আলপনা নামটি তুললেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে উঠোন জুড়ে সাদা রঙের রেখার খেলায় ফুটে ওঠা কিছু ছবি। গৃহবধূর যত্নের গৃহকোণে সে নিজে হাতেই পিটুলিতে (চালবাটা) মমত্বভরা মাধুর্য মিশিয়ে রেখার আঁক কেটে যায়। আর তার আঙুলের ওঠানামায় রেখার পরে রেখা আলপনা নাম নিয়ে বাড়ায় সেই আঙিনার শোভা।
বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণ, আর সেই পার্বণ আলপনা ছাড়া অসম্পূর্ণ। তবে আলপনা আর সীমাবদ্ধ নেই শুধু ভবনের আঙিনায়, শিল্প মানসিকতা তাকে জীবনপটের নানা পর্যায়ে তুলে আনার বরাবরই চেষ্টা করেছে।
আলপনা শতাব্দী প্রাচীন এক শিল্প ধারা। এই নিয়ে বাঙালির চর্চা বহুকালের। তবে সেটি যদি গায়ের পোশাকটাতেও ফুটিয়ে তোলা যায়, তাহলে ব্যাপারটা একদমই মন্দ নয়। একটা নান্দনিক ভাব মনের পাশাপাশি ব্যক্তিত্বে চলে আসে তখন, তাই নয় কি? এই দিকটি মাথায় রেখে পোশাকে আলপনা নিয়ে এসেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে সদ্য স্নাতক সম্পন্ন করা ঈশিতা সাহা পর্ণা। কাজ করছেন হাতে আঁকা পোশাক ও সাজের অনুষঙ্গ নিয়ে।
গ্রাফিক্স ডিজাইনের বিদ্যাকে শুধু তথাকথিত গন্ডির মাঝে আবদ্ধ না রেখে নিজে থেকে ভিন্নধর্মী নতুন কিছু করার তাগিদ নিয়ে শুরু করেছিলেন একটি ক্ষুদ্র উদ্যোগ। তার থেকে ফেসবুকে পাতা খোলা, নাম রাখা জলকল্প। রং তুলির সাথে জলের খুব ভালো একটা সম্পর্ক। কল্পনাগুলি সব রূপ পায় এই জলেই মিশে। ২০১৮ এর দিকে শুরু হয়ে তার কল্পসায়রের মীনের ছোটাছুটি।
2.jpg)
ঈশিতা সাহা পর্ণা
পড়াশুনার সময় থেকেই ঈশিতা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে গেছে ডিজিটাল মিডিয়ার কাজগুলি।
নিজের কাজের কথা বলতে গিয়ে ঈশিতা শোনালেন জলকল্পের জন্মকথা। স্বীকার করলেন নিজের ভালো লাগার কথা।
"আমার বরাবরই ডিভাইস বা ডিজিটাল মিডিয়ার কাজ থেকে হাতে করা কাজ খুব পছন্দ। এতে একটা আবেগ কাজ করে।যে এই কাজ করে তার পরম যত্নের কাজ হয় সেটা। সেই চিন্তা থেকেই জলকল্পের শুরু। প্রথমে নিজের জন্য বানালাম জামা।”
এরপর আসলো লকডাউন। বাড়িতে বসে সময় কাটানোর জন্য আবার শুরু করলেন পছন্দের কাজ। কিছুদিন যেতেই দেখলেন জলকল্পে সেসব কাজ দেখে অনেকেরই ভালো লাগছে। সেই থেকেই পুরো দমে বলতে গেলে জলকল্পের শুরু।”

আলপনার আলাপে জলকল্প
সবধরনের শিল্পধর্মী কাজে ঈশিতার সবচেয়ে পছন্দ আর ভালোবাসা আলপনায়। আর সেটিও রাজাসন লাভ করা শান্তিনিকেতনী আলপনার প্রতি। আর তার এই আল্পনায় বিশাল কর্মযজ্ঞের অনুপ্রেরণা ভারতের শান্তিনিকেতনের অধ্যাপক সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়। যার প্রত্যেকটা কাজ চোখে লেগে থাকার মত।
