Loading...
The Financial Express

নিউটন বনাম লিবনিজ: ক্যালকুলাস বিতর্ক!

| Updated: August 05, 2022 13:45:06


নিউটন বনাম লিবনিজ: ক্যালকুলাস বিতর্ক!

আইজ্যাক নিউটনকে মানুষজন নিরীহ ভদ্রলোক হিসেবেই জানে। একবার তিনি ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য হয়েছিলেন। খুব চুপচাপ থাকতেন। 

হঠাৎ একদিন সংসদে কথা বলার জন্য হাত তুললেন সবাই বেশ কৌতুহল নিয়ে তার দিকে মনোযোগ দিলেন কী বলে শুনতে। কিন্তু সবাইকে হতাশ করে নিউটন জানালেন, ভেতরে বসে থাকতে তার খুব গরম লাগছে। কেউ জানালা খুলে দিলে তিনি কৃতার্থ হবেন। ব্যাপারটাতে হাস্যরস আছে বলা যায়। তবে নিউটনের সরলতাও একইসাথে স্পষ্ট। এই সরল ও নিপাট ভদ্রলোকটিই বিজ্ঞানকে এক অনন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন।

নিউটন বেশ প্রচারবিমুখ মানুষ ছিলেন। তবে নিজের তত্ত্বগুলো আগলে রাখতেন বেশ। ১৬৬৪ - ৬৬ সালের দিকে তিনি ক্যালকুলাসের মূল ধারণাগুলো বুঝতে সমর্থ হন এবং ১৬৬৯, ১৬৭১, ১৬৭৬ সালে ক্যালকুলাস বিষয়ক তিনটি তত্ত্বগ্রন্থ লিখেন। এর কোনোটিই যদিও তখন তিনি প্রকাশ করেননি।

নিউটন তার তত্ত্বগ্রন্থ প্রকাশ না করলেও সমসাময়িক অন্যান্য গণিতবিদদের সাথে যোগাযোগ রাখতেন। তাদের অনেকের সাথে ক্যালকুলাস সংক্রান্ত চিঠি বিনিময়ও করেন তিনি। এসব চিঠিতে অস্পষ্ট করে কেবল কিছু তত্ত্ব ও সমস্যার বিবরণ ছিল। 

তেমনই কিছু চিঠি পেয়েছিলেন গটফ্রিড লিবনিজ। লিবনিজ একাধারে সম্ভাবনা তত্ত্ব, বাইনারি পদ্ধতি, জীববিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞানের অনেক সফল তত্ত্বের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন।

নিউটনের চিঠি পাওয়ার পর ১৬৭৪ সালের দিকে ক্যালকুলাসের মূল ধারণাগুলোকে নিজের মতো করে প্রতিষ্ঠা করতে শুরু করেন লিবনিজ। ১৬৮৪ সালের দিকে ছয় পৃষ্ঠায় তত্ত্ব আকারে তা প্রকাশ করেন। লিবনিজের তত্ত্ব বেশ দুর্বোধ্য হলেও ক্যালকুলাস সংক্রান্ত কোনো তত্ত্বের সেটিই ছিল প্রথম প্রকাশ৷

এমনকি নিউটন ক্যালকুলাস নিয়ে তার তত্ত্ব জনসমক্ষে আনেন এ ঘটনারও বিশ বছর পরে, ১৭০৪ সালে। অপর একটি তত্ত্ব প্রকাশ করেন ১৭১১ সালে এবং তৃতীয় তত্ত্বটি জীবদ্দশায় প্রকাশ করে যেতে পারেননি।

