দস্যুবৃত্তি ও নৃশংসতায় কিছু নারী জলদস্যু দাঁপিয়ে বেড়িয়েছেন উত্তাল সমুদ্রে, যারা জাহাজে ভ্রমণকারীদের কাছে এক ভয়ংকর ত্রাসে পরিণত হয়েছিল এবং ক্ষেত্রবিশেষে পুরুষ জলদস্যুদেরকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল।
চেং ই সাও
ইতিহাসের অন্যতম ভয়ংকর নারী জলদস্যুর পরিচয়ের আগে তিনি ছিলেন চীনের পতিতালয়ের একজন নিবাসী। নাপিতের সাথে বিয়ে হলে পরিচয় হয় নাপিত-বউ, কুমোরের সাথে বিয়ে হলে কুমোর-বউ আর জলদস্যুর সাথে বিয়ে হলে তাকে জলদস্যু-বউ বলে কী না তা জানা নেই, তবে ১৮০১ সালে চেং এক জলদস্যুর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে নিজেও জলদস্যুর খাতায় নাম লেখায়। দুজনে মিলে এক বিশাল জলদস্যু বাহিনী গড়ে তোলে এবং মাছ ধরার নৌকা, রসদপূর্ণ জাহাজ ও চীনের দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলবর্তী এলাকায় দস্যুবৃত্তি শুরু করে।
১৮০৭ সালে তার স্বামীর মৃত্যুর পর এক বিশ্বস্ত সহযোগীর সাথে যৌথভাবে দস্যুবৃত্তি চালিয়ে যেতে থাকে।
তার দস্যুবাহিনীতে বেশকিছু কঠোর নিয়ম ছিল, যেমন - কোনো নারী বন্দীকে কেউ যদি ধর্ষণ কর্তো বা করার চেষ্টা করতো তাহলে তার শিরশ্ছেদ করা হতো আর বন্দীশালা থেকে কেউ পালিয়ে গিয়ে ধরা পড়লে তার দুই কান কেটে ফেলা হতো।
তার দস্যুবৃত্তি এতোটাই অসহনীয় পর্যায়ে চলে যায় যে একসময় সে চীনের অন্যতম প্রধান শত্রুতে পরিণত হয় এবং ১৮১০ সালে তাকে ধরার জন্য বৃটিশ ও পর্তুগীজ নৌসেনাদের দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু সে শেষ পর্যন্ত তাদের কাছে অধরাই থেকে যায় এবং ১৮৪৪ সালে ৬৯ বয়সে মৃত্যুবরণ করে।
অ্যানি বনি
একজন হিংস্র নারী জলদস্যু হিসেবে পরিচিত অ্যানি বনি ছিলেন একজন আইরিশ আইনজীবীর অবৈধ সন্তান। শুরুর দিকে তার বাবা তাকে আইনের কাজে সহযোগী হিসেবে নিযুক্ত করলেও কাজটি ভালো না লাগায় একসময় সে সুদূর আমেরিকায় পাড়ি জমায় এবং ১৭১৮ সালে একজন নাবিককে বিয়ে করে বাহামা দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়। সেসময় বাহামা জলদস্যু অধ্যুষিত একটি এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল।
একসময় স্বামীর সাথে তার ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে জ্যাক র্যাকাম নামে এক ইংরেজ জলদস্যুর সাথে সখ্যতা গড়ে তোলে। শুরু হয় তার দস্যু জীবন।
অ্যানি নিয়মিত মদ্যপানে অভ্যস্ত ছিল আর সেই সাথে ছিল পিস্তল ও ছুড়ি চালনায় বিশেষ দক্ষতা।
তার সাহসী মনমানসিকতা ও তীব্র ক্ষীপ্রতায় সে প্রতিপক্ষকে সহজেই ঘায়েল করে ফেলত। কেউ তাকে আক্রমণ করলে বা প্রতিপক্ষের উপর হামলা করলে তার মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ক্রমাগত আঘাত করেই যেত।
ছোট ছোট মাছ ধরার নৌকা এবং বাণিজ্য জাহাজগুলো তাদের হাত থেকে রক্ষা পেতো না।
পরবর্তীতে, অন্য এক নারী জলদস্যু, মেরী রীডের সাথে তার বন্ধুত্ব হয় এবং দুজনে মিলে নৃশংস দস্যুবৃত্তিতে নেমে পড়ে।
গ্রেস ও’মেলি
এই নারী জলদস্যুর উত্থান হয় এমন একটা সময়ে যখন নারীদের শিক্ষাগ্রহণ বা ঘরের বাইরে যাওয়ার কোনো অধিকার ছিল না। সে নিজের মাথার চুল কেটে ছোট করে রাখত আবার কখনো বা একদম টেকো করে ফেলত যাতে করে তাকে পুরুষের মতো দেখায়।
সে এমন একটি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিল যারা পারিবারিকভাবে দস্যুবৃত্তি করত। আয়ারল্যান্ডের পশ্চিম উপকূলে তাদের আধিপত্য ছিল। ১৫৬০ সালে মেলি পারিবারিক পেশাবৃত্তির দায়িত্ব গ্রহণ করে। তার তত্ত্বাবধানে প্রায় ২০ টি জাহাজে করে জলের বুকে লুটতরাজ চলত। মূলত ইংরেজ ও স্প্যানিশদের বণিক জাহাজ এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের জাহাজে তারা হামলা করত।
মেলি এতোটাই শারীরিকভাবে তেজদীপ্ত ও মানসিকভাবে লড়াকু ছিল যে এমনটা কথিত আছে সে সন্তান জন্মদানের মাত্র একদিন পরেই সমুদ্রের বুকে প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নেমেছিল।
১৫৭৪ সালের দিকে ইংরেজ সরকার তাকে বন্দী করে এবং ১৮ মাস বন্দী জীবন কাটানোর পর সে মুক্তি লাভ করে।
জলদস্যুর রক্ত তার শরীরে বইছে, দস্যুবৃত্তি ছাড়া কী আর সে থাকতে পারে! পুনরায় সে আবার সক্রিয় হয়ে ওঠে। ১৫৯০ সালে বৃটিশ সরকার তার সবগুলো নৌবহর জব্দ করে নেয়ার পর সে রাণী প্রথম এলিজাবেথের কাছে সরাসরি সাহায্য প্রার্থনা করে। নিজেকে একজন হেরে যাওয়া মানুষ রূপে রাণীর কাছে তুলে ধরে তার জাহাজ, আটককৃত পুত্র সন্তানদের মুক্তি দেওয়ার পাশাপাশি তাকে বাকিটা জীবন একটু শান্তিতে থাকার কাতর অনুরোধ করে।
তার এই দুষ্ট বুদ্ধি কাজ করে যায়। সবকিছুসহ তাকে মুক্তি দেয়া হয়। মুক্তি পাওয়ার সাথে সাথেই সে তার সব প্রতিজ্ঞা উপেক্ষা করে আবারও জলের দস্যুরানী হয়ে ওঠে। ১৬০৩ সালে সে তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পুত্রদের নিয়ে দস্যুবৃত্তি করে গেছে।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com
