Loading...

আন্দোলনে নেমে ভাতও বন্ধ, বাঁচবে কি করে চা শ্রমিক?

| Updated: August 27, 2022 17:45:23


আন্দোলনে নেমে ভাতও বন্ধ, বাঁচবে কি করে চা শ্রমিক?

“চাইর দিন ধইরে ভাত নাই। ভাত কুথায় পাব? ভাত খাইলে তো টাকা লাগবে। কুথায় পাব টাকা যে চাল কিনব? শুধু লবণ দিয়ে শাকসবজি সেদ্ধ করে খাচ্চি।”

অসহায়ত্বের এই বয়ান হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার বেগম খান চা বাগানের শ্রমিক শকুন্তলা মোদীর। যুগ যুগ ধরে চলা শ্রম শোষণের অবসান ঘটাতে তারা জোট বেঁধে আন্দোলনে নেমেছেন। কিন্তু তাদের জন্য কাজ বন্ধ রাখা মানে মজুরি বন্ধ থাকা।

“১৮ দিন পর্যন্ত কাজ নাই, কাম নাই। রেশন-টেশন সব অফ। একবেলা খাই, একবেলা না। এরকমই দিন কাটতিছে,” শুক্রবার এভাবেই নিজেদের দুর্দশার কথা বলছিলেন শকুন্তলা।

স্বাধীনতার পর এক টাকা দুই আনা মজুরি পেতেন তারা। পরে সেটা বেড়ে দৈনিক পাঁচ টাকা হয়। এভাবে বাড়তে বাড়তে এখন চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা। শকুন্তলার প্রশ্ন, দুর্মূল্যের বাজারে ওই টাকায় ছয়জনের ভরণপোষণ কীভাবে চলে?

কথায় কথায় জানালেন, বছর সাতেক আগে স্বামী গত হয়েছেন। এখন দুই সন্তানসহ মোট ছয়জনের দায়িত্ব তার ঘাড়ে। বছরজুড়েই অভাব-অনটন লেগে থাকে, এখন ধর্মঘট চলায় একপ্রকার না খেয়েই বেঁচে আছেন তারা। খবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের। 

  • দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার দাবিতে গত ৯ অগাস্ট থেকে আন্দোলন চালিয়ে আসছেন দেশের ২৪১টি চা বাগানের প্রায় সোয়া লাখ শ্রমিক।

  • প্রথম চারদিন শ্রমিকরা প্রতিদিন দুই ঘণ্টা কর্মবিরতি পালন করেন। ১৩ অগাস্ট তারা পূর্ণদিবস কর্মবিরতি পালন শুরু করেন।

শকুন্তলা ভাবেন, সন্তানদের লেখাপড়া করাতে পারলে হয়ত এভাবে উপোস থাকতে হত না। কিন্তু তার পক্ষে কি সেটা সম্ভব ছিল? খরচ দিতে পারলেও কুলির সন্তানকে তারা সমাজে নিত?

“গোসলের সাবান-টাবানও তো দিতে পারব না। কীভাবে লেখাপড়া করাবো? মাইনষে ঘিন্না করবো। ইশকুলে গেলে যারা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকে, তারা তো বলবে যে ওইটা নোংরা আছে, ঘিন্না করবে।”

নিত্যপণ্যের ঊর্ধ্বগতিতে সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের দুর্দশার কথা সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে উঠে এলেও আড়ালেই থেকে যায় চা শ্রমিকের মত অবহেলিত জনগোষ্ঠীর কথা। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া এই মানুষদের ধর্মঘটে সংহতি জানিয়ে সোশাল মিডিয়ায় দাবি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন অনেকেই।

চা শ্রমিকদের দাবি করা দৈনিক ৩০০ টাকা মজুরিও যে জীবন ধারণের জন্য যথেষ্ট নয়, সেই স্বীকারোক্তিও আসছে সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণির মানুষের কথায়।