তত্ত্ব প্রকাশের পর প্রথমে লিবনিজ নিজেকে ক্যালকুলাসের আবিষ্কারক দাবি করে চিঠি লিখে পাঠান নিউটনের এক বন্ধুকে। এদিকে লিবনিজের এক বন্ধু ধরেই নিয়েছিলেন লিবনিজের এসব তত্ত্বের সমাধান করতে পারবে না নিউটন। সে বন্ধুটি রীতিমতো নিউটনকে চ্যালেঞ্জ করে বসেন। নিউটন অবশ্য সেসব সমস্যা সমাধান করে এক প্রকার চুপ করিয়ে দেন লিবনিজ ভক্তদের৷ তবে ক্যালকুলাস বিতর্ক জমে উঠতে থাকে।

নিউটনের শুভাকাঙ্ক্ষীরা ও চুপ করে বসে থাকেনি। নিউটনের এক বন্ধু লন্ডনের রয়্যাল সোসাইটি থেকে এক দলিল প্রকাশের মাধ্যমে নিউটনকে ক্যালকুলাসের জনক ঘোষণা করে।

লিবনিজ ও নিউটনের মধ্যে আঠেরো শতকের পূর্বে বেশ সুসম্পর্ক ছিল। নিজেদের তত্ত্ব ও গবেষণা নিয়ে তখন তারা চিঠি আদান প্রদান করতেন একে অন্যের সাথে। নিউটনের শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধুটি এমনই একটি চিঠি প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরে দাবি করেন যে নিউটনের কাছ থেকেই ক্যালকুলাসের ধারণা পেয়েছিলেন লিবনিজ। লিবনিজের তত্ত্বকে ঐ বন্ধুটি চুরির মাধ্যমে প্রাপ্ত জ্ঞান হিসেবে অভিহিত করেন। এসবে ক্রুদ্ধ হয়ে বিতর্ক উসকে দেয়ার অভিযোগ তুলে রয়্যাল সোসাইটিকে ক্ষমা চাইতে বলেন লিবনিজ। 

লিবনিজের অভিযোগের পর ক্যালকুলাস ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় রয়্যাল সোসাইটি। তদন্ত কমিটি পুরনো চিঠিপত্র ও প্রয়োজনীয় তথ্যাদি ঘেঁটে সিদ্ধান্ত দেয় যে নিউটনই ক্যালকুলাসের প্রকৃত জনক। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে এ সময়ে রয়্যাল সোসাইটির সভাপতি ছিলেন স্বয়ং নিউটন। তদন্ত কমিটিতে না থাকলেও তদন্ত প্রতিবেদনটিও তিনিই সহস্তে লিখেন।

লিবনিজের জন্য এ ঘটনাটি বড় রকমের পরাজয় ছিল। তবে সমসাময়িক বিজ্ঞানীদের অনেকেই লিবনিজকে ক্যালকুলাসের আবিষ্কারক হিসেবে সম্মান করতেন। এ বিতর্ক বিংশ শতকেও চলে আসছিল। তবে বিংশ শতকের কয়েকজন বিজ্ঞানী মিলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে পুনরায় নিউটনকে ক্যালকুলাসের আবিষ্কারক ঘোষণা করেন।

নিউটন ক্যালকুলাসের আবিষ্কারক হলেও তার তত্ত্বগুলো ছিল সেকেলে এবং বাস্তবিক প্রয়োগের অনুপযোগী। এর ব্যবহার বর্তমানে নেই বললেই চলে।

বাংলাদেশে বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীরা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের উচ্চতর গণিত বই পাঠের মধ্য দিয়ে ক্যালকুলাসের সাথে পরিচিত হয়। গণিত ও গণিত সংক্রান্ত অন্যান্য ক্ষেত্র এবং গবেষণায় ক্যালকুলাসের অবদান ব্যাপক। এবং এ সকল ক্ষেত্রে এখন লিবনিজের ক্যালকুলাসই ব্যবহৃত হয়। গটফ্রিড লিবনিজের আবিষ্কৃত ক্যালকুলাসের গাণিতিক পদ্ধতিকে বলা হয় নোটেশন বা অঙ্কপাতন পদ্ধতি। 

মোঃ সবুজ বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।

sabujz365@gmail.com

Share if you like

Filter By Topic