বিপ্লব, আন্দোলন, যুদ্ধ—এই শব্দগুলো শুনলে প্রথমেই চোখের সামনে কাদের ছবি ভাসে? প্রথমেই হয়তো চোখের সামনে ভাসবে ডানপিটে কিছু যুবকের ছবি যাদের হাতে অস্ত্র আর চোখে দৃঢ় প্রত্যয়। নারী বিপ্লবীর কথা বলতে হলে তাই যেন আলাদা করে ‘বিপ্লবী’ শব্দের আগে ‘নারী’ শব্দটি যোগ করে নিতে হয়। ঠিক যেমনটা নারী চিকিৎসক, নারী সাহিত্যিক এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে করা হয়। এর বড় কারণ হচ্ছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কর্তৃত্ব কিংবা এগিয়ে চলার রসদ সব পুরুষের হাতে। নারী যখন সেই কাতারে এগিয়ে যায়, তখনো তাকে নিজের পরিচয় আলাদা করে জানান দিতে হয় নিজের অবস্থানের আগে ‘নারী’ যোগ করে। বর্তমানে যথেষ্ট পরিবর্তন ঘটেছে, তাতে সন্দেহ নেই। তবে আজকের এ লেখায় আমরা কথা বলব ইতিহাসের পাতায় থাকা কিছু বিপ্লবী নারীকে নিয়ে, যাদের নিপুণ অবদান ইতিহাস এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে তাঁদের নাম ভাস্বর করে রেখেছে।
ইলা মিত্র
‘হেই সামালো ধান হো, কাস্তেটা দাও শাণ হো/জান কবুল আর মান কবুল, আর দেব না আর দেব না রক্তে বোনা ধান মোদের প্রাণ হো’; সলীল চৌধুরীর এই গানটি মনে করিয়ে দেয় কৃষকের বঞ্চিত জীবনের কথা, ভাগের ধান ছিনিয়ে নেওয়ার বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে ওঠা এক আন্দোলনের কথাও। ‘নাচোলের রানি’ খ্যাত ইলা মিত্র বিখ্যাত হয়ে আছেন এই তেভাগা আন্দোলনের হাল ধরার জন্য। ১৯৪২ সালের দুর্ভিক্ষের ফল হিসেবে বাংলায় যখন কৃষকদের ওপর শাসন-শোষণের পারদ চরমে ওঠে, তখন তারা রুখে দাঁড়ায় ভূমি মালিকদের সামনে। আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণ চলতে থাকে দু’ পক্ষেই। ১৯৪৫ সালের দিকে স্থানীয় শিক্ষিকা ইলা শিক্ষাদান কর্মসূচির সঙ্গে সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন কৃষক-মজুরদের জীবনের সঙ্গেও। তিনি ছিলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের এক জমিদার বধূ, শিক্ষিকা হওয়া নিয়ে সমস্যা না হলেও বিপ্লবী হয়ে ওঠাটা সে সময়ের সে শ্রেণির একজন নারীর জন্য বেশ কঠিন ছিল। তবে যোগ্য জীবনসঙ্গী রমেন্দ্র মিত্রের সমর্থনে ইলা সে পথও পাড়ি দেন। ১৯৪৬ থেকে ১০৫৩ সাল পর্যন্ত তিনি সেই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে যান, যাকে ‘নাচোল বিদ্রোহ’ও বলা হয়। আন্দোলন চলাকালীন তিনি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন, শিকার হন বহু নির্যাতনের। তারপরও সহযোদ্ধাদের নিয়ে একটি কথাও বলেননি তিনি।
প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার
‘কারার ঐ লৌহকপাট, ভেঙে ফেল, কর রে লোপাট, রক্ত-জমাট শিকল পূজার পাষাণ-বেদি। ওরে ও তরুণ ঈশান!’
