Loading...

কোক স্টুডিও বাংলার প্রথম সিজনের সমাপ্তির সুরে মিশে উঠলো যে রায়বেঁশে সুর

| Updated: September 03, 2022 20:30:38


ছবি: কোক স্টুডিও বাংলা ছবি: কোক স্টুডিও বাংলা

ঝাউরে গিদাই গিজ ঘিনি তা, ঢাকুর ঢুকুর কুরতা !!! এই তালে সম্প্রতি কোক স্টুডিও বাংলার প্রথম সিজনের শেষ পরিবেশনা ‘হেই সামালো’ মুক্তি পায় তাদের ইউটিউব চ্যানেলে। গানটিকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক উত্তেজনা। ভারতের সলিল চৌধুরীর ‘হেই সামাল’ ও বাংলাদেশের আব্দুল লতিফের ‘ওরা আমার মুখের ভাষা’ – র ফিউশনে মঞ্চে মিলিয়ে দেওয়া হল দুই প্রতিবাদী গান।

গানটি অবশেষে গতকাল প্রকাশ পায়, যা আদতে ছিল একটি গণসংগীত। বাংলার মেহনতি মানুষের সংগ্রাম নিয়ে রচিত হয়েছিল গানটি। 'হেই সামহালো ধান হো' গানটি রচিত হয়েছিল ১৯৪৬ সালে ইলা মিত্রের নেতৃত্বে সংঘটিত হওয়া তেভাগা আন্দোলনকে উপজীব্য করে। কোক স্টুডিওর চিরাচরিত ধর্ম অনুসারে এই গানের সাথে মিশেল ঘটেছে ভাষা আন্দোলনের সময়ে আব্দুল লতিফের বিখ্যাত গান 'ওরা আমার মুখের ভাষা কাইরা নিতে চায়'।

এই ফিউশন গানের দৃশ্যে একসঙ্গে গাইতে দেখা যায় বাপ্পা, সামিনা, অর্ণব, সুনিধি, ঋতুরাজ ও কণাকে। গানটির শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব বাঁশিতে অদ্ভুত মায়াময় মূর্ছনা লাভ করে।

কালজয়ী গানদুটোর সাথে যুক্ত হয়েছে বান্দরবনের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির নিজস্ব বাঁশীতে অদ্ভুত জাদুকরি ধুন এবং রায়বেঁশে যুদ্ধনৃত্যর সুর যা এসেছে এই অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন লোকনৃত্য থেকে। 

আরো মাসখানেক আগেই বের হয় এই গানের একটি ছোট্ট টিজার। নতুন পরিবেশনায় বাংলাদেশের সংগীতজগতের তারকাখচিত একটি খন্ড মুহূর্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করে অর্ণব জানান, এবারের গানটি ওপার বাংলার বিখ্যাত রায়বেঁশে নৃত্যশৈলীর গানকে উপজীব্য করে সাজানো হয়েছে। তিনি এই লোকনৃত্য সম্পর্কিত একটি ছোট্ট ইতিহাস নিজের ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট করেন।

অর্ণবের সেই শেয়ার করা ছবিটিতে যেটুকু জানা যায়, তার সারসংক্ষেপ কিছুটা এমন দাঁড়ায় -

'রায়বেঁশে কথাটি এসেছে রায়বাঁশ কথাটি থেকে, যার আক্ষরিক মানে করলে দাঁড়ায় শ্রেষ্ঠ বাঁশ, আর একে হাতিয়ার করে যারা যুদ্ধ করেন তারা রায়বেঁশে। আগের কালে এই বাঁশের হাতিয়ার নিয়ে ঢোল কাঁসরের তালে ছন্দবদ্ধ শারীরিক অনুশীলন চলত। যা এক সময়ে হারাবার পথে কিছুটা ঠাঁই পেয়েছিল বীরভূমের অন্তজ শ্রেণীর বিবাহ অনুষ্ঠানে। নাচটির বীরোচিত ভাবভঙ্গি আকৃষ্ট করে গুরুসদয় দত্তকে, যিনি এই নাচটির পুনরুদ্ধারে ভূমিকা রেখেছিলেন।'

যেমন ছিল রায়বেঁশে

রায়বেঁশে নৃত্য নিয়ে বলতে গেলে এক কথায় এটি ভারতীয় যুদ্ধ ঘরানার নৃত্য, যার উৎপত্তিস্থল বঙ্গ অঞ্চল। রায়বেঁশে শব্দটি বহু পুরানো। প্রাচীন রাজাদের পদাতিক বাহিনীর উপাধি ছিল। প্রাচীন ধর্মমঙ্গল কাব্যের পাতায় এর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। মধ্যযুগে রূপ বদলে এরাই হয়ে ওঠে জমিদারদের লাঠিয়াল। শোনা যায়, বীরভূমে চারকোল নামে ছিল গোটা এক গ্রাম । থাকত সব রায়বেঁশেরা। গ্রামটি ছিল জমিদারের উপহার।

জমিদারি প্রথার পতনের সাথে সাথে এদের মধ্যেও আসে হ্রাসগতি। তবুও পুরুষানুক্রমে এখনো ডোম ,হাঁড়ি, বাগদী ও বায়েনদের মাঝে চর্চিত। তবে পুরাতন ধারাটি লুপ্তপ্রায়। কিছুটা অপভ্রংশ হয়ে সরকারের সামান্য দাক্ষিণ্যে বেঁচে আছে বীরভূম, বর্ধমান ও মুর্শিদাবাদে।

