আজীবনের বোহেমিয়ান কবি আবুল হাসান বেঁচেছিলেন মাত্র ২৮ বছর। অথচ এই সংক্ষিপ্ত জীবনে লিখে যাওয়া তার কবিতার প্রচণ্ডরকম মুগ্ধতা এবং অনুভূতির ছাপ তাকে করেছে বাংলা সাহিত্যের আকাশের সর্বকালের ঝকঝকে নক্ষত্রদের একজন। ষাটের দশকের উত্তাল সময়জুড়ে লেখা তার কবিতা মানুষের বুকে তুলেছিল যে আলোড়ন, তা আজো বিদ্যমান।
আবুল হাসান জন্মেছিলেন দেশভাগের আগে আগে, ১৯৪৭ এর ৪ আগস্টে। আসল নাম আবুল হাসান মিয়া থাকলেও লিখে গেছেন আবুল হাসান নামেই। বাংলা সাহিত্যে সরাসরি অবদান রেখেছেন মাত্র দশ বছর।
কবি আবুল হাসান ছিলেন মাথার চুল থেকে পায়ের নখ অবধি একজন কবি। কবিদেরকে কখনো বাঁধা যায় না নিয়মের শিকলে, আটকানো যায়না সমাজের কারাগারে। আবুল হাসানকেও তাই নিয়মতান্ত্রিকতায় কখনো আটকে রাখা যায়নি। তাই, আশ্চর্যজনক জীবনবোধে তিনি নীল বেদনার মাঝেও ছড়িয়ে গেছেন জীবনের জয়গান —
“ঝিনুক নীরবে সহো
ঝিনুক নীরবে সহো, ঝিনুক নীরবে সহে যাও—
ভেতরে বিষের বালি; মুখ বুঝে মুক্তা ফলাও!”
.png)
কবি নুরুল হুদার সাথে আবুল হাসান (ছবি: দা ডেইলি স্টার)
সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি একে একে প্রকাশ করে ফেললেন তিন কাব্যগ্রন্থ। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘রাজা যায় রাজা আসে’ প্রকাশিত হয় ১৯৭২ এ। এরপর প্রকাশিত হয় ‘যে তুমি হরণ করো’ (১৯৭৪) এবং জীবদ্দশায় প্রকাশিত শেষ কাব্যগ্রন্থ ‘পৃথক পালঙ্ক’ (১৯৭৫)। রক্তের স্রোতে যাযাবর নেশা ছিল আবুল হাসানের সব সময়ের সঙ্গী -
‘গোলাপের নীচে নিহত হে কবি কিশোর
আমিও ভবঘুরেদের প্রধান ছিলাম।
জোৎস্নায় ফেরা জাগুয়ারা চাঁদ দাঁতে ফালা ফালা করেছে আমারও
প্রেমিক হৃদয়!’
একদিকে আবুল হাসান যেমন খুঁজে আনতে চেয়েছেন প্রেরণা, দু’হাতে জড়ো করেছেন এগিয়ে চলার সাহস - আবার এর মাঝেও তাকে সংগ্রাম করতে হয়েছে জীবনের হাহাকার আর নিত্যনৈমিত্তিক বাস্তবতার গরাদের হতাশার সাথে। তার কবিতা বিশ্লেষণ করাকে কবি বেলাল চৌধুরী উল্লেখ করেছেন ‘সাবানের বুদবুদের অস্ত্রপচারের মতোই নিরর্থক’ হিসেবে। হয়তো কোনো অজানা ক্লেদে কিংবা অসহায় ব্যর্থ প্রেমিকের আকুলতায় আবুল হাসান লিখেছিলেন —
“আমার হবে না আমি বুঝে গেছি আমার সত্য মূর্খ,
আকাট! ফুল আমি যত বাগানের মোড়ে লিখে যাই,
দেখি আমার খুলে পড়ে যায় বিষ পিঁপড়ে, বিষের পুতুল!”
