Loading...

নিজ গ্রামে শেষ শয্যায়

| Updated: August 16, 2022 12:03:38


নিজ গ্রামে শেষ শয্যায়

১৫ আগস্ট সন্ধে বেলায় খন্দকার মোশতাক জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। তাতে তিনি জানান যে “দেশের ঐতিহাসিক প্রয়োজনে” তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তিনি “দেশ প্রেমিক সেনাবাহিনী [যারা] বীরত্বের সাথে এগিয়ে এসেছে পদক্ষেপ সফল করতে” তাদের প্রশংসা করেন।

মোশতাক যখন কথা বলছিলেন, তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের মরদেহ [ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের] বাড়ি ‍জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে রয়েছে। পরদিন, ১৬ আগস্ট, ভোর হওয়ার আগে সেনাবাহিনীর সাপ্লাই ব্যাটালিয়ন একটি বাদে সকল মৃতদেহ সংগ্রহ করে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে নিয়ে যায় অচিহ্নিত কবরে দাফন করার জন্য। ব্যতিক্রম ছিল মুজিবের মৃতদেহ। নতুন শাসকরা এই ঝুঁকি নিতে রাজী ছিল না যে তাঁর কবরস্থান একটি তীর্থস্থানে পরিণত হোক। আর তাই সিদ্ধান্ত নেয়া হয় যে জনঅধ্যুষিত ঢাকা থেকে অনেক দূরে টুঙ্গিপাড়ায় নিজ গ্রামে বঙ্গবন্ধুকে কবর দেয়া হবে।

ঐদিন দুপুর ১টার দিকে ডিরেক্টর জেনারেল অব ফোরসেস ইুন্টলিজেন্সের (ডিজিএফআই) ব্রিগেডিয়ার আবদুর রউফ নিজ অফিসে বৈঠক করে তাঁর কর্মকর্তাদের জানান যে মুজিবের মৃতদেহ টু্ঙ্গিপাড়ায় নিয়ে কবর দিতে হবে। তিনি এই কাজ স্বেচ্ছায় করার জন্য আহবান জানালেও কেউ তাতে রাজী হয়নি। তখন তিনি তাঁর অ্যাডজুটেন্ট মেজর হায়দার আলীকে কাজটি সম্পন্ন করতে নির্দেশ দেন। তিনি আরো জানান যে ওখানে স্থানীয় কর্মকর্তাদেরকে ইতিমধ্যেই সব জানিয়ে দেয়া হয়েছে। সুতরাং, হায়দার আলীর কাজ হবে মরদেহকে মুজিবের কোনো একজন বয়স্ক পুরুষ আত্মীয়ের কাছে হস্তান্তর এবং দাফন কাজ তদারক করা। নিরাপত্তারক্ষায় তাঁর সাথে ১৪জন সৈন্য যাবেন।

হেলিপ্যাডে পাইলট মেজরকে বলেন যে দুই ঘন্টার মধ্যে সবকিছু শেষ করতে হবে। কেননা, রাত নেমে গেলে হেলিকপ্টার উড্ডয়ন বিপজ্জনক হবে। টুঙ্গিপাড়ায় হেলিকপ্টার নামার পর দেখা গেল, গ্রামটি প্রায় জনশূন্য। কোনোখানেই কোনো পুরুষ মানুষের দেখা মিলল না। গ্রামবাসী এর আগে সর্বশেষ খাকি পোশাকের সেনাদল দেখেছিল ১৯৭১ সালের বসন্তকালে যখন পাকিস্তানী বাহিনী  হানা দিয়েছিল মুজিবের পৈতৃক নিবাস পুড়িয়ে দিতে ও  আশেপাশে  ভীতি তৈরি করতে। গ্রামবাসী সম্ভবত আশংকা করেছিল যে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে আর তাই কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি। 

কিছুক্ষণ খোঁজাখুঁজির পর মোশাররফ হোসেন নামে একজন বয়স্ক মানুষকে পাওয়া গেল যিনি মুজিবের দূর সম্পর্কের আত্মীয়। কফিনের ডালা খোলার পর তিনি এটা শেখ মুজিবের মরদেহ বলে সনাক্ত করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর কাছে তা হস্তান্তর করা হয়।  ইতিমধ্যে আশে-পাশে সরে গিয়ে থাকা মানুষজনের কেউ কেউ সাহস করে বেড়িয়ে আসেন এবং ঘটনাস্থলে জড়ো হতে থাকেন।

