১৯৫৫ সালের কথা। এ.জে কারদার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'পদ্মা নদীর মাঝি' অবলম্বনে নির্মাণ করছেন ‘জাগো হুয়া সাভেরা।’ সিনেমায় তার সহকারীদের একজন জহির রায়হান। প্রকৃত নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। তবে লেখক নাম জহির রায়হান।
১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। 'ওদের জানিয়ে দাও' এর মত কবিতা লিখেছেন৷ চলচ্চিত্রকে সময়ের চলমান চিত্র হিসেবেই দেখতে চান এই তরুণ। সেই সিনেমায় পেয়ে গেলেন ওয়াল্টার ল্যাসালি, ফয়েজ আহমদ ফয়েজ, তৃপ্তি মিত্র, খান আতাউর রহমান - এর মত মানুষদের।
জহির ভেবে দেখেছিলেন, কোনো একটা বই লেখা হলে সেটা সব মানুষ পড়ে না। কিন্তু সেই বইটিকে যদি চলচ্চিত্রে রূপ দেয়া যায় - তাহলে একসাথে অনেক মানুষ পড়তে পারবে বইটি। তাই বৃহৎ গণমাধ্যম চলচ্চিত্রের সাথেই থাকতে চাইলেন তিনি।
শুরু থেকেই তিনি কাহিনী নিয়ে নিরীক্ষা করতে শুরু করেন। যেমন - তার প্রথম চলচ্চিত্র কখনো আসেনি (১৯৬১) সিনেমায় জাদুঘরের সেই নারীচরিত্র- যাকে মুক্ত করতে কেউ কখনো আসেনি! সেখানে আবার একটি পরিবারের অভাবের কথা, মৃত্যু। ম্যাজিক রিয়ালিজমের কিছুটা প্রয়োগ।
.jpg)
কখনো আসেনি (১৯৬১) চলচ্চিত্রের পোস্টার। ছবি: উইকিমিডিয়াকমনস
আবার কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩) সিনেমায় কাজ করলেন আর্থিক অবস্থার আকস্মিক পরিবর্তন নিয়ে। একটি অনাথ মেয়ে হঠাৎ লটারি জিতে গেল। প্রচুর টাকা, কিন্তু তা নিয়ে সে কী করতে পারে, তবুও কেন সমস্যা শেষ হয় না- সেসবই দেখালেন।
তবে তখন পর্যন্ত তার সিনেমাগুলো বাণিজ্যিকভাবে তেমন সফল হয়নি। কিন্তু তিনি গণমানুষের কথাও ভাবতেন। চলচ্চিত্রের প্রযোজনা-পরিবেশনার কাজটি ব্যয়বহুল হওয়ায় এটির জন্য বরাবর সম্পদশালী লোকদেরই লাগে। তিনি বুঝেছিলেন, চলচ্চিত্রের গণমুখী হবার পথে বা গণমানুষের সমস্যাগুলো উঠে আসার জন্য এটি একটি বাধা৷
কোনো প্রযোজক তো চাইবেন না বিনিয়োগ করে লোকসানের মুখে পড়তে। তাই প্রযোজনা বা পরিবেশনার জন্য শুধুমাত্র বিত্তশালীদের ওপর নির্ভরশীল না হয়ে কলাকুশলীদের ঐক্যবদ্ধ ও সংগঠিত হতে হবে। আর তার পাশাপাশি মানুষের কাছে শিল্পের যেসব ফর্ম জনপ্রিয়, সেসবকে চলচ্চিত্রে প্রয়োগ করতে চাইলেন তিনি। এতে মানুষের কাছে সহজবোধ্য হবে চলচ্চিত্রের বার্তা বা ম্যাসেজ।
তিনি সেই ভাবনা থেকেই পাকিস্তানের প্রথম রঙিন চলচ্চিত্র 'সঙ্গম' (১৯৬৪) বানান। প্রযোজনায় নিজে নাম লেখানোর পাশাপাশি অন্যান্য অভিনেতা, বিশেষত খান আতাউর রহমানকেও আর্থিক বিনিয়োগে উৎসাহিত করেন।
১৯৬৬ তে নিজ প্রযোজনায় বানানো বেহুলা পুরো পাকিস্তান কাঁপিয়ে দেয়। বাণিজ্যিকভাবে ব্যাপক সাফল্য পাওয়া এই সিনেমায় জহির রায়হান ফোক ও পপ কালচারের সমন্বয় ঘটান। এই সিনেমার পর তিনি 'তেরো নম্বর ফেকু অস্তাগার লেন' সিনেমাটি প্রযোজনা করেন। রম্য ধাঁচের এই সিনেমার কাহিনী লিখেছিলেন প্রখ্যাত কমেডি অভিনেতা খান জয়নুল৷ এখানে দুটো পরিবারের ভেতরের হাসি-ঠাট্টা ও অন্যান্য কাজ-কর্মের ভেতর দিয়ে শ্রেণিগত বৈষম্যের ব্যাপারগুলো দেখানো হয়েছিল।
উল্লেখ্য, জহির বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সময় সমাজতান্ত্রিক রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। তখন তাদের প্রকাশ্য রাজনীতি নিষিদ্ধ। তবে প্রখ্যাত রাজনীতিক মণি সিংহ তাকে অণুপ্রাণিত করেছিলেন লেখালেখিতে। পরে সেখান থেকে তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণে অণুপ্রাণিত হন। তাই নির্মিত সিনেমাগুলোয় মার্কসীয় শ্রেণিচেতনার প্রয়োগও ছিলো স্বাভাবিকভাবেই। মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রামাণ্যচিত্র স্টপ জেনোসাইড এর শুরুটা তিনি করেছিলেন ভ্লাদিমির লেনিনের বক্তব্যের অংশ দিয়ে।
.jpg)
অনন্য এক প্রতীকী রাজনৈতিক চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেয়া। ছবি: উইকিমিডিয়াকমনস
উপমহাদেশীয় রাষ্ট্র কাঠামোকে তিনি আধা-সামন্তবাদী ও আধা-ঔপনিবেশিক বলেছেন। তিনি মনে করতেন, এ ধরণের রাষ্ট্রকাঠামোর ভেতর 'একজন সৎ চলচ্চিত্রকারের দুর্গতির সীমা থাকে না।'
জহির রায়হান যে তাই বলে বাজারকে অস্বীকার করতে চেয়েছেন, তা নয়। বরং একটি ভালো চলচ্চিত্রকে কীভাবে দুর্বৃত্তায়নের প্রভাব ব্যতিরেকে বাজারগত করা যায় তা তিনি ভাবতেন। তাছাড়া, তখন শক্তিশালী বাজার ছিলো পশ্চিম পাকিস্তানের চলচ্চিত্রের। তিনি এটিও বুঝতেন, নিজেদের চলচ্চিত্রের বাজার গড়ে না উঠলে ভালো চলচ্চিত্র নির্মাণ ধরে রাখা সম্ভব হবেনা।
তাই তিনি তার প্রধান সহকারী বাবুল চৌধুরীর জন্য টাকা আনা পাই (১৯৬৯) কিংবা প্রতিশোধ (১৯৭২) এর মত সফল বাণিজ্যিক ছবি প্রযোজনা করেছিলেন। এসব চলচ্চিত্রে গল্পে কোন ছাড় দেননি। প্রতিশোধ ছিলো হীরেন নাগের আসল-নকল (১৯৬৭) চলচ্চিত্রের কাহিনী নিয়ে বানানো৷ এখানে আর্থিক কেলেংকারি ও কালো টাকার মত ব্যাপারগুলো এসেছে। এভাবে তার প্রযোজিত বাণিজ্যিক সিনেমাগুলো শুধু ফর্মুলা ফিল্ম হয়ে থাকেনি।
এ প্রসঙ্গে অবধারিতভাবে আসবে তার অবিস্মরণীয় চলচ্চিত্র জীবন থেকে নেয়া-র কথা। একটি পরিবারের ভেতর দিয়ে তিনি প্রতীকীভাবে পুরো দেশকে বুঝিয়েছিলেন। উপমহাদেশে তখনো বলতে গেলে এ ধরনের প্রতীকী রাজনৈতিক চলচ্চিত্রের চল শুরু হয়নি।
এই সিনেমাটি তিনি করেছিলেন সমবায়ভিত্তিক প্রযোজনায়। তিনি ও সুচন্দা ছিলেন মূল প্রযোজক, সাথে খান আতা, আনোয়ার হোসেন, রাজ্জাক, রোজী, রওশন জামিল- সবাই প্রযোজনায় সহযোগি হন৷ তবে সে সময় ছবিটি পূর্ব পাকিস্তানে প্রদর্শনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে পাকিস্তান সরকার। মুক্তিযুদ্ধের সময় কোলকাতায় প্রদর্শিত হয়ে ছবিটি তুমুল আলোড়ন তৈরি করে।
.jpg)
জহির রায়হানের অসমাপ্ত চলচ্চিত্র লেট দেয়ার বি লাইট। ছবি: আইসিইটুডে.নেট
সে সময় আরেকটি চলচ্চিত্র আন্তর্জাতিকভাবে নির্মাণের কাজে হাত দেন তিনি। নিজের লেখা উপন্যাস 'আর কতদিন' অবলম্বনে 'লেট দেয়ার বি লাইট।' বাক্যটি বাইবেল থেকে গৃহীত। সিনেমায় পাকিস্তানি অভিনেতা ওমর চিশতি ও তার বিপরীতে অলিভিয়া গোমেজকে কাস্ট করেন তিনি। হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বড় করে ঘোষণা এসেছিল এই ছবির। পরে অবশ্য স্ত্রী সুচন্দার ইচ্ছায় মত বদলে ববিতাকে নেন। কথা ছিলো ছবিটি হবে পাকিস্তান, ভারত, রাশিয়াসহ কয়েকটি দেশ মিলে। তবে ছবিটি তিনি আর সমাপ্ত করে যেতে পারেননি।
পরে তার চাচাত ভাই সাংবাদিক-সাহিত্যিক শাহরিয়ার কবির ও চিত্রগ্রাহক আফজাল চৌধুরী সত্যজিৎ রায়ের সাথে দেখা করে ছবিটি সম্পূর্ণ করার অনুরোধ জানান। সত্যজিৎ স্ক্রিপ্ট চেয়েছিলেন। তারপর জানতে পারেন, সিনেমাটির কোনো স্ক্রিপ্ট নেই। পুরোটা মাথা থেকে করা! বিস্মিত সত্যজিৎ ছবিটি সম্পূর্ণ করতে পারেননি, শুধু বলেছিলেন, 'সাধারণ কারো পক্ষে এভাবে সিনেমা বানানো সম্ভব নয়। অবশ্য জহির রায়হান তো সাধারণ কেউ ছিল না।'
মাহমুদ নেওয়াজ জয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী।
