লালবাগ কেল্লা যেতে একটু আগে ৩ নং ঢাকেশ্বরী রোডে মিস্টার বেকারের ওপরে দোতলায় অবস্থিত ক্যাফে চালচিত্র। গত জুন মাসের শেষদিকে চালু হওয়া এই ক্যাফেটি সম্প্রতি আলোচনায় এসেছে তাদের মনোরম পরিবেশ ও বাহারি সব কফি ও বেকারি আইটেমের জন্য৷ ব্রাউনি, চকোলেট মুজ, সিনামোন রোল, রেড ভেলভেট চিজ কেক, ব্লুবেরি চিজ কেক এর মত আইটেমগুলো ক্রেতাদের মন জয় করে নিয়েছে।
তবে সম্প্রতি আরেকটি চমকপ্রদ ইভেন্ট আয়োজন করে আবারো আলোচনায় ক্যাফে চালচিত্র। গত ২৫ ও ২৬ আগস্ট তাদের ক্যাফেতে তারা আয়োজন করেছিলেন 'যেমন খুশি তেমন সাজো'। এটি কোনো প্রতিযোগিতা হিসেবে আয়োজিত হয়নি। বরং প্রত্যেকে যাতে তাদের নিজ নিজ ইচ্ছা অনুযায়ী পোশাক পরতে পারেন ও ভিন্ন রুচির প্রতি সহনশীল হয়ে সহাবস্থান করতে পারেন - সেই ভাবনা থেকেই তারা এমন একটি ইভেন্টের আয়োজন করেন।
চালচিত্রের কর্ণধার মো. রিয়াদ হোসেন ও নোশিন আঞ্জুম প্রবাহ যথাক্রমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার প্রকৌশল ও অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। কী উদ্দেশ্যে এই আয়োজন সে সম্পর্কে মো. রিয়াদ হোসেন বলেন, "ব্যাপারটা আমাদের জন্য খুবই দুঃখের ও লজ্জার যে একটি স্বাধীন ও সভ্য দেশে আমাদের কাপড়ের দৈর্ঘ্য - প্রস্থ ইত্যাদির ভিত্তিতে কাউকে (বিশেষ করে নারীদের) হেনস্তা করা যায়, কিছু মানুষ ঠিক করে দিতে চায় কে কী পরবে আর কে কীভাবে চলবে। এই দুঃখজনক পরিস্থিতিতে তাই আমরা একটা দিন অন্তত ইচ্ছা ও পছন্দমতো পরার ও চলার জন্য এই আয়োজন করেছিলাম(যদিও পরে তা দুই দিনে গড়ায়)।"
এর পেছনে কাজ করেছে তাদের সমাজচিন্তা ও দায়বদ্ধতাও। এ বিষয়ে তিনি আরো বলেন, "দেশের ও পৃথিবীর এই ক্রান্তিকালে আমরা আসলে রাজনীতি নিয়ে ভাবতে চাই, অর্থনীতি নিয়ে আলাপ দিতে চাই, তথ্য ও প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করতে চাই, আমরা আবিষ্কার করতে চাই ক্ষুধাময় এ পৃথিবীর অসংখ্য দারিদ্র্যসীমার নিচে পড়ে থাকা মানুষের ক্ষুধা নিবারণের পদ্ধতি, আমরা মোকাবেলা করতে চাই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে আগত মহাদুর্যোগ। এই সময়ে এসে কে কী পরলো আর কে কীভাবে হাঁটলো তা নিয়ে হেনস্তা হওয়া তো দূরে থাক, চিন্তা করাটাই খুবই দুঃখজনক।"

পারস্পারিক সহাবস্থান ও সহনশীলতার সংস্কৃতি তৈরির একটি প্রয়াস ছিলো এই আয়োজন, ছবি: চালচিত্র (ফেসবুক পেজ)
২৫ আগস্ট এই ইভেন্টে মর্টিসিয়া এডামস ও গোমেজ এডামস এর সাজে এসেছিলেন সাজিয়া খানম ও ওয়াসা নাফি। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতক পর্যায়ের শিক্ষার্থী। সাজিয়া খানম সংগীত বিভাগে ও ওয়াসা নাফি চারুকলায় পড়ছেন। চার্লস এডামস এর সৃষ্ট এই কার্টুন চরিত্র দুটো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল তাদের মাধ্যমে।
সাজিয়া খানম শাটিকাপ ওয়েব সিরিজটিতে অভিনয় করে পরিচিতি পেয়েছেন। আর্ট ডিরেক্টর হিসেবেও কাজ করেন। ওয়াসা নাফি বুনোফুল ও চিত্রপট ব্যান্ডে গিটারিস্ট হিসেবে আছেন। এর আগে তিনি এই দুটো ব্যান্ডের সাথে চালচিত্রে পরিবেশন করেছেন।