মুজিবের দাফন দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা অস্থির হয়ে পড়েছিলেন। তিনি সেখানে কর্তব্যরত পুলিশকে নির্দেশ দেন গ্রামের মসজিদের ইমামকে ডেকে আনতে। ইমাম আসার পর ঐ সেনা কর্মকর্তা তাঁকে তাড়াতাড়ি কবর দেয়ার জন্য বলেন। ততোক্ষণে ইমাম জেনে গেছেন যে মরদহেটি কার। তিনি শান্তভাবে বলেন,“এটা কি কোনো মুসলমানের লাশ? যদি তাই হয়, তাহলে গোসল করিয়ে জানাজা দেয়ার পরই তা দাফন করা যাবে।” সেনা কর্মকর্তা তাঁকে এসব কিছু ভুলে গিয়ে সরাসরি কবর দিতে কঠিনভাবে নির্দেশ দেন। এবার ইমাম বলেন যে একমাত্র শহীদ হলে ব্যতিক্রম করা যায়। “তাহলে কি তিনি একজন শহীদ?” এবার ঐ সেনা কর্মকর্তা এই ভারী প্রশ্নের গুরুত্ব বুঝতে পারেন। কেননা, একজন মুসলমান তখনই শহীদ হয়, যখন সে তার আদর্শের জন্য লড়াই করতে গিয়ে প্রাণ দেয়। তাকে গোসল ছাড়াই দাফন করা হয় যেন তার শরীরের ক্ষতগুলো শেষ বিচার দিবসে তার শহীদি মৃত্যুর সাক্ষ্য বহন করে।

সেনা কর্মকর্তা এরপর তাড়াতাড়ি গোসল ও জানাজা সেরে কবর দেয়ার জন্য তাগাদা দেন।  কাছাকাছি একটি গোয়াল ঘর থেকে ভাঙ্গা একটা বালতি নিয়ে তাতে করে চাপকল থেকে পানি আনা হয় মুজিবের মৃতদেহ গোসল দিতে। গ্রামের দোকানে মেলা সবচেয়ে সস্তা কাপড়ধোয়ার সাবান ব্যবহার করা হয় গোসলের সময়। তবে গ্রামে কোথাও পরিস্কার সাদা কাপড় পাওয়া যাচ্ছিল না। একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন যে কাছেই রেডক্রস হাসপাতাল থেকে শাড়ি আনা যাবে। মুজিবই শাড়িগুলো দান করেছিলেন। “উই হ্যাভ নো অবজেকশন। ইউ ক্যান ব্রিং এনিথিং ইউ  লাইক। বাট ইউ আর ‍টু কমপ্লিট দ্য ব্লাডি বুরিয়াল বিজনেস কুইকলি (আমাদের কোনো আপত্তি নেই। তোমাদের যা ইচ্ছে তাই আনো। কিন্তু এই দাফন-কাফনের কাজ তাড়াতাড়ি শেষ করো),” মেজর সামরিক ইংরেজিতে  কথাগুলো বলেন যেখানে ‘ব্লাডি’ শব্দের ব্যবহারই সবকিছু বুঝিয়ে দেয় ।

হাসপাতাল থেকে তিনটি শাড়ি আনা হলো। শাড়িগুলোর লাল পাড় দাড়ি কামানোর ব্লেড দিয়ে কেটে আলাদা করা হলো যেন সাদা কাফনের কাপড় তৈরি করা যায়। সেগুলো সেলাই দেয়ার কোনো সময় ছিল না। তড়িঘড়ি করে জানাজা সম্পন্ন করা হয় যাতে ২৫জন লোক অংশ নেয়। এরপর মুজিবের মরদেহ তাঁর বাবার [শেখ লুৎফর রহমান] কবরের পাশে চিরদিনের জন্য শুইয়ে দেয়া হয়। মেজর ও তাঁর সেনা রক্ষীরা সন্ধ্যা নামার আগেই হেলিকপ্টারে চেপে বসতে পারেন। আর রাত নামার আগেই নিরাপদে ঢাকায় ফিরে আসেন।

এভাবেই জীবনাবসান হয় শেখ ‍মুজিবের – যে মানুষটি ছিলেন জাতির পিতা।

[এস এ করিম রচিত শেখ মুজিব: ট্রায়াম্প অ্যান্ড ট্রাজেডি (ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড, ঢাকা, ২০২০) বইয়ের ৫৭তম অধ্যায়ের (দ্য এন্ড অব দ্য মুজিব রিজিম) শেষাংষের বাংলা রূপান্তর করেছেন আসজাদুল কিবরিয়া]

asjadulk@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic