সফলতার পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। আর সেটি যদি হয় নারীর, তাহলে সমাজ তাকে দমিয়ে রাখতে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয় না। সমাজের সেই সব নারীর কথা তৎকালীন সমাজ শুনতে চায় না, তাদের পাশে দাঁড়ায় না। কিন্তু তারা এগিয়ে যায় রবি ঠাকুরের অমর বাণীর মতো ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে।’
এ রকম সমাজের প্রতিকূলতার স্রোতে উল্টো সাঁতার কেটে একলা চলেছেন অসংখ্য নারী, যাদের অবদানে আমরা আজকের এই সুন্দর পৃথিবীকে দেখি। এমন অসংখ্য নারীর মাঝে পশ্চিমা ও ভারতীয় উপমহাদেশের তিনজন করে, ছয়জন নারী নিয়ে বিশ্বনারী দিবস উপলক্ষে আমাদের এই আয়োজন।
১. কম্পিউটার প্রোগ্রামিং এবং অ্যাডা লাভলেস
কম্পিউটার আবিষ্কারের জনক হিসেবে আমরা চার্লস ব্যাবেজকে জানি। তবে অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিন নামের যন্ত্রটি তিনি তৈরি করেছিলেন। তার এই অ্যানালিটিক্যাল ইঞ্জিনের পাশাপাশি আরও কিছু নোট পাওয়া যায়, যা আমাদের সামনে প্রায় একশ বছর পর দৃশ্যমান হয়।
সেই নোটগুলোতে যা লেখা ছিল তা বর্তমান সময়ের আধুনিক বিজ্ঞানের পথ তৈরি করে দেয়। নোটগুলো ছিল কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের, যার রূপকার ছিলেন অ্যাডা লাভলেস। তিনি ইতিহাসে প্রথম ব্যক্তি, যিনি প্রোগ্রামিংয়ের ধারণা আমাদের সামনে নিয়ে আসেন।
যেকোনো সফটওয়্যার, অ্যানালিটিক্যাল কাজের জন্য প্রয়োজন প্রোগ্রামিংয়ের। তাই আজকের এ সফটওয়্যার কেন্দ্রিক পৃথিবীর কথা কল্পনাই করা যেত না যদি না, অ্যাডা লাভলেস প্রোগ্রামিংয়ের ধারণা দিতেন।
২. দুই ভিন্ন শাস্ত্রে নোবেল জয়ী মাদাম কুরি
ইতিহাসে অনুপ্রেরণাদায়ী নারীদের নিয়ে কথা হবে আর মাদাম কুরির কথা বাদ যাবে, তা কী করে সম্ভব? মাদাম কুরি ইতিহাসে এখন পর্যন্ত প্রথম, যিনি বিজ্ঞানের দু’টি ভিন্ন শাস্ত্র-পদার্থ ও রসায়নে নোবেল পুরস্কার পান।
তার হাত ধরেই রেডিয়াম ও পোলোনিয়াম পৃথিবীতে এসেছে। তিনি পোর্টেবল এক্স রে মেশিনেরও আবিষ্কারক। আজকের এই আধুনিক পৃথিবীর অন্যতম কারিগর এই মহান ব্যক্তি। নারী বলে গণিতে দুর্বল, বুদ্ধি-বিশ্লেষণ ক্ষমতা কম, সমাজের এসব কুমন্ত্রণার দাঁতভাঙা জবাব- মাদাম কুরি। তিনি শুধু ভবিষ্যৎ নারীদের জন্যই অনুপ্রেরণাদায়ী নন, বরং যখনই কোনো মানুষ পৃথিবীতে অসাধ্যকে সাধ্য করার স্বপ্ন দেখবে, তখনই তার জন্য অনুপ্রেরণা হবেন মাদাম কুরি।
৩. বলিষ্ঠ নেতৃত্ব এবং রানি এলিজাবেথ
ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতি, সাম্রাজ্যের প্রতাপ ক্রমশ কমে যাওয়া, রাজনীতিতে পিছিয়ে পড়া, শক্তিতে পিছিয়ে পড়া, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র-এমন সব প্রতিকূলতার মাঝে যেকোনো রাষ্ট্রের টিকে থাকাই মুশকিল, তার ওপর ঘুরে দাঁড়িয়ে অন্যতম শক্তিতে পরিণত হওয়া রীতিমতো অসম্ভব ব্যাপার। আর এই অসম্ভব কীর্তি সাধন করেছিলেন রানি প্রথম এলিজাবেথ।
তাঁর ব্যক্তিত্ব, নেতৃত্ব, বুদ্ধি, পররাষ্ট্রনীতি, সমরনীতি তৎকালীন ইংল্যান্ডকে সাফল্যের চরম শিখরে নিয়ে যায়। ইংল্যান্ড তখন প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করে কেবল ঘরে দাঁড়িয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বরং ইউরোপের অন্যতম পরাশক্তিতে পরিণত হয়েছিল। সাফল্যের দিকে বা ইতিহাসে অন্যতম নেতা হিসেবে নাম লেখানোর যাত্রাটি তার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। পরিবেশ তাঁর জন্য ছিল প্রতিকূল।।