আয়োজন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সাজিয়া বললেন, "ছোট থাকতে যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতায় অংশ নিতাম৷ সেটার স্বাদ পেয়েছি।"
এ ধরনের আয়োজন পারস্পারিক সাংস্কৃতিক সহাবস্থান তৈরি করতে পারে কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে তিনি তিনি বলেন, "অবশ্যই। আমরা ভেবেছিলাম আবার ক্যারেক্টার সোয়াপ করবো। এরকম ক্যারেক্টার সোয়াপ বা জেন্ডার এর সাথে মিল না রেখে পোশাক পরা জেন্ডার ব্যারিয়ার বা ট্যাবু ভাঙতে ভূমিকা রাখতে পারে।"
২৫ ও ২৬ আগস্ট আরো অনেকেই এসেছিলেন চালচিত্রে। যার ভেতর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সংখ্যাই ছিলো বেশি৷ এ বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নুসরাত তাবাসসুম সার্বিক আয়োজনে খুব খুশি হয়েছেন। আয়োজন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, " সুন্দর, বেশ সুন্দর আয়োজন। এমনটাই হওয়া উচিত। সামনে এরকম আয়োজন চালচিত্রের পক্ষ থেকে আরও করা হলে সেটা আনন্দদায়ক এবং লাভজনকও হবে।"
এই আয়োজনে একেকজন মানুষ একেক পোশাক পরে এসেছিলেন। যেমন - নারীদের কেউ হিজাব, কেউ জিন্স, কেউ স্কার্ট, কেউ টি শার্ট, কেউ স্লিভলেস ব্লাউজের সাথে শাড়ি, কেউ সালোয়ার কামিজ পরেছিলেন।শর্ট স্কার্টও পরেছিলেন একজন। তারা ছবি তুলছিলেন ও গল্প করছিলেন।
পুরুষদের ভেতর দেখা গেলো পাঞ্জাবির সাথে লুঙ্গি, ধুতি পাজামা, টুপি ইত্যাদি পরে আসতে। কেউ হয়তো এসেছেন ফতুয়া/ পাঞ্জাবির সাথে লুঙ্গি পরে, আবার কেউ ওয়েস্টার্ন ধরনের কোট-প্যান্ট ও হ্যাট পরে। এমন বিভিন্ন পোশাকে আসা বন্ধুরা একসাথে দাঁড়িয়ে ছবি তুললেন।
আবার, কেউ কেউ নতুনভাবে পরিচিত হলেন একে অপরের সাথে। একইসাথে হিজাব, সালোয়া র-কামিজ, জিন্স, স্কার্ট পরা নারীরা ছবি তুললেন। অন্তর্নিহিত বার্তাটি খুব সুন্দর - সবার পোশাকে থাকা ভিন্নতাকে সবাই সম্মান করবেন ও পোশাকের ক্ষেত্রে কেউ কাউকে 'জাজ' করবেন না।
আয়োজনে ২৬ আগস্ট সন্ধ্যায় ক্যাজুয়াল টি শার্ট ও রিপড ট্রাউজার পরে এসেছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের শিক্ষার্থী ও নৃত্যশিল্পী আবু ইবনে রাফি। তিনি বললেন, "আমি আলাদাভাবে কোনো সাজ নিয়েছি এমন না। আমার কমফোর্টেবল লাগে এমন পোশাকই পরেছি। তবে অনেক জায়গাতেই এমন পোশাককে নেতিবাচকভাবে দেখা হয়। অধিকাংশ জায়গায় আপনি নিজ ইচ্ছামত পোশাক পরার স্বাধীনতা পাবেন না। এদিক থেকে এই উদ্যোগটি দারুণ।"
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাশ্চাত্য পোশাকের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের প্ল্যাকার্ড হাতে নিয়ে দাঁড়ানোর ব্যাপারটি বেশ আলোচনা-সমালোচনা তৈরি করেছে। কিন্তু প্রতিক্রিয়াশীলতা বা 'ক্যানসেল কালচার' এর বিপরীতে সব সংস্কৃতির ভেতর যে সহাবস্থান ও মেলবন্ধন ঘটানো যায়, সবার পছন্দের প্রতি সম্মান রেখে সবাই সহানুভূতিশীল হতে পারেন একে অপরের প্রতি - তার একটি চমৎকার দৃষ্টান্ত হয়ে থাকলো ক্যাফে চালচিত্রের 'যেমন খুশি তেমন সাজো'-র এই আয়োজন।
মাহমুদ নেওয়াজ জয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
