Loading...

দীর্ঘ ছয় বছর পর শেখ হাসিনা যখন ধানমণ্ডির সেই বাড়িতে ফিরলেন

| Updated: August 16, 2022 11:21:39


১৯৮১ এর ১৫ আগস্ট ৩২ নাম্বারের সেই বাড়িতে অশ্রুসিক্ত শেখ হাসিনা ও আইভি রহমান। ছবি: সচিত্র সন্ধানী ১৯৮১ এর ১৫ আগস্ট ৩২ নাম্বারের সেই বাড়িতে অশ্রুসিক্ত শেখ হাসিনা ও আইভি রহমান। ছবি: সচিত্র সন্ধানী

চারপাশে তখন ধুলো-ময়লার আস্তরণ। মেঝেতে, সিঁড়িতে রক্তের দাগ। ছয় বছর পর ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফিরেই ধানমণ্ডি ৩২ নং (বর্তমান ১১ নং) রোডের তৎকালীন ৬৭৭ নং বাড়িতে ছুটে যান শেখ হাসিনা। কিন্তু বাড়ির খাজনা পরিশোধ করা হয়নি- এমন যুক্তিতে তাকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়নি তৎকালীন সরকার। পরবর্তীতে ১৯৮১ সালের ১০ জুন বাড়িটি নিলামে তোলা হলে ১২ হাজার টাকা দিয়ে বাড়িটি কিনে নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এরপর বাড়িটিতে তিনি প্রবেশ করতে পারলেন দীর্ঘ ছয় বছর পর। তারপর দেখলেন ধূলো জমা বাড়িটির সিঁড়িতে-দেয়ালে-মেঝেতে লেগে আছে রক্তের দাগ। একসময়ের কোলাহল মুখরিত বাড়িটি এখন খাঁ খাঁ করছে শূন্যতায়।

এরপর ১৯৮১ সালের ১৫ আগস্ট আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও সাংবাদিকদের নিয়ে তিনি বাড়িটিতে আসেন। বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত গৃহকর্মী রমা '৭৫ এর ১৫ আগস্ট কোনোরকমে পালিয়ে বেঁচেছিলেন। তাকে দেখা যায় একটি মলিন বাক্সে বিভিন্ন ঘরের চাবি নিয়ে ঘুরছেন।

সেদিন সেখানে সচিত্র সন্ধানী পত্রিকার হয়ে সংবাদ সংগ্রহ করতে এসেছিলেন মালেকা বেগম। তার লেখা থেকে সে সময়ের ঘটনাগুলো জানা যায়।

বাড়িটি দীর্ঘদিন পড়ে ছিল পোড়োবাড়ির মত। সামরিক শাসনামলে রাস্তা বন্ধ থাকা ও সেনা টহল থাকার ফলে এদিকে জনসাধারণের প্রবেশাধিকার ছিল না। বাড়ির ফুলগাছগুলো তখন পানি না পেয়ে মরে গেছে, ঘাসগুলো বাড়তে বাড়তে কোমর ছোঁয়ার পর্যায়ে এসেছে। একদিন যে বাড়িটি ছিল মানুষের কোলাহলে মুখরিত, বঙ্গবন্ধুকে একনজর দেখার জন্য বাড়ির সামনে প্রতিদিন ভিড় হতো, সেই বাড়ির দিকে বঙ্গবন্ধু হত্যার পর অনেকে আর ঠিকমত তাকাতেও পারতেন না।

শেখ হাসিনা দেশে ফেরার পর প্রথমে বাড়িতে ঢুকতে না পেরে বাড়ির সামনে রাস্তায় বসে মিলাদ পড়েছিলেন । এরপর প্রতিদিন মিলাদ পড়ানো হতো।

১৯৬১ তে বাড়িটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। সে বছর থেকেই বঙ্গবন্ধু সপরিবার এখানে থাকতেন। বাড়ির কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হয় ১৯৬৬ সালে। বঙ্গবন্ধুর সপরিবার নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ১৯৮১ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর ষষ্ঠ শাহাদতবার্ষিকীর দিনে আবার বাড়িটির সব ঘর খোলা হয়। কিন্তু তখন সবখানেই শুধু বিবর্ণতা আর তান্ডবের চিহ্ন।

সচিত্র সন্ধানীর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বঙ্গবন্ধু গুলিবিদ্ধ হয়ে সিঁড়ির যে ধাপে বসে পড়েছিলেন সেখানে ওঠার রাস্তা তখন বন্ধ করে রাখা হয়েছিল। ফলে আরেকদিক দিয়ে ঘুরে আসতে হয়েছিল।

দোতলায় বঙ্গবন্ধুর ঘরের পাশেই ছিল শেখ হাসিনার ঘর। অপরদিকে সিঁড়ির সাথেই ছিল শেখ জামালের ঘর। শেখ কামালের ঘর ছিল তিনতলায়।

