"চারিদিকে হট্টগোল। কখন, কোথায়, কার ওপর হামলা হয় কেউ জানে না। একদিন সকালে আমার মা দেখতে পায় যে তাকে বাড়িতে রেখে সবাই চলে গেছে। তিনি ভয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।"
কথাগুলো বলছিলেন ভারতের নাগরিক সিকা খান। তিনি ৪৭'য়ের দেশভাগে তার পুরো পরিবারকে হারান। মা ছাড়াও পরিবারে তার এক ভাইও ছিল। ভাই কোথায় তিনি জানতেন না, জীবিত নাকি মৃত তা নিয়েও সংশয়।
সত্তর বছর পর ভাইয়ের দেখা
ভারত ভাগের সাত দশক পর একজন ইউটিউবারের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া ভাইয়ের খোঁজ পান তিনি। প্রথমে তারা ভিডিও কলে কথা বলেন, তারপর পাকিস্তানের কারতারপুর করিডরের মধ্যে দিয়ে এতো বছর পর প্রথম দেখা হয়।
দেখা মাত্রই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন দুই ভাই। ফুলের মালা দিয়ে ভাইকে বরণ করেন সিকা।
আমার ঘর তো বিলীন হয়ে গেল
আসাদের বাবা একজন চিকিৎসক ছিলেন। দেশ ভাগের আগে ভারতে তাদের দোতলা বাড়ি ছিল। নিচ তলায় চলতো রোগী দেখা আর চিকিৎসা, উপরে থাকতো পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা।
স্বাধীনতার সত্তর বছর পর আসাদের ছেলে তাদের পুরানো বাড়ি দেখতে এসে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, "আমার ঘর তো শেষ হয়ে গেলো।"
"এই ঘর কত প্রাণবন্ত ছিল। আমরা ছোটরা থাকতাম উপরের ডান পাশের কক্ষে, এই খিলানগুলো আগে দেখতে কত বিশাল ছিল। এখন ছোটো লাগছে, কিছু নেই!" - ঘরের প্রতিটি কোণ আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে কথাগুলো বলছিলেন তিনি।
ভারতের অবস্থিত এই ঘরে আরেকজন ডাক্তারের বাস। তবে তারা ঘরটি একটি স্টোর রুমের মতো পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রেখেছে।
সময়ের সাথে সবকিছু বদলে যায়। নিজের সবচেয়ে কাছের বস্তু পর হয়ে যায়। আসাদের ছেলের অবস্থাও এমন।
বাড়ি ত্যাগ করার আগে তিনি আফসোসের সাথে বলেন, "এই দেশ, এই ঘর আমার নয়, আমি এখানকার নয়।"
আমি আমার দেশে যেতে চাই
কৃষণ কুমার কান্নার বয়স নব্বইয়ের ঘর অতিক্রম করেছে। নিজের জীবনের এই পড়ন্ত বিকেলে তার একমাত্র ইচ্ছে লাহোর দেখার। যে লাহোরে তার ‘সব আছে’ থেকে ‘সব ছিল’ হয়েছিল রেডক্লিফের দাগ আর রক্তাক্ত তরবারির আঘাতে।
সাত বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর অবশেষে পাকিস্তানের ভিসা পান কৃষণ। ভারতের উত্তরে তার আবাস। নাতি-নাতনি আর বর্ধিত পরিবারের সবাইকে নিয়েই থাকেন। তারপরও অপূর্ণতা থেকে যায় নিজের মাতৃভূমি নিয়ে।
_(1).jpg)
লাহোরে কৃষণ কুমার খান্না। ছবি: আল-জাজিরা
সত্তর বছর পর পাকিস্তান ঘুরে আসেন তিনি। পাকিস্তানের শহর গুজরাওয়ালাতে গিয়ে বলেন, "এই মাটি, লোক এখানে যা ওখানেও তা। আবহাওয়াও একই।"
তারপর সেখান থেকে যান শেখুপুড়ায় যেখানে কৃষণের বাড়ি ছিল। চিপা-চাপা সাপের মতো অলিগলি তার কাছে এখনো পুরানো হয়নি। তিনি চিনতে পারেন সবকিছু।
"আমি একাই যেতে পারবো এই গলি দিয়ে। ওই যে আমার ঘর।" ঘরের বর্তমান বাসিন্দারা জানান এর কাগজপত্র জ্ঞান চাঁদের নামে। জ্ঞান চাঁদ কৃষণ পরিবারের কেউ কিনা তা স্পষ্ট নয়।
নিজের বাড়িতে গিয়েই থামেননি ৯২ বছরের কৃষণ কুমার। ছোটবেলার বিদ্যালয় গিয়েও ঘুরে আসেন তিনি। বলেন, "এখানে একটা দেয়াল ছিল। আমি কখনো স্কুলের নিয়ম ভঙ্গ করিনি। কিন্তু একদিন শুনি জওহরলাল নেহেরু বক্তৃতা দিতে আসবে। তো আমি হেডমাস্টারের অনুমতি নিতে যাই। তিনি অনুমতি না দিলে দুই বন্ধু দেয়াল টপকে পালিয়ে যাই।"
নিজের সমবয়সী কাউকে না পেয়ে ভারত ফিরে আসেন কৃষণ। তার নাতি-নাতনিরা পাকিস্তান আর তার ঘর সম্পর্কে অনেক প্রশ্নই করে। পাকিস্তানের লোক কেমন, তাদের মাঝে সন্ত্রাসী আছে কিনা। উত্তরে এই বয়েসী জানান তিনি অনেক ভালোবাসা পেয়েছেন।
তিনি বলেন,"ওরা অনেক ভালোবাসা দিয়েছে। আমি তো কোনো সন্ত্রাসী দেখলাম না।"
নিজের পুরান বাড়ির গলির সাথে স্বাধীনতার দগদগে স্মৃতি জড়িয়ে আছে কৃষণের। তিনি বলেন, "বাড়ির নিচে, রক্তাক্ত অবস্থায় তিন-চারজন পড়েছিল। চাকু-ছুড়ির আঘাতে ছিন্নভিন্ন তাদের শরীর। একজন প্রশ্ন করে, এই কি স্বাধীনতা তোমরা চেয়েছিলে?"
এরকমই প্রশ্ন রাখেন পাকিস্তানের বিখ্যাত কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ। দেশভাগের প্রথম প্রহরে "সুবহে আজাদী" কবিতায় তিনি প্রশ্নটি রাখেন।
"এই ভোর,
রাতের অন্ধকার চেড়া ভোর।
এমন ভোরের আলোই কি আমরা চেয়েছিলাম?"
এর উত্তর এখনো খুঁজে বেড়ান সিকা খান আর কৃষণরা, কথা বলে তাদের ছলছল চোখ।
মোঃ ইমরান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।
imran.tweets@gmail.com