ইতিহাসে এ রকম পরিস্থিতি ঘুরে দাঁড়ানো কখনো দেখা যায়নি। এক বাবর তা করেছিলেন, কিন্তু তিনি পুরুষ বলে পারবেন অন্তত এই বিশ্বাসটি এই ঘুনে ধরা সমাজের মানুষের মধ্যে ছিল। অপরদিকে রানি প্রথম এলিজাবেথ তার নারী হওয়ার জন্যই বারবার তার যোগ্যতায় প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিলেন। ইতিহাসে কোন বাবরের তা হতে হয়নি। নারী বলে নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা তার মাঝে নেই, এমন বিশ্বাসকে ভেঙে চুরমার করতে সক্ষম একা এই নারী।
পশ্চিমা বিশ্বে যেরকম নারীরা পদে পদে অবহেলিত হয়ে থেকেও নিজেদের তুলে ধরতে পেরেছেন এবং এমন অনুপ্রেরণা দিয়েছেন যা আমাদের বছরের পর বছর পর্যন্ত সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম, ঠিক তেমনি বৈরী সব পথ অতিক্রম করতে হয়েছে ভারতীয় উপমহাদেশের নারীদেরও এবং ইতিহাসের পাতায় তাঁরাও আজ অক্ষয়। এ রকম তিনজন নারীর অবদানের কথা স্মরণ করা হলো।
১. ‘শিশুর হাতে কলম চাই’; একজন মালালা ইউসুফজাই
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়াতে জন্ম। এ অঞ্চলে বেশির ভাগ মানুষই পাঠান। যুগের সঙ্গে পরিবর্তন হলেও একটা সময় পাঠানদের ধ্যানধারণা ছিল খুবই রক্ষণশীল। বর্তমানে যে আমূল পরিবর্তন এসেছে, এমনটাও সঠিক নয়, তবে কিছুটা বদলেছে। আর এ বদলের পেছনের গল্পের গল্পকার হলেন মালালা ইউসুফজাই।
মালালা এমন এক অঞ্চলে নারী শিক্ষা অধিকার নিয়ে কাজ করেছিলেন, যেখানে মানুষ হিসেবে নারীদের গণ্য করা হতো না। একজন মেয়ে পড়তে পারবে, লিখতে পারবে, মা-বাবা ও পরিবারের ভরসা হয়ে উঠতে পারবে, এমনটা কেউই ভাবত না।
মালালা নিজেই তখন স্কুলে পড়ে। সে এই অধিকার বঞ্চিত শিশুদের পাশে দাঁড়ায়। শুরু করে তাদের শিক্ষিত করার কাজ। যখন নারীদের জন্য বন্ধ হতে থাকে একের পর এক স্কুল, তখন মালালা খুলে দেয় তার ঘরের দরজা। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তার কাছে পড়তে আসা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা। বিষয়টি সেখানে অবস্থানরত তালেবান দলগুলোর পছন্দ হয়নি। তারা শুরু করে তাকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো। অবশেষে ভিতু, ধর্মান্ধ একদল কাপুরুষ তাদের বীরত্ব দেখায় পনেরো বছর বয়সী মালালার সঙ্গে, তার ওপর গুলি চালানোর মাধ্যমে। সেদিন পুরো বিশ্ব একই সঙ্গে দেখেছিল জয় ও পরাজয়। জয় হয়েছিল নারী শিক্ষার জন্য সংগ্রাম করে যাওয়া কিশোরী মালালার আর পরাজিত হয়েছিল একদল সন্ত্রাসী তাদের আদর্শ এবং সমাজের ঐ সব রক্ষণশীল চিন্তা, যার জন্য মালালার মতো অনেককে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয়েছিল। এখনো বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে শিশু শিক্ষার সংগ্রাম নিয়ে যখন কথা হয়, তখন মালালা ইউসুফজাইয়ের অবদানকে স্মরণ করা হয়।
২. ভারতের সম্রাজ্ঞী রাজিয়া সুলতানা
নারী বলে নেতৃত্ব দিতে পারবে না, তাই যোগ্যতা প্রমাণ দিতে হয়েছিল ইতিহাসে আরও একজন নারীকে। তিনি ছিলেন দিল্লির কিংবদন্তি রাজিয়া সুলতানা।
ত্রয়োদশ শতকে তিনি দিল্লি শাসন করেন। সাধারণত ইতিহাসে সাম্রাজ্যভিত্তিক শাসন ব্যবস্থায় ক্ষমতা আরোহণ বিদ্রোহ, যুদ্ধ বা ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হতে দেখা যায়। জনগণের সম্পৃক্ততা এ ক্ষেত্রে খুব কমই থাকে। কিন্তু দিল্লির রাজিয়া সুলতানার সিংহাসন আরোহণের ঘটনাটি এই ধারাটি ভেঙে দেয়।