নিজের প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ দেখে গিয়েছিলেন মাত্র তিনটি। মৃত্যুর একযুগেরও পর প্রকাশিত হয় তার একমাত্র কাব্যনাটক ‘ওরা কয়েকজন’ (১৯৮৮) এবং ‘গল্পসংগ্রহ’ (১৯৯০)। উড়নচণ্ডী স্বভাবের চিরপ্রেমিক কবি আবুল হাসান দীর্ঘ জীবন লাভ করতে পারেননি, লিখে যেতে পারেননি হাজারো গ্রন্থ - কিন্তু অসীম দক্ষতায় নিজের অক্ষরমালা প্রতিষ্ঠা করে গেছেন সময়ের সোনালী খাতায়।
“আমি ফিরব না আর, আমি কোনদিন
কারো প্রেমিক হবো না; প্রেমিকের প্রতিদ্বন্দ্বী চাই আজ
আমি সব প্রেমিকের প্রতিদ্বন্দ্বী হবো।”
আবুল হাসান যখন একনাগাড়ে ঠাসবুনটে লিখে চলেছেন, তখন দেশজুড়ে অস্থিরতা। মানুষের ক্ষোভ, রাজনৈতিক বৈপরিত্য, বেঁচে থাকার সংগ্রাম - সব মিলেমিশে একাকার হয়ে যেতে থাকে তার কবিতায়। ইংরেজি সাহিত্যে পড়াশুনার জন্য ভর্তি হলেও পড়াশুনা শেষ করেননি। সাংবাদিক হিসেবে যোগ দেন দৈনিক ইত্তেফাকে।
.png)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণে তিন কবি বন্ধু গোলাম সবদার সিদ্দিকী, আবুল হাসান এবং নুরুল হুদা
“মৃত্যু আমাকে নেবে, জাতিসংঘ আমাকে নেবেনা,
আমি তাই নিরপেক্ষ মানুষের কাছে, কবিদের সুধী সমাবেশে
আমার মৃত্যুর আগে বোলে যেতে চাই,
সুধীবৃন্দ ক্ষান্ত হোন, গোলাপ ফুলের মতো শান্ত হোন
কী লাভ যুদ্ধ কোরে? শত্রুতায় কী লাভ বলুন?
আধিপত্যে এত লোভ? পত্রিকা তো কেবলি আপনাদের
ক্ষয়ক্ষতি, ধ্বংস আর বিনাশের সংবাদে ভরপুর”
নীল বেদনার কবি নামে খ্যাত আবুল হাসানের জীবনে রোমান্টিকতার রঙিন ছোঁয়াও ছিল স্পষ্ট। বারবার প্রেমে পড়েছেন, কখনো কখনো ব্যর্থও হয়েছেন। তবু প্রবল জীবনীশক্তি তাঁকে এগিয়ে নিয়ে গেছে নতুন অনুভূতির দ্বারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে নিজ বিভাগেরই সুরাইয়া খানমের সাথে গড়ে ওঠে প্রণয়, যাকে আবুল হাসান উৎসর্গ করেছিলেন ‘পৃথক পালঙ্ক’।
“অতটুকু চায়নি বালিকা!
অত হৈ রৈ লোক, অত ভিড়, অত সমাগম!
চেয়েছিল আরও কিছু কম—
একটি জলের খনি
তাকে দিক তৃষ্ণা এখনই,
চেয়েছিল একটি পুরুষ তাকে বলুক রমণী!”
অমিতচারী জীবনের একদম বইয়ের পাতা থেকে উঠে আসা উদাহরণ ছিলেন আবুল হাসান। কখনো কোনো নিয়ম কানুনের ধার ধারা তো দূরে থাকুক, শরীরের বিন্দুমাত্র যত্ন নেয়াও প্রয়োজন বলে মনে করেননি। আর এসব কারণেই দানা বাঁধে অসুখের বীজ। ১৯৭৪ সালে এসে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন কবি। বাংলাদেশ সরকারের সাহায্যে তাকে বিদেশেও নেয়া হয়েছিল, কিন্তু আর সুস্থ হয়ে উঠতে পারেননি। ১৯৭৫ এর ২৬ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন ঢাকার পিজি হাসপাতালে।
“কী কোরে জাগাবো তাকে?
ঈশ্বর বড় অকরুণ!”
.png)
কবি আবুল হাসান
আবুল হাসান সৃজনশীল ও গীতল কবি হিসেবে পেয়েছিলেন তুমুল খ্যাতি। ষাটের দশকের শেষে ১৯৭০ - এ এশীয় কবিতা প্রতিযোগিতায় অর্জন করেছিলেন প্রথম স্থান। ১৯৭৫ এ পেয়েছিলেন বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার এবং ১৯৮২ তে মরণোত্তর একুশে পদক। অর্জনের খাতায় প্রাপ্তি যতোই থাকুক, নিঃসঙ্গতাবোধ, মৃত্যুচেতনা, কাব্যিক স্বাতন্ত্র্য তাকে করেছে অমর। তাই সাহিত্য অনুরাগীদের কাছে তার এপিটাফ আজো দোলা দিয়ে যায় —
“যতোদূরে থাকো ফের দেখা হবে।কেননা
মানুষ যদিও বিরহকামী,কিন্তু তার মিলনই মৌলিক”
সিরাজুল আরিফিন বর্তমানে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।
sherajularifin@iut-dhaka.edu