রমা চাবি দিয়ে শেখ হাসিনার ঘরের দরজা খুলতেই ধুলোর তোড়ে দমবন্ধের পরিস্থিতি হয়। এরপর তার ঘরে দীর্ঘ ছয় বছর পর গিয়ে তিনি দেখেন, বিছানাপত্র, আসবাবসহ ঘরের সবকিছু লণ্ডভণ্ড করা। দেয়ালে দেয়ালে জন্মেছে উইয়ের বিশাল ঢিবি।

(বাম থেকে) আইভি রহমান, শেখ হাসিনা ও সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন। ছবি: সচিত্র সন্ধানী (আগস্ট, ১৯৮১)

পাশেই বঙ্গবন্ধুর ঘরটিতে হত্যার শিকার হন বেগম মুজিব, শেখ জামাল, সুলতানা খুকু, পারভীন রোজী ও শেখ রাসেল। শেখ নাসেরকে নিচতলায় বাথরুমে নিয়ে হত্যা করা হয়। শেখ কামালকে নিচতলায় হত্যা করা হয়েছিল সবার আগেই।

বঙ্গবন্ধুর ঘরটির মেঝেজুড়ে তখনও ঘন হয়ে ছড়িয়ে ছিল রক্তের ছাপ। পুরো ঘর তখন লণ্ডভণ্ড। বড় খাটটির পাশে রাখা টেলিফোনের তিনটি তারই কাটা। একুরিয়ামের মাছগুলো সব মরে গেছে, উইয়ের ঢিবি গড়ে উঠেছে এখানেও। দেয়ালে দেয়ালে লেগে আছে রক্তের দাগ। জানালার কাঁচ ভেঙেছে গুলিতে। দেয়ালের কোথাও কোথাও রক্তের সাথে মগজের টুকরোও শুকিয়ে আছে।

মালেকা বেগমের লেখা থেকে জানা যায়, সে সময় পুরো বাড়ির এমন অবস্থা দেখে শেখ হাসিনা স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।

বাড়িটির গেট পেরিয়ে লন ধরে এগিয়ে গাড়িবারান্দা পার হয়ে একটি ছোট অভ্যর্থনা কক্ষ ছিল। তার বামদিকে গ্যারেজ খুলতেই রমা দেখতে পান আলপনা। শেখ কামাল ও শেখ জামালের বিয়ে উপলক্ষে করা হয়েছিল৷ সেখানে জমে আছে গোলাপি বর্ণের পানিউপর থেকে সিঁড়ি ধোয়ার পানি এসে এভাবে আল্পনার পাশে জমে ছিলকে জানত, মাত্র দুসপ্তাহের ব্যবধানে সব কোলাহল শেষ হয়ে বাড়িটি হয়ে যাবে একেবারে শূণ্য!

বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িটি এখন জাদুঘরে রূপান্তরিত হয়েছে। ছবি: বঙ্গবন্ধুমিউজিয়াম.অর্গ

দেশে ফেরার পর শেখ হাসিনা তার মেজো ফুপু ও ছোট ফুপুর বাসায় অস্থায়ীভাবে থেকেছেন। কেউ বাসা ভাড়াও দিতে চাচ্ছিলেন না। পরে স্বামী ওয়াজেদ মিয়া চাকরিসূত্রে সরকারি কোয়ার্টার পেলে সেখানে ওঠেন। তবে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় ধানমণ্ডির এই বাড়িটিই ছিল তার রাজনৈতিক সংগ্রামের কেন্দ্রস্থল।

এই বাড়িতে সেসময় একাধিকবার তাকে গৃহবন্দী করা হয়। ১৯৮৯ এ বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনি সৈয়দ ফারুক রহমানের গড়া ফ্রিডম পার্টির লোকেরা তাকে হত্যার চেষ্টাও করে।

তিনি ও তার বোন শেখ রেহানা পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেন বাড়িটিকে জাদুঘরে রূপান্তরিত করবেন। সে মোতাবেক ১৯৯৩ সালে কাজ সম্পন্ন হয়। সুফিয়া কামাল, বেবী মওদুদ, পাভেল রহমানসহ কয়েকজন এক্ষেত্রে তাকে সহায়তা করেন। ১৯৯৪ সালে বাড়িটি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এরপর থেকে প্রতিবছরই ১৭ মার্চ ও ১৫ আগস্ট বাড়িটিতে মানুষের ঢল নামে। ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান অনেকেই। অন্যান্য দিনও গড়ে ৫০০ জনের মত মানুষ দেখতে আসেন বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িটি, যেটি ছিল তার সকল আমেয় সংগ্রাম ও দিকনির্দেশনার কেন্দ্র।

 

মাহমুদ নেওয়াজ জয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত।

mahmudnewaz939@gmail.cpm

Share if you like

Filter By Topic