Loading...
The Financial Express

নসফেরাতু: একশ বছর পর

| Updated: August 19, 2022 12:33:24


নসফেরাতুর চরিত্রে প্রখ্যাত জার্মান অভিনেতা ম্যাক্স শ্রেক,   ছবি: নর্থজার্সি.কম/ গেটিইমেজেস/কনভার্সেশন.কম নসফেরাতুর চরিত্রে প্রখ্যাত জার্মান অভিনেতা ম্যাক্স শ্রেক,   ছবি: নর্থজার্সি.কম/ গেটিইমেজেস/কনভার্সেশন.কম

১৯২১ সালের ৩১ জুলাই। জার্মানির সংবাদপত্রে দেখা গেলো একটি অদ্ভুত বিজ্ঞাপন।

কাস্টিং কল বা অভিনয়শিল্পী চাওয়া হয়েছে সেখানে।

সেখানে লেখা:

চাই: ৩০-৫০ টি জ্যান্ত ইঁদুর!

 

কিন্তু কী হবে এতগুলো ইঁদুর দিয়ে? জানা গেল, সেসব কাজে লাগবে চলচ্চিত্র পরিচালক এফ ডব্লিউ মরনুর। তিনি জার্মানির এক্সপ্রেশনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা। তৈরি করছেন ভয়ের চলচ্চিত্র 'নসফেরাতু।' জার্মানির শহর উইসমারে তখন এ নিয়ে শুটিংয়ে ব্যস্ত তিনি।

ভয়ের নতুন নাম

নসফেরাতু মুক্তি পায় ১৯২২ সালের ১৫ মার্চ। আজ থেকে একশ বছর আগে। জার্মানিতে তখন ক্যাবিনেট অভ ড. ক্যালিগারির মত সিনেমা নির্মিত হয়েছে। তবে নসফেরাতু ভয়ের নতুন সমীকরণ তৈরি করে।

ব্রাম স্ট্রোকারের 'ড্রাকুলা'-র ছায়া অবলম্বনে মরনু এটি বানান। তবে ড্রাকুলার নাম দেয়া হয় কাউন্ট অরলোক। নসফেরাতু কথাটি প্রচলিত ছিলো প্রাচীন রোমান সামাজ্র‍্যে। মরনু ড্রাকুলার চরিত্রের পরিচয় দেন এই শব্দে।

মুক্তির পরপরই ছবিটি ঝড় তুলে ফেলে। কাউন্ট অরলোকের চরিত্রে অভিনয়কারী ম্যাক্স শ্রেক হয়ে ওঠেন ভয়ের প্রতিশব্দ।

তবে এই ছবিতে কাউন্টের বাহন হিসেবে বাদুড় ছিলো না, ছিল ইঁদুর। তাও নিছক খেয়ালের বশে নয়।

 

ছবির একটি মাত্র প্রিন্ট বাঁচলো

ছবি মুক্তির বছর দশেক পরে প্রয়াত ব্রাম স্টোকারের স্ত্রী ফ্লোরেন্স কপিরাইট ইস্যুতে মামলা করলেন। আদালতের রায়ে সে সময় ছবিটির সমস্ত কপি পোড়ানো হয়েছিল। কিন্তু একটি কপি বেঁচে যায়। যার ফলে সারাবিশ্বে আজ একশ বছর পরেও মানুষ ছবিটি দেখতে পারছে। 

নসফেরাতু সিনেমার পরিচালক এফ ডব্লিউ মরনু। ছবি: টার্নার ক্লাসিক মুভিজ

 

বাদুড় নয়, ইঁদুর কেন?

১৯৩১ এর বিখ্যাত 'ড্রাকুলা' সিনেমায় ড্রাকুলারূপী বেলা লুগোসির টোটেম ছিলো বাদুড়। ব্রাম স্টোকারের মূল লেখাতেও ছিলো তাই। কিন্তু মরনু নসফেরাতুর বাহন হিসেবে নিয়ে এলেন ধাড়ি ইঁদুর।

না, নিছক খেয়ালের বশে এমন করেননি তিনি। বরং হররের ভেতর দিয়ে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন সে সময়ের সামাজিক বাস্তবতা।

গবেষক ক্রিশ্চিয়ান বিকলের মতে, মারনু আসলে সে সময়ের মহামারি পরবর্তী জার্মানিকে তুলে ধরতে চেয়েছিলেন।

১৯১৮ - ২০ সালে ইউরোপ ছেয়ে গিয়েছিল স্প্যানিশ ফ্লু - তে। আর এর বাহক ছিলো ইঁদুর। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, সামাজিক অস্থিতিশীলতা সে সময় জার্মানির জনসাধারণকে হতাশায় নিমজ্জিত করে রেখেছিল। বিভিন্ন রকম গুজবের উৎপাদন ও মব জাস্টিসের প্রবণতা বাড়ছিলো। এই সিনেমাতেও ক্লাইম্যাক্সের প্রাক্কালে একজন উন্মাদকে উত্তেজিত জনতার ধাওয়া দেয়ার দৃশ্য দেখা যায়।