ইলতুতমিশের দরবারে দেশ শাসক হিসেবে রাজিয়া সুলতানার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন হচ্ছিল। কারণ তিনি একজন নারী এবং এর সঙ্গে যুক্ত ছিল প্রাসাদ ষড়যন্ত্র যার নেতৃত্বে ছিলেন শাহ তুরকান। এরই ধারাবাহিকতায় একে একে রাজিয়া পক্ষের অল্পসংখ্যক লোকদের হত্যা করা শুরু হয়। ষড়যন্ত্র যখন চরমে পৌঁছায়, তখন শাহ তুরকান রাজিয়া সুলতানাকে হত্যা করার জন্য এগিয়ে যায়। সুলতানা তখন তার জনগণকে একত্র করেন এবং তার বিরুদ্ধে হয়ে যাওয়া ষড়যন্ত্রকে রুখে দেওয়ার জন্য তাদের সাহায্য কামনা করেন। ইতিহাসে বিরল ঘটনা হলো সাম্রাজ্যবাদী শাসন ব্যবস্থায় প্রথমবারের মতো জনগণ রাজিয়া সুলতানার কথায় সাড়া দেয় এবং প্রতিরোধ করে শাহ তুরকানদের ষড়যন্ত্র। রাজিয়া অধিষ্ঠিত হন সিংহাসনে দিল্লির প্রথম সম্রাজ্ঞী হিসেবে।
তিনি তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা, ধর্মীয় গুরুদের চিন্তা, প্রচলিত ধ্যান ধারণাকে ভেঙে তার রাজ্যকে অল্প দিনের জন্য হলেও অর্থনৈতিক, সামরিক, কূটনৈতিক সবদিক থেকে উন্নতি করতে সক্ষম হয়। বলা বাহুল্য, তৎকালীন দিল্লি সাম্রাজ্যের অবস্থা ভালো ছিল না। একদিকে মোঙ্গলদের হামলার ভয়, আরেকদিকে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা। কিছু মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়েছিলেন রাজিয়া সুলতানা। তাই তিনি ইতিহাসে অনুপ্রেরণাদায়ী নারীদের মধ্যে একজন। দুঃখজনক হলেও সত্য তাকে নিয়ে লেখা হয়েছে খুবই কম।
৩. নক্ষত্র হয়ে আছেন কল্পনা চাওলা
উপমহাদেশের প্রথম নারী হিসেবে তিনি স্পেস শাটলে করে মহাকাশে যান।
ভারতের কার্নালে জন্ম হওয়া এই বিজ্ঞানী পাঞ্জাব ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডিগ্রি অর্জন করে যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেখানে তিনি অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন ইউনিভার্সিটি অফ কলোরাডো থেকে। পরবর্তী সময়ে তিনি নাসায় যোগদান করেন এবং ১৯৯৪ সালে মহাকাশে পাড়ি দেয়া প্রথম ভারতীয় হিসেবে নাম লেখান।
কলম্বিয়া স্পেস শাটলে ১৯৯৭ সালে তিনি প্রথম মহাকাশে পাড়ি দেন। স্পেস শাটলটি দুই সপ্তাহ ধরে পুরো পৃথিবীকে দুইশত বায়ান্ন বার পরিক্রমণ করতে সক্ষম হয়।
২০০৩ এর ১লা ফেব্রুয়ারিতে এ রকম আরও একটি মহাকাশ মিশনে যান চাওলা, যেখান থেকে ফিরে আসার সময় স্পেস শাটলটি বিকল হয়ে পড়ে এবং কল্পনা চাওলাসহ তার বাকি সঙ্গীরা প্রাণ হারান।
বিশ্বের সকল বিজ্ঞান প্রিয় নারী, যারা নক্ষত্রকে হাতের মুঠোয় করতে চায়-তাদের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে আছেন কল্পনা চাওলা।
আজকের তালিকার নারীরা ছাড়াও আরও বহু নারী রয়েছেন, যারা মানবসভ্যতার ইতিহাসের পাতায় নিজের ছাপ ছেড়ে গেছেন।
জেন অস্টিন থেকে শুরু করে অরুন্ধতী রায়, বেগম রোকেয়া থেকে শুরু করে মালালা ইউসুফজাই, শিল্পী ফ্রিদা কাহলো থেকে শুরু করে চলচ্চিত্রকার দীপা মেহতা কিংবা দিল্লির রাজিয়া সুলতানা থেকে শুরু করে ইউরোপের রানি এলিজাবেথ প্রথম, তারপর ক্যাথরিন দ্য গ্রেট হয়ে বর্তমানে নিউজিল্যান্ডের জেসিন্ডা এডার্ন। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সকল ক্ষেত্রে নারীদের অবদান অনুপ্রেরণাদায়ী। ভিন্ন ভিন্ন অর্জন, তবে সবক্ষেত্রে একটি সাধারণ প্রতিবন্ধকতা—‘তুমি নারী, তাই তুমি পারবে না’। তাই কবিগুরুর বাণী দিয়ে শুরু করে উপসংহার টানা যায় নজরুলের কবিতা দিয়ে—
‘বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চির কল্যাণকর, অর্ধেক তার করিয়াছে নারী অর্ধেক তার নর।’
মো. ইমরান খান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগে মাস্টার্সে (এমএসএস) অধ্যয়নরত। ইমেইল- mohd.imranasifkhan@gmail.com