শকুন্তলা যে চা বাগানে শ্রম দেন, সেখানেই কাজ করেন নীলু বাউড়ি। তার ঘরে দুই ছেলে-মেয়ে, মা ও তার স্বামী রয়েছেন। স্বামী অসুস্থ হওয়ায় তিনি কোনো কাজ করতে পারেন না।

অনাহারে থাকতে হলেও তিনি ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনা করাচ্ছেন। মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে, ছেলে মাধ্যমিক পাস করেছে। কিন্তু ছেলে যে বাইরের কোনো কাজ করে উপার্জন করবে, সেই নিশ্চয়তাও নেই।

সরকারি ছুটি বাবদ বৃহস্পতিবার দুই দিনের মজুরি ২৩৫ টাকা (প্রশাসনিক খরচ বাবদ ৫ টাকা কেটেছে বাগান কর্তৃপক্ষ) এবং রেশনের এক কেজি চাল পাওয়ার কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললেন নীলু।

“৭-৮ দিন পরে কালকে রাতে একটু ভাত খেয়েচি। শাক ভাজি, ডাল দিয়ে। বাচ্চাকাচ্চা খুবই কান্নাকাটি করছিল খাওয়ার জন্য। কোনোরকমে শুকনা মরিচ আর নুন ছিঁটা দিয়া আমরা খাচ্ছি, জীবনযাপন করে যাচ্ছি…।

“চা বাগানের খালবিলগুলায় কচু শাক আছে, ওগুলা সিদ্ধ করে খাচ্ছি। আসলে যেটুকু বাড়িতে ছিল, খাইয়ে-দাইয়ে একেবারে সব শেষ হইয়ে গেছে।”

ধর্মঘট শুরুর পরপরই বৃদ্ধা মাকে নীলু তার থেকে অবস্থাসম্পন্ন বড় বোনের কাছে পাঠিয়ে দেন।

“আমার মাকে আন্দোলনের কারণে সেখানে নিয়ে গেচে আরকি, বৃদ্ধ লোক তো। এইখানে তো আমি তাকে পেটে ভাত দিতে পারছি না। ওখানে যদি কিছু ভাত খেয়ে বাঁচতে পারে তো বাঁচবে।”

চুনারুঘাটের চানপুর চা বাগানের শ্রমিক আকাশমতি সাঁওতালের অবস্থা আরও করুণ। চার সন্তান ও স্বামীর ভরণপোষণের দায়িত্ব যে আর কিছুতেই সামলানো যাচ্ছে না, সেই কঠিন পরিস্থিতির কথা বলছিলেন তিনি।

“পরিবারে পাঁচজন, বাগানে কাজ আছে একটা। স্বামী তো কাজ করে না, ঘরে বসেই থাকে। এতদিন ধরে আমরা পাতা-চা দিয়ে বাচ্চাগুলাকে রেখেছি। আর আমরা তো জল খেয়ে রয়েচি।

আকাশমতি জানালেন, শুক্রবার সকালে চাল ভাজা আর চায়ের পানি খেয়েছেন। যেটুকু চাল আছে, লবণ দিয়ে মেখে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বাচ্চাদের খাওয়ান। হাতে টাকা নাই, দোকানও বাকি দিচ্ছে না।

হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের মতোই মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলায় ১৭টি চা বাগানের শ্রমিকরাও এরকম অনাহারে দিন পার করছেন।

বড়লেখার দক্ষিণ শাহবাজপুর ইউনিয়নের শাহবাজপুর চা বাগানের উদয়ন যুবক সংঘের সভাপতি শ্যাম রায় কর্মকার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আন্দোলনের মাঝে শোক দিবসের ছুটি ছিল। ওই ছুটির টাকা বাবদ ১২০ টাকা তাদের দেওয়া হয়েছে বৃহস্পতিবার। অন্যদিন কাজ করেননি বলে মজুরি কিংবা রেশন কোনোটাই দেয়নি বাগান মালিক।