এই চলচ্চিত্রে কাউন্ট হলো সাক্ষাৎ যমদূত, মৃত্যুর প্রতিরূপ। আর তার বাহন ইঁদুর। কাউন্ট যখন জাহাজের ভেতর তার কফিন থেকে জেগে ওঠে, তখন ইঁদুরের পাল ছুটে আসে। জাহাজের দুজন নাবিককে মেরে কাউন্ট তার অভীষ্ট লক্ষ্যে জাহাজ ঘুরিয়ে নেয়।

এখানে ইঁদুর ব্যবহার করে মরনু জার্মানির জনসাধারণের মনের ভয়-হতাশাকে যুক্ত করেছিলেন পর্দার এই ভয়াবহতার সাথে।

কফিনে শোয়া কাউন্ট অরলককে দেখছেন জোনাথন হারকার, ছবি: কনভার্সেশন.কম

নিছক ভ্যাম্পায়ার মুভি নয়

ক্রিশ্চিয়ান বিকলে এর লেখা থেকে জানা যায়, সে সময়ের জার্মানিতে এই স্প্যানিশ ফ্লু-র সংক্রমণে ২,৮৭,০০০ এর মত মানুষ মারা যায়। জার্মানির জনগণের চূড়ান্ত হতাশা একদিকে তাদের ধাবিত করে হিটলারের মত উগ্র জাতিবাদী শাসক বেছে নিতে, আরেকদিকে হতাশা থেকে পালিয়ে বাঁচতে হররের জগতে বুঁদ হতে।

দি ক্যাবিনেট অভ ড. ক্যালিগারি, দি গোলেম, ওয়ার্নিং শ্যাডোস, টায়ার্ড ডেথ - এর মত সিনেমাগুলোর জনপ্রিয়তা এর প্রমাণ।

তবে ড্রাকুলার মত শুধু রক্ত শুষে থেমে থাকেনি মরনুর নসফেরাতু; জাহাজ দখল করে যখন সে অভীষ্ট শহরে পৌঁছতে চায়, তখন তার আগে সেখানে তীরবেগে ছুটে যায় এক দঙ্গল ইঁদুর।

এভাবে ভৌতিকতার মোড়কে সে সময়ের জার্মানির মৃত্যুময়তা, ভগ্ন অবস্থাকে মৃত্যুর দূত নসফেরাতু ও তার বাহন ইঁদুরের মাধ্যমে তুলে ধরেছিলেন মরনু।

একশ বছর পরেও প্রাসঙ্গিক

জীবদ্দশায় ছবিটির এই সাফল্য দেখে যেতে পারেননি এফ ডব্লিউ মরনু। সব প্রিন্ট পোড়ানোর পর তার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটিও দেউলিয়া হয়। হলিউডে গিয়ে পরে সানরাইজ (১৯২৭) এর মত সিনেমা বানালেও স্বপ্নের সিনেমা নসফেরাতু নিয়ে চাপা একটা কষ্ট তার সবসময়ই ছিলো। কিন্তু আজ তার এই সিনেমা সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হরর সিনেমা হিসেবে স্বীকৃত। এটি এখন পপ কালচারের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এর একাধিক রিমেক হয়েছে, প্রতি হ্যালোইনে অন্যতম আকর্ষণ,  এমনকি এই নামে বিয়ার পর্যন্ত আছে! অভিনেতা ম্যাক্স শ্রেক এর নামে ১৯৯২ সালে ব্যাটম্যান সিরিজের খলচরিত্রের নামকরণ করা হয়েছিলো।

অভিনেতা ম্যাক্স শ্রেক ছিলেন ভয়ের অপর নাম।   ছবি: উইকিমিডিয়া কমনস

 

কিন্তু এসব কিছু দেখার, এমনকি আরো অনেক সিনেমা বানানোর ইচ্ছাও অপূর্ণ রয়ে যায় মরনুর। ১৯৩১ সালে হলিউডেই গাড়ি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় তার। মরনুর জানার কোন উপায় রইলো না, তার মৃত্যুর ৮৯ বছর পর আবার পৃথিবীজুড়ে কোভিড মহামারী আসবে, আবার রাশিয়া - ইউক্রেন যুদ্ধে পৃথিবী উত্তাল হবে এবং তখনও ১০০ বছর আগে তার করা ভৌতিকতার মোড়কে মহামারীর এই চিত্র প্রাসঙ্গিক থেকে যাবে। সিনেমাটিতে যেমন ছিল সমস্ত মানুষ বিবর্জিত হয়ে কাউন্টের প্রাসাদে জোনাথন হারকারের একা থাকা, প্রেমিকা থেকে আলাদা অবরুদ্ধ জীবন, আবার এক উন্মাদকে উত্তেজিত জনতার প্রহার - এসবকিছু কিছুদিন আগেও তীব্র থাকা কোভিড মহামারির সাথেও মেলানো যায়।

মরনু মানুষকে নিছক ভয় পাওয়াতে চাননি, তিনি মূলত মহামারীর সময়ের জার্মানিকেই তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। আর এখানেই নসফেরাতু অন্যান্য ভৌতিক সিনেমা থেকে আলাদা ও ঐতিহাসিক মূল্য লাভ করেছে।

মাহমুদ নেওয়াজ জয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ সাংবাদিকতা বিভাগে চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।

mahmudnewaz939@gmail.com 

 

 

Share if you like

Filter By Topic