মহররম মাসের সাথে জড়িয়ে আছে কারবালায় ইমাম হাসান (রা) ও হুসাইন (রা) এর শহীদ হবার মর্মান্তিক স্মৃতি। সপ্তদশ শতাব্দী থেকেই পুরান ঢাকায় অনেক বড় করে তাজিয়া মিছিল বের হতো। মোগল শাসকরা কিংবা পরবর্তীতে ঢাকার নবাবেরা সুন্নি মুসলিম ছিলেন। তবে তাদের নায়েব - নাজিমদের অধিকাংশই ছিলেন শিয়া। তারা ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় ইমামবাড়া প্রতিষ্ঠা করেন।
আশুরার দিনে শিয়ারা যেমন মাতম করে, গায়ে আঘাত করে শোক প্রকাশ করতেন; আবার সুন্নীদের ভেতর ছিল এদিনে ভালো খাবার রান্না ও প্রতিবেশিদের সাথে ভাগাভাগি করে নেয়ার রীতি। আশুরা শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে একটি সার্বজনীন রূপ পেয়েছিল।
এদিনের উদযাপনের একটি অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ ছিল মহররমের শরবত। ঢাকায় মোগল আমল থেকেই ছিল বিশেষভাবে তৈরি এ শরবত খাওয়ানোর রীতি। মূলত ঢাকার সুবাদার বা নায়েবদের উদ্যোগে সাধারণ মানুষকে এদিন সুস্বাদু খাবার ও এই শরবত দিয়ে আপ্যায়ন করানো হতো।
পরবর্তীতে ঢাকার নবাব পরিবার প্রতিবছর নিয়মিতভাবে এই শরবত তৈরি করে প্রজাদের ও অন্যান্য মানুষদের পরিবেশন করতে থাকে। যদিও এর উৎপত্তি এখানে নয়। এই শরবত মূলত তুরস্কে অটোমান সাম্রাজ্যের সময় প্রচলিত হয়। পরে দিল্লী-লক্ষ্ণৌ হয়ে বাংলা অঞ্চলে আসে এই শরবত।
মূলত এর প্রচলন শিয়াদের ভেতর থেকে হলেও সুন্নি মতাদর্শি নবাবেরা চমৎকার স্বাদের এই শরবতকে তাদের প্রজা আপ্যায়নের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। তবে বাংলা নববর্ষে যেমন হালখাতার প্রচলন ছিল, এটি তেমন নয়। অর্থাৎ শরবতের বিনিময়ে আলাদাভাবে খাজনা দেয়া বা কোন আর্থিক পরিশোধের ব্যাপার ছিল না।
তবে জমিদার প্রথার বিলোপ ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর এই শরবত খাওয়ানোর চল উঠে যায়। পাশাপাশি মহররম সংক্রান্ত উদযাপনের ধারাটি হয়ে পড়ে শিয়াকেন্দ্রিক। সুন্নি মুসলিমদের এদিনটি উদযাপনের যে ধরন ছিল, তাতে পরিবর্তন আসে। তবে দিল্লীসহ ভারতের বড় কিছু শহরে এখনো এই শরবতের বেশ প্রচলন দেখা যায়।
ইতিহাস তো জানা হলো। এবার দেখে নেয়া যাক এই শরবতের রেসিপি।
ঠান্ডা দুধ লাগবে এক লিটার। দুধ মোটামুটি ভারি লাগবে। চাইলে গরম দুধ ঠান্ডা করে নিয়ে ব্যবহার করা যাবে। অথবা বাজার থেকে কেনা পাস্তুরিত তরল দুধ ব্যবহার করা যাবে।
এরপর সেখানে অল্প চিনি (দুই চামচ) / কনডেন্সড মিল্ক (এক চামচের মত) দেবেন। এরপর এটি ভালোভাবে নেড়ে সিরাপ হিসেবে রুহ আফহা মেশানো যায়। দুই / আড়াই টেবিল চামচ পরিমাণ মেশালেই হবে। সাথে এক টেবিল চামচ কেওড়া জল দিতে হবে।
এরপর ৫০ গ্রামের মত পেস্তাবাদাম দিয়ে নেড়ে দিতে হবে। তারপর প্রয়োজনমত বরফ দিয়ে গ্লাসে ঢেলে পরিবেশন করতে হবে।
যদি সম্ভব হয় পেস্তাবাদাম দেওয়ার আগে লাল রঙের জেলি (জিলেটিন/চায়না গ্রাস) অল্প করে দিয়ে নাড়তে পারেন। হাতের কাছে না থাকলে প্রয়োজন নেই। সেক্ষেত্রে অল্প করে সাবুদানাও দেয়া যেতে পারে৷ তবে দিতে না চাইলে দরকার নেই।
এরপর গ্লাসে ঢেলে পরিবেশন করতে হবে মহররমের শরবত। ইতিহাসের করুণ এক অধ্যায় সম্বলিত এই দিনে পারস্পারিক সৌহার্দ্য প্রকাশের একটি মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে এই 'মহররমের শরবত।'
মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত।
mahmudnewaz939@gmail.com