‘‘খুব কষ্ট করে চলছে লোকজন। কেউ কেউ বাহিরে (বাগানের বাইরে) দিন মজুরের কাজ করে সংসার চালাচ্ছে। কোনোমতে খাইয়া-পইরা দিন যার। অনেকে আছে এক বেলা খাইলে, আরেক বেলা উপাস (উপোস) থাকে। দুই বেলা খেতে পারছে না। গরিব শ্রমিক অল্প মজুরিতেই কষ্ট করে চলতে হয়, তার মধ্যে দুই সপ্তার রেশন-মজুরি সব বন্ধ।”

শাহবাজপুর চা-বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি মেঘনাথ নায়েক বললেন, তাদের বাগানেও রেশন-মজুরি বন্ধ। মাঝে শুধু শোক দিবসের দিনের টাকা পেয়েছেন গত সোমবার।

“আজকে এতগুলা দিন, কত কষ্ট করছি আমরা! আমাদের বাগানে নিয়মিত শ্রমিক ৪৫০। তাদের ছেলে-মেয়েসহ তো আরও অনেক। কেউ ঋণ করে চলছে। কেউ বাকিতে দোকান থেকে কিছু জিনিস কিনে টানাটানির মাঝে চলছে।

“যারা বাকিতে নিতে পারছে না, তারা বাগানের বাইরে গিয়ে কাজ করছে। বাইরের দিনমজুরির টাকায় কোনোমতে চলছে। কারও জমানো টাকা থাকলে, ওটা ভেঙে খাচ্ছে। তবে ওটা অল্প কয়েকজনের হবে।”

‘শেখ হাসিনার দিকে তাকিয়ে আচি’

গত ২০ অগাস্ট শ্রম অধিদপ্তরের মৌলভীবাজারে ভানুগাছ রোডের বিভাগীয় কার্যালয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ এবং শ্রম অধিদপ্তরের মহাপরিচালক খালেদ মামুন চৌধুরীর সঙ্গে বৈঠকে বসেন চা শ্রমিকদের প্রতিনিধিদল।

পরে দৈনিক মজুরি ১৪৫ টাকার প্রস্তাব মেনে আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল।

তবে বেশিরভাগ শ্রমিক সেই সিদ্ধান্ত না মেনে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। এরপর বিভিন্ন স্থানে সড়ক ও রেলপথ অবরোধের ঘটনাও ঘটে। তবে শুক্রবার তারা কোনো সড়ক কিংবা রেলপথ অবরোধ করেননি।

শ্রমিকরা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শনিবার বিকাল ৪টায় বাগান মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। প্রধানমন্ত্রীর দিকে চেয়ে তারা শুক্রবার অবরোধ করেননি, তবে কাজে যোগ না দিয়ে ধর্মঘট অব্যাহত রেখেছেন।

শ্রমিকদের কেউ কেউ বলছেন, প্রধানমন্ত্রী যে সিদ্ধান্ত দেবেন, তা মেনে নিয়ে তারা কাজে ফিরবেন। আবার অনেকেই বলছেন, দাবি অনুযায়ী ৩০০ টাকা মজুরি না দেওয়া হলে তারা কাজ করবেন না।

চা শ্রমিক নীলু বাউড়ি বললেন, “দেখা যাক, আমাদের মা শেখ হাসিনা কী করেন? তার দিকেই আমরা তাকিয়ে রয়েছি।

“১২০ টাকা মজুরিতে কিছুতেই আমাদের সংসার চলছে না। যাদের বাড়িতে বেশি মানুষ, তাদের তো খুবই কষ্ট।”

আকাশমতি জানালেন তার উদ্বেগের কথা। শনিবার যদি ৩০০ টাকার কম মজুরি চূড়ান্ত করে, সেটা তাদের জন্য মেনে নেওয়া কষ্টকর হবে। তবে প্রধানমন্ত্রী যদি সেটা ‘নিজের মুখে’ ঘোষণা না করেন, তাহলে তারা বাগানে যাবেন না।

শকুন্তলা দাবির বিষয়ে অনড়। তার সাফ কথা, “৩০০ টাকার কম হলে তো আন্দোলনই চলবে।”

