জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ার অজুহাতে ডিম ও পোল্ট্রি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি মহল ‘কারসাজি করে’ অস্বাভাবিক মূল্য বাড়িয়েছে জানিয়ে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেছেন, অপরাধীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে সরকারের উপর মহলে প্রতিবেদন দেবেন তারা।
ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ যেন না হয়, সেজন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অতিরিক্ত সচিব এএইচএম সফিকুজ্জামান। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের।
বুধবার ঢাকার কারওয়ান বাজারে অধিদপ্তরের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পোল্ট্রি খাতের ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পর্যায়ের খাত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি।
বড় উৎপাদক করপোরেট খামারি ও তাদের এজেন্ট, ক্ষুদ্র খামারি ও আড়তদারদের সঙ্গে বৈঠক করেন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। কয়েকদিনের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় এ খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বসলেন তারা। এর আগে সোমবার ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইও হঠাৎ ডিমের দাম অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এ খাতের ব্যবসায়ীদের নিয়ে বৈঠক করে।
ভোক্তা অধিকারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্প্রতি ডিজেলের মূল্য বাড়ার কারণে ময়মনসিংহের মত দূরের জেলাগুলো থেকে ঢাকায় ডিম পরিবহনে ডিমপ্রতি খরচ বেড়েছে ৩ থেকে ৪ পয়সা। অথচ এই সুযোগে ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়েছেন অন্তত ২ টাকা ৭০ পয়সা।
মহাপরিচালক বলেন, শতকরা হিসাবে এক রাতেই ডিমের দাম ৩০ শতাংশ বেড়ে গেছে। গত ১০ দিন ধরে টপ অব দ্য কান্ট্রি ছিল ডিমের দাম। জনগণের ধারণা অত্যন্ত পরিষ্কার। বিভিন্ন পর্যায় থেকে বলা হচ্ছে- সবকিছু খুঁজে বের করার পর ডিমের মূল উৎসে গিয়ে কেন ব্যবস্থা নিচ্ছি না।
“সে কারণে আমরা আপনাদেরকে ডেকেছি। আমি সত্যিটা উদঘাটন করতে চাই। জনগণের কাছে সরকার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সে কারণে একটা ব্যবস্থা নিতেই হবে।“
এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “কালো হাত যেগুলো ছিল সেগুলো যাতে আর না বাড়তে পারে সেজন্য আমরা অ্যাকশন নেব। আপনারা বলতে পারেন আমরা ভয় পাচ্ছি। আমি মনে করি যারা এর সঙ্গে জড়িত তারাই ভয় পায়। পরিবহনের কথা বলে যারা বাজার মেনিপুলেট করেছে তাদেরকে চিহ্নিত করেছি। সার্বিক প্রতিবেদন আমরা সরকারের উপরের মহলে দেব। যেসব তথ্য পেয়েছি সেগুলো আমরাও বুঝে গেছি, আপনারাও বুঝে গেছেন। এখন সরকারের কাছে রিপোর্ট যাবে।“
অনুষ্ঠানে প্যারাগন, আফতাব বহুমুখী ফার্ম, কাজী ফার্মসহ বেশ কয়েকটি বড় উৎপাদনকারী ও করপোরেট পর্যায়ের ডিম খামারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
কাজী ফার্ম কতটা জড়িত?
এদিনের আলোচনায় ডিমের দৈনিক দর নির্ধারণে সাভারে কাজী ফার্মের একজন ডিস্ট্রিবিউটরের দৈনন্দিন নিলাম পদ্ধতিতে হস্তক্ষেপ করার বিষয়টি বারবার উঠে আসে, যেটিকে ‘অনৈতিক’ বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।
মহাপরিচালক বলেন, “ফয়সাল আজকে আসেনি। আমি বলব তাকে আসতে দেওয়া হয়নি। ওই জায়গাটাতেই আমরা কাজ করতে চাই। এখানে সূক্ষ্ম ও অদৃশ্য একটা হাত রয়েছে। সেটা আমরা উন্মোচন করব।
“এটা সবাই স্বীকার করছেন যে, বাজারে একটা মেনিপুলেট করা হয়েছে। সেই কারণেই ফয়সালরা আজকে আসেনি।“
আলোচনার বিভিন্ন সময় ভোক্তা অধিকারের মহাপরিচালকের সঙ্গে তর্কে জড়াতে দেখা যায় করপোরেট পর্যায়ের খামারিদের।
