাজার মাইল প্রতি ঘন্টা (প্রতি সেকেন্ডে সতেরো কিলোমিটার) বেগে ছুটে চলছে। এই গতি ধরে রাখতে পারলে নভোযানটির নতুন কোনো সৌরজগতে প্রবেশ করতে লেগে যাবে প্রায় চল্লিশ হাজার বছর। তার জন্য ভয়েজার - ১ কে পাড়ি দিতে হবে আন্তঃনক্ষত্রিক মহাশূন্যের এক লম্বা পথ।
আশার কথা হলো, এখনো নাসার সাথে এর যোগাযোগ আছে। নভোযানটি এখনো পৃথিবীতে রেডিও সিগনাল পাঠাতে সক্ষম। সেই সিগনাল আসতেও সময় লাগে প্রায় উনিশ ঘন্টা।
তবে নাসার এই নভোযানটি এখন আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এর ভেতর যে পরিমাণ জ্বালানি অবশিষ্ট আছে তা দিয়ে ধারণা করা হচ্ছে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এটির সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা যাবে। এরপর চির তরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে যোগাযোগ। ভয়েজার - ১ হারিয়ে যাবে মহাকাশের অতল সমুদ্রে। শুধু বেঁচে থাকবে সেই গোল্ডেন রেকর্ড। যদি ভিনগ্রহের কেউ পেয়ে যায় এর খোঁজ, সেই আশায়।
সাজিদ আল মাহমুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশুনা করছেন।
shajidmahmud11@gmail.com