নাচটা কতকটা এরকম -  একখানা লম্বা বাঁশ নিয়ে নৃত্যরত পুরুষ তীর ছোঁড়া, তলোয়ার বাজি কিংবা বর্শা নিক্ষেপের ভঙ্গি করবে আর তার ডান পায়ে বাঁধা থাকবে পিতলের ঘুঙুর। সেই সাথে বাজবে ঢোল, করতাল আর ঘন্টা আর তালে তালে চলবে নাচ। সংগীত আর নাচের ভাগটা খুব সামান্য।

ঠিক যেন নাচ নয়, যেন যুদ্ধের আগের মহড়া।  আপন শক্তি যাচাই করে নিয়ে মনোবল বৃদ্ধি করা।

আবার কতকটা সার্কাসের মতো। লম্বা লাঠির সাথে অগ্নিবলয়ে ঝাঁপ দেয়া কিংবা লাঠির উপরে ভারসাম্য রক্ষা। আবার কখনো একে অন্যের কাঁধে পা রেখে গড়ে ওঠে মানবমঠ।

কিংবদন্তি আছে, আগের দিনের রায়বেঁশেরা এমন জোরে লাঠি ঘোরাতো যে কোনো পাথরের ঢিল তাতে লক্ষ্যভেদে হতো ব্যর্থ।

গুরুসদয় দত্তের উদ্যোগ

ত্রিশের দশকের শুরু । লেখক ও সমাজব্রতী গুরুসদয় দত্ত তখন বীরভূমের জেলা প্রশাসক।  বড্ড মিশুক মানুষ। যেখানেই যেতেন, খুব সহজেই জনসাধারণের সাথে মিশে যেতেন। একদিন চারকোল গ্রামে তার দৃষ্টি কাড়ে এই নাচ। এমন পুরুষালি দীপ্ত নাচ যেনো আগে দেখা হয়নি।

তিনি যুব উন্নয়নে এই নাচ নিজের সৃষ্ট ব্রতচারী নাচের সাথে একীভূত করতে চেষ্টা করেন। তখন এর উত্তরসূরিদের অনেকেই ডাকাতিতে লিপ্ত ছিল। তিনি শুভ পথে আনবার উদ্যোগ নেন। এমনি করে হারিয়ে যাওয়া এই লোকসংস্কৃতি কিছুটা নবদিশা পায়।

শান্তিনিকেতনের সাথে রায়বেঁশের যোগ

রবি ঠাকুর রায়বেঁশে পরিদর্শন করে খুবই চমৎকৃত হন। বঙ্গদেশের চিত্ত দুর্বল্য দূর করতে ভীষন উপাদেয় মনে করে তিনি উক্তি করেছিলেন  "এমন পুরুষোচিত নাচ সত্যিই দুর্লভ!" তার খাপছাড়া নামে ছড়ার বইয়ে রায়বেঁশে নিয়ে একখানা ছড়া দেখা যায়, সহজপাঠে আজকের দিনও ছেলেমেয়েরা পড়ে।

শ্যালীর সঙ্গে ক্রমে ক্রমে, আলাপ যখন উঠলো জ'মে, রায়বেঁশে নাচ নাচের ঝোঁকে, মাথায় মারলে গাঁট্টা।

কবিগুরু শান্তিনিকেতনের পাঠ্যসূচিতে এর অন্তর্ভুক্তি করেন, আর ছেলেরা যেন ভালো করে শিখতে পায়, তাই তাদের জন্যে উচিত গুরুমশায়ের খোঁজে গুরুসদয়ের দ্বারস্থ হন। এই অনুরোধ রাখতে সিউড়ি থেকে আসে নাচের শিক্ষক। এখন বিশ্বভারতীর সংগীত ভবনে শেখানো হয় পুরুষালি রায়বেঁশে। শেখে ছেলে মেয়ে উভয়েই। 

শান্তিনিকেতনের মায়াময় পরিবেশে অর্ণবের বেড়ে ওঠা। কখনো তারও নজর কেড়েছে এই নাচ। তাই প্রযোজক হয়ে আনতে চলেছেন কোক স্টুডিওর মঞ্চে, যেখানে নারী শিল্পী আর পুরুষ শিল্পী মিলে প্রাণ খুলে গাইবে রায়বেঁশে।

আধুনিকতার সাথে হাত ধরে চলতে চলতে একসময়ে হোঁচট খেয়ে যায় রায়বেঁশে, তবুও আজো গ্রাম্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে কসরত প্রদর্শনে ডাক পড়ে কিছু কুশীলবের। এভাবেই ঝিম ধরা পথে চলছে রায়বেঁশে। কোক স্টুডিও বাংলা আমাদের নতুন করে পরিচয় করাবে হারিয়ে যাওয়া লোকায়িত সংস্কৃতির সাথে - এই প্রত্যাশায় অপেক্ষমান এবার ও ওপার বাংলার লাখো দর্শক।

সুস্মিতা রায় বর্তমানে শহীদ তাজউদ্দীন আহমেদ মেডিকেল কলেজে ৩য় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।

susmi9897@gmail.com

 

Share if you like

Filter By Topic