শমশেরনগরের চা-শ্রমিকের সন্তান মোহন রবিদাসও বললেন, কেবল ৩০০ টাকা মজুরি পেলেই তারা আন্দোলন থেকে সরবেন।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক বিজয় হাজরার ভাষায়, তাদের আন্দোলন এখন ‘সর্বোচ্চ আদালতে’ চলে গেছে। প্রধানমন্ত্রী যা বলেন, সেটাই তারা মেনে নেবেন।

রেশন নিয়ে কোনো দাবি নেই জানিয়ে তিনি বলেন, “চা সংসদে প্রতি দুই বছর পর পর মালিকদের সাথে আমাদের বৈঠক হয়। এইখানে অনেক বিষয় থাকে। কিন্তু এখন মজুরি নিয়ে আমাদের দাবি আছে। তাই এখন আমরা অন্য দাবিগুলো বাদ দিয়ে মজুরিতে চলে আসছি। মজুরি নিয়েই এখন সবাই আতঙ্কিত। মজুরি নিয়েই আন্দোলন, সংগ্রাম।”

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাই ‘কিছু একটা’ করবেন, এই বিশ্বাসের কথা জানিয়ে চা শ্রমিক ইউনিয়ন সিলেট শাখার সভাপতি রাজু গোয়ালা বলেন, “আমরা আমাদের ৩০০ টাকার দাবি পেশ করেছি। ব্যাপার হলো, মালিকপক্ষের সাথে উনি (প্রধানমন্ত্রী) বসে কী বলবেন, না বলবেন- তা আমি বলতে পারতেছি না। তবে শ্রমিকদের মুখ থেকে কথা আসছে যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যা বলবেন, মেনে নেবে।”

সমস্যার দ্রুত সমাধান হওয়া উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন, “শুধু আন্দোলনই করি, আন্দোলনই করি, সমাধান আসলো না, তখন তো পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। আমরা চাইছি যাতে শিল্পও বাঁচে, শ্রমিকও বাঁচে।”

মজুরি বাড়ানোর দাবিতে টানা ১২ দিনের আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছিলেন বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নৃপেন পাল। শ্রমিকরা তা মানেনি

গত সপ্তাহে শ্রমিকদের মজুরি ২৫ টাকা বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা করার যে প্রস্তাব এসেছিল, তা মানতে পারেননি জানিয়ে রাজু গোয়ালা বলেন, “আমরা বলেছি যে আপনি বিবেচনা করেন ১৪৫ টাকা দিয়ে আমরা কীভাবে চলতে পারি?”

১৪৫ টাকা মজুরির প্রস্তাব মেনে ধর্মঘট প্রত্যাহারের যে ঘোষণা শ্রমিক ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক নৃপেন পাল দিয়েছিলেন, তিনিও বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বললেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবার এই প্রত্যাশাটা রাখবেন, আমাদের বিশ্বাস আছে। শ্রমিকদেরও কথা হল, প্রধানমন্ত্রী আমাদের যাই দেবে, আমরা মেনে নেব।”

২০ অগাস্টের বৈঠকে ১৪৫ টাকার মজুরি কেন মেনে নিয়েছিলেন- এ প্রশ্নের জবাবে নৃপেন বলেন, “না, বিষয়টি হচ্ছে আমি মেনে নিই নাই। তখন ওই সময় কথা হইছিল যে ‘তোমরা এখন মেনে নাও’, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন আবার ঘোষণা দেবেন, তখন আবার বিবেচনা করার কথা ছিল।

“এরপর এটা শ্রমিকরা মানতে না পারলে আমি আবার আন্দোলনের ঘোষণা দিছিলাম, সাথে সাথেই। জেলা প্রশাসকের সাথে কথা হইছিল পরে যে- যেহেতু শ্রমিকরা মেনে নেয় নাই, তাই আমরা ১৪৫ টাকা মেনে নেব না এবং আমরা কাগজে সই করি নাই।”

Share if you like

Filter By Topic