চিকন চিকন লাইনে কি সূক্ষ্ম কাজ! আর দশটা আলপনা হতে যেন একদমই আলাদা। অন্তর্জালে এই আলপনার ছবি দেখে দেখে ঈশিতার শুধু চোখে নয় মনেও লেগে রইল। শুরু হলো তার নতুন চেষ্টা। মেশিন প্রিন্ট সব চলে গেলো বাদের খাতায়। সাহসী তুলি শুরু করলো পথ চলা কাপড়ের পটে। হবহু নয়, নিজস্বতা মিশিয়ে। কয়েকটা আলপনা দেখে কিছু কিছু অংশ নিয়ে নিজের করা কম্পোজিশন।
এভাবেই চলে যায় একের পর এক নক্সাতে শান্তিনিকেতনী। শান্তিনিকেতনের আলপনা শুধু নিছক আলপনা বইতো নয়! এর মধ্যে রয়েছে জীবনের বিস্তৃত রূপ। নৌকাতে মানুষের জীবন যাপন,মুক্ত বিহঙ্গের উড়ে চলা, জল সরোবরে পদ্মবন,শাখে শাখে আগুনরঙা পলাশ, কাঠঠোকরার গাছের বাকল খোটানো আরও দৈনন্দিন জীবনের কতো কতো চিত্র যে দিশা পেয়েছে এই আলপনার বাঁকে।
কেন এই আল্পনা এতো খানি রত্নময় আর রাজাসনে অধিষ্ঠিত, এবার সেদিকটায় একটু আলো ফেলা যাক।
শান্তিনিকেতনী আলপনা গভীরতম জীবনবোধের সঞ্চায়ক। শুধু নকশার অলঙ্করণ নয়। সূক্ষ্মতম রেখার ধেয়ে চলায় আর ছোট ছোট বিন্দুর মাধ্যমে এখানে রূপ পায় প্রকৃতির একেকটি খন্ডচিত্র। আর তার রেখাগুলো এত সাবলীল!! এর আছে এক গৌরবময় ইতিহাস।
বোলপুরের শান্তিনিকেতনে বিদ্যামন্দির তথা আশ্রম প্রতিষ্ঠার পর গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চেয়েছিলেন, আশ্রমের প্রতি পর্যায়ে প্রকৃতির সাথে সংযোগ স্থাপিত হোক। আশ্রম অলংকরণে আসুক প্রকৃতির ছায়া। প্রথম প্রথম উৎসব-পার্বণকে কেন্দ্র করে বোলপুরের আশ্রম প্রাঙ্গণে আল্পনা কাটাতেন ক্ষিতিমোহন সেনের পত্নী কিরণবালা দেবী। তার অঙ্গুলির কারুকাজে মুগ্ধ হন রবীন্দ্রনাথ।
আশ্রমের বিদ্যার্থীদের সেই আলপনা শেখাতে শিক্ষাগুরুর সন্ধানে ছোটেন। পেয়ে যান সুকুমারী দেবীকে। কিরণবালা আর সুকুমারী দেবীর হাত ধরে খড়িমাটিতে করা যেই আল্পনারীতি একটু করে প্রস্ফুটিত হচ্ছিলো, তা অনেক খানি উৎকর্ষ লাভ করে শিল্পাচার্য নন্দলাল বসুর তুলিতে।
তিনি সারা ভারত ঘুরে প্রাচীন শিল্পকলার অমূল্য রুপালঙ্কারগুলি জুড়ে দেন এই আলপনার ধারা, বিশেষত অজন্তার গুহাচিত্রগুলি তাকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। গ্রামীণ সহজ সোজা আলপনাগুলি বিদগ্ধ জনের চিন্তনে অনন্য রূপ পেলো।
নন্দলাল বসুর পরে তার দুই গুণময়ী কন্যা গৌরী ভঞ্জ ও যমুনা সেনের অনন্য রেখার ভাঁজে শান্তিনিকেতনী আলপনা একটি পৃথক আলপনা পদ্ধতি হিসেবে উৎকৃষ্ট আসন লাভ করে ফেলে।
এনাদের চর্চাকেই বিকশিত করে বর্তমানে নব দিশা দিয়ে যাচ্ছেন শিল্পী সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়, তার নতুন নতুন সৃজনীর মাধ্যমে।

আশ্রমে আলপনার কাজে রত সুধীরঞ্জন মুখোপাধ্যায়, ছবি: বঙ্গদর্শন
বঙ্গের আলপনা চর্চায় শান্তিকেতনীর আদর ঠিক অন্য মাত্রার। ঈশিতা চান এই সুন্দরতম শিল্পশৈলীর প্রতি ওপারের মতো এপারের বাঙালির মনেও রসবোধ জেগে উঠুক। তাই সেটিকে দ্রুত ছড়াতে বেছে নিলেন পোশাক মাধ্যমকে। পোশাক যেকোনো মানুষের কাছে বেশ আকর্ষণীয় একটা বস্তু এবং কমবেশি এর প্রতি চাহিদা সব মানুষের থাকে। তাই খুব সহজেই জামাকাপড়ে নকশা হয়ে এই আলিম্পন সবার কাছে পরিচিতি লাভ করতে পারবে।
শিল্পী ও শিল্প ইতিহাস সম্পর্কে ধারণা তো দূর, এপার বাংলার প্রায় মানুষের কাছে এটি অচেনা একটি চর্চা বা এটিকে কেউ চিনলেও এই সম্পর্কে জানেন খুব কম। এটি মাথায় রেখেই ঈশিতার কুর্তিতে জায়গা করে নিলো শান্তিনিকেতনী।
শুধু কুর্তি নয়, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, শাড়ি, ব্লাউজ,কাঠের গয়না আর এমনকি পাটের ব্যাগেও ছড়াতে শুরু করলেন তার নান্দনিক তুলির টানে প্রাণের শান্তিনিকেতনী।
ঈশিতার পেজে শান্তিনিকেতনী ছাড়া রিকশা পেইন্টিং, পটচিত্র, বিখ্যাত শিল্পীদের কিছু চিত্রকর্ম ও লোকজ মোটিফের অনেক কাজ রয়েছে। শুধুই তুলির টানে নয়, কাপড়ে জমিনে সাথে পড়ে সুতার ফোঁড়।
ঈশিতা সবচেয়ে যত্নে করে তার প্রিয় শান্তিনিকেতনীর কাজ। কাপড়ের রং থেকে ফোঁড়ের সুতার রং তিনি সব বিচক্ষণতায় বাছাই করেন। শুধুমাত্র সেই সব রঙই বেছে নেন যাদের সাথে আছে আলপনাদের আত্মার যোগ।
কবি মানসে প্রকৃতিতে যেসব রঙ সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় সেসব রঙের কাপড়েই বেশি কাজ করা হয়। আর সেই রঙের পোশাকে যে কাউকে মানিয়ে যায় বেশ। ঈশিতা জামার এমন অংশে আলপনা তোলার চেষ্টা করেন যাতে করে সেটি যে কারো চোখে খুব সহজেই ধরা দিতে পারে। মানে কাপড় এর রঙের সাথে মিল রেখে আলপনাটা বেশ দূর থেকেও চোখে পড়ে।
ঈশিতা শান্তিনিকেতনী আলপনা নিয়ে অনেক স্বপ্ন দেখেন। তিনি চান আরো মানুষ এই আলপনার সাথে আলাপন জুড়ে দিক। এই সদিচ্ছা ব্যক্ত করে ঈশিতা জানালেন, "আমি চাই এই আলপনা যেন শুধু হাতে গোনা কয়েকজন মানুষই না চিনুক। সবাইই যেন এই কাজ দেখুক।এই সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করুক। শুধু জামাকাপড়ই না,মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় আরও অনুষঙ্গের মধ্যে আমি এই কাজ ফুটিয়ে তুলতে চাই।"
আলপনা মাধ্যমে কেউ কাজ করতে চাইলে
পরামর্শে ঈশিতা জানালেন চর্চা যেন সর্বাগ্রে থাকে, কেননা শান্তিনিকেতনের এই আলপনা খুব একটা সহজ না। প্রতিটা রেখা যেন এখানে একেকটি ছন্দের মত। রেখার মাঝে আছে গতি। আর ঠিক সেভাবেই কাজ টা হওয়া উচিত। নতুন কারো অবশ্যই সেটিকে তেমনিভাবে তুলে ধরাই শ্রেয়। তবে মানুষ পারেনা এমন দুঃসাধ্যি নেই!
কারো চর্চা বেশি লাগবে কারো হয়তো কম।তবে চর্চা করতে হবে, ধরতে হবে ধৈর্য্য। প্রথম কাজ হয়তো খারাপ হবে।তখন নিজের আনাড়ি হাতের কাজ দেখে হতাশ হলে চলবে না মোটেই। দ্বিতীয়টা খারাপ হবে, তৃতীয়টা একটু ভালো হবে।এভাবে আস্তে আস্তে সবথেকে ভালোটা আলো হয়ে বেরিয়ে আসবে একদিন।
সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে ৪র্থ বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
susmi9897@gmail.com
