সিনেমা যখন অনুপ্রেরণা!


শুভদীপ বিশ্বাস তূর্য | Published: March 07, 2021 20:47:52 | Updated: March 08, 2021 19:11:25


সিনেমা যখন অনুপ্রেরণা!

ধরুন, আপনি প্রশান্ত মহাসাগরের সবচেয়ে নির্জন অঞ্চলে প্লেন ক্র্যাশের পর বেঁচে যাওয়া একমাত্র যাত্রী। সাহায্য না আসা পর্যন্ত কীভাবে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখবেন? অথবা ধরুন, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সঙ্গে সম্পর্ক তেতো হয়ে গেছে; কীভাবে সেটাকে আবার মিষ্টি করবেন?

দুটো খুবই আলাদা পরিস্থিতি, অবশ্যই। কিন্তু কোনোটিই খুব একটা সুখকর নয়। যেকোনো সমস্যা থেকে বের হতে অনুপ্রেরণার একটা ভূমিকা আছে বৈকি। আর সিনেমা অনুপ্রেরণা পাওয়ার জন্য সব সময়ই ভালো একটা মাধ্যম। চলুন ঠিক তেমন কিছু অনুপ্রেরণাদায়ী সিনেমার কথা বলি:

১. দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন

স্টিফেন কিংয়ের লেখা গল্প থেকে তৈরি সিনেমাটি আইএমডিবির তালিকায় প্রথম স্থান দখল করে আছে। এই সিনেমাটিই প্রথম স্থানে কেন আছে, তা জানতে হলে আসলে এটি দেখা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। ছবিটির মূল চরিত্র অ্যান্ডি তাঁর স্ত্রী এবং স্ত্রীর অবৈধ প্রেমিককে হত্যা করার অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা পায় যা তাকে ভোগ করতে হবে শশাঙ্ক জেলে। অ্যান্ডিকে জেলে যেতে হয়, এবং দীর্ঘ উনিশ বছর পর সে কীভাবে মুক্তি পায়, সেটি নিয