কবি নজরুলের বিদ্রোহী কবিতার গর্ভে কেবল তরুণ নয়, ছিল সমস্ত অন্যায় বিপরীত প্রতিবাদে সব মানুষের আত্মার মশালে ঠুকে দেওয়া বারুদ। এমনই এক বারুদ ঠুকেছিল চট্টগ্রামের মেয়ে প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের আত্মা-মগজে। ছাত্রজীবনেই নানাবিধ বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে একাগ্রতা পোষণকারী প্রীতিলতা উচ্চ শিক্ষার প্রয়োজনে কলকাতার বেথুন কলেজে দর্শন বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। কলকাতায় সূর্য সেনের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। প্রীতিলতা তাঁকে ‘মাস্টার দা’ বলে সম্বোধন করতেন। প্রথমদিকে দলের বিভিন্ন সদস্যদের প্রীতিলতার যোগদান প্রসঙ্গে আপত্তি থাকলেও শেষতক তিনি ঠিকই সূর্য সেনের দলের এক অনস্বীকার্য সদস্য হয়ে উঠতে পেরেছিলেন। ১৯৩০ সালে ব্রিটিশ অস্ত্রাগার লুট ও সমস্ত টেলিফোন, টেলিগ্রাফ সংযোগ বিচ্ছিন্নের দলে ছিলেন বিশ বছর বয়সী ওয়াদ্দেদার।
শেষপর্যন্ত অস্ত্র লুট পর্ব ভেস্তে গেলেও; টেলিফোন, টেলিগ্রাফ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা গিয়েছিল। এ অপারেশনে দলের বিভিন্ন সদস্য গ্রেপ্তার সত্ত্বেও প্রীতিলতাসহ আরও বেশ কজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ঘটনার মাস পাঁচেক পর সূর্য সেন পরিকল্পনা করেন ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণের। দশ সদস্যদের বিপ্লবী দলের নেতৃত্বে ছিলেন প্রীতিলতা। ১৯৩২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর রাতে অপারেশন চলে ইউরোপিয়ান ক্লাবে। একপর্যায়ে বিপ্লবীদের ওপর অতর্কিতে গুলি বর্ষণ করে পুলিশ। মরব আমি তবু তোমার হাতে নয়, এমন বিপ্লবী কথার ঢাক যেন বাজছিল তখন ওয়াদ্দেদারের বুকে। পটাশিয়াম সায়ানাইড খেয়ে নিজেকেই নিজে চিরশায়িত করে প্রীতিলতা প্রমাণ করলেন, ‘আমি মরি নাই’।
লক্ষ্মীবাঈ
মরোপান্তে তাম্বে ও ভাগীরথী বাঈর সন্তান মণিকর্ণিকা। খুব কাঁচা বয়সে হারিয়ে ফেলেন জন্মদাত্রীকে। বাবা মরোপান্তে ছিলেন বিঠুরের রাজা দ্বিতীয় বাজিরাওয়ের রাজ পুরোহিত।
সে সুবাদে রাজা বাজিরাওয়ের অত্যন্ত স্নেহের ছিল তাম্বে পুত্রী। অল্প বয়সেই ঝাঁসি রাজ্যের রাজা গঙ্গাধর রাওয়ের সঙ্গে পরিণয় ঘটে মণিকর্ণিকার। কথিত আছে, গঙ্গাধর রাওই পরবর্তীতে তাঁর স্ত্রী মণিকর্ণিকাকে লক্ষ্মীবাঈ বলে সম্বোধন করতেন। ১৮৪৮ সালের ১২ই জানুয়ারি গভর্নর লর্ড ডালহৌসি নতুন এক আইন জারি করেন, যার নাম ‘ডকট্রিন অব ল্যাপ্স’ বা স্বত্ত্ব বিলোপ নীতি। আইনটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে, উত্তরাধিকার শূন্য সব রাজ্যের ক্ষমতা যাবে ব্রিটিশদের হাতে।
তত দিনে রানি লক্ষ্মীবাঈ তাঁর তিন মাস বয়সী একমাত্র পুত্র এবং গঙ্গাধর রাওকে চিরতরে হারিয়ে ফেলেন। ব্রিটিশদের নানাবিধ লোভনীয় প্রস্তাবে সাড়া না দিয়ে এবং ব্রিটিশদের কুটিল আইন তর্কে সুবিধা করতে না পেরে লক্ষ্মীবাঈ বেছে নিলেন যুদ্ধক্ষেত্র। জেনারেল হিউরোজের বিশাল যুদ্ধ প্রস্তুতিতে এক পা পিছু হটলেন না বিপ্লবী এই নারী। মৃত্যু সুনিশ্চিত জেনেও, যুদ্ধক্ষেত্রে সৈনিকদের অনুপ্রেরণা দিতেন ‘মারো এবং মরো’ আওয়াজ যোগে। লক্ষ্মীবাঈ জানতেন, পরাজয়ের চাইতে মৃত্যু বরং বেশি সুন্দর। ভারতবর্ষে জন্ম নেওয়া এ বিপ্লবী আজও পৃথিবীর সমস্ত নারী সত্তার প্রতিবাদী কন্ঠস্বরে দৃঢ় প্রভাবক হিসেবে রয়ে গেছেন এবং থাকবেন নিঃসন্দেহে।
সাহিত্য-গানে-বাণীতে নারীদের রাখা হয়েছে পুরুষের প্রেরণা কিংবা সঙ্গে চলার সঙ্গী হিসেবে। সে ভূমিকায় নারী নিজেকে বারবার প্রমাণ করেছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে নারী নিজেও যে সম্মুখসমরে অংশ নিতে পারে এবং নিজের অস্তিত্বকে নিপীড়িত গোষ্ঠীর স্বার্থে, বৃহদার্থে মানবজাতির জন্য গড়তে এবং ভাঙতে পারে, তার উদাহরণ এই নারীরা। তারা বিপ্লবীর সঙ্গী বা সহযাত্রী হয়েই ক্ষান্ত দেননি, নিজেকেই প্রকাশ করেছেন বিপ্লবী হিসেবে।