কাজী ফার্মের পরিচালক ও ব্রিডার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি জাহিন হাসান অনুষ্ঠানের শুরুতে বলেন, বাজারে কয়েকদিনের সরবরাহ সংকটের কারণে মূল্য বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
তার দাবি, কাজী ফার্মসের যে নিলাম পদ্ধতি হয় সেটা অত্যান্ত স্বচ্ছ এবং নিলামে যে দাম উঠে তার চেয়ে কম দামেই তারা ডিম বিক্রি করে থাকেন বা মূল্য নির্ধারণ করে থাকেন।
সভারের ব্যবসায়ী ফয়সাল অনুষ্ঠানে উপস্থিত না হওয়া প্রসঙ্গে কাজী ফার্মের একজন প্রতিনিধি বলেন, ওই ব্যবসায়ী অসুস্থতার কারণে অসতে পারেননি।
এদিনের বৈঠকে অন্যান্য ১০/১২ জন এজেন্ট বা ডিলারকে হাজির করার কথা থাকলেও কেন তাদের হাজির করা হয়নি সেবিষয়ে কোনো বক্তব্য আসেনি কাজী গ্রুপের পক্ষ থেকে। অনুষ্ঠানে আসা অভিযোগগুলো খণ্ডন বা ব্যাখ্যা দেওয়ার বিষয়েও তেমন তৎপরতা দেখা যায়নি তাদের।
প্রশ্নবিদ্ধ নিলাম
আলোচনায় ভোক্তা অধিদপ্তরের ঢাকা জেলা কার্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার মণ্ডল বলেন, ১ অগাস্ট কাজী ফার্মের অফার মূল্য ছিল ৮ টাকা ৭৫ পয়সা যা ১৩ অগাস্টে এসে ১০ টাকা ৯০ পয়সা হয়েছে। ২ টাকা ১৫ পয়সা অফার প্রাইস বেশি হয়েছে। কাজী গ্রুপের রিজিওনাল সেলস ম্যনেজার নিশ্চিত করেছেন এই কয়দিনে উৎপাদন খরচ এক পয়সাও বাড়েনি।
“উনাদের বিডিং সিস্টেমে দেখা যাচ্ছে ১ তারিখে অফার প্রাইস ৮ টাকা ৭৫ পয়সার বিপরীতে বিক্রয়মূল্য ৯ টাকা ১ পয়সা হয়েছে। অর্থাৎ নিলামে ২৬ পয়সা বেড়েছে। সাভারের ফয়সাল সাহেব সেদিন দিয়েছে ৯ টাকা ৫ পয়সা। ১৩ অগাস্ট এসে কাজী ফার্মের অফার প্রাইস ছিল ১০ টাকা ৯০ পয়সা, ফয়সাল সাহেব অফার দিলেন ১৩ টাকা ৯০ পয়সা, ওইদিন বিক্রয় হয়েছে ১২ টাকা ৯০ পয়সা।“
নিলামের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “ফয়সাল সাহেব সাধারণ প্রতিদিন দেড় লাখ ডিম কিনে থাকেন। কিন্তু ওইদিন কিনেছেন দুই লাখ ৯ হাজার। নিলামে যেই পরিমাণ ডিম কিনতে চেয়েছেন তার চেয়ে ৫০ হাজার ডিম বেশি কিনেছেন।“
মূল্য তালিকা, ক্যাশ মেমো এসব কোনো নিয়ম ডিমের দোকানে মানা হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, “কাজী ফার্মকে আজকের অনুষ্ঠানে ফয়সালসহ কমপক্ষে ১০ জন ডিলারকে উপস্থিত করাতে নির্দেশনা দিয়েছিলাম। উনারা কথাও দিয়েছিলেন। কিন্তু আজকের অনুষ্ঠানে একজনও আসেনি।”
তেজগাঁও ডিম ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি আমানত উল্লাহ বলেন, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কাজী, প্যারাগন, সিপি, প্রোটিন, ডায়মন্ড, কাপাসিয়া, পিপলস, কৃষিবিদসহ অনেক বড় বড় ১২/১৩টি কোম্পানি দাম ঘোষণা করে। সেই অনুযায়ী আমরা খামারিদের ডিমের রেট নির্ধারণ করি।
“আমরা যদি কোম্পানিগুলো থেকে খুব বেশি পিছিয়ে থাকি তাহলে খামারিরা আমাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। কসম আল্লাহ! যেই তিন চার দিন ডিমের দাম বেশি ছিল তখন তেজগাঁওতেও ডিম কম এসেছে। প্রতিদিন যেখানে ২০ লাখ ডিম আসত সেই সময় ১২ থেকে ১৩ লাখ ডিম এসেছে। দাম যখন বাড়ে তার সুবিধা খামারিরা পায়। আমরা কেবল এক হাজার ডিমে ২০ টাকা কমিশন পাই, দাম যাই হোক।“
দাম বেড়ে যাওয়ার পর সরকারি সংস্থাগুলোর তৎপরতার বর্তমান প্রেক্ষাপটে খামারিদের আতঙ্কের মধ্যে ঠেলে না দেওয়ার আহ্বান জানান বাংলাদেশ পোল্ট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিলের সভাপতি মশিউর রহমান।
তিনি বলেন, সেক্টরটা অনেক বড় হয়েছে। এটাকে ধরে রাখার জন্য শক্ত নীতিমালা দরকার। পেনিকড কিছু না করে আমাদেরকে আপনারা বুঝান।
“যদি পেনিকড হয়ে যায় তাহলে খামারি খাত ছেড়ে চলে যাবে। তখন আবারও সাপ্লাই ডিমান্ডের গ্যাপ সৃষ্টি হবে। হিতের বিপরীত হবে। যাকে চিহ্নিত করা দরকার তাকেই চিহ্নিত করেন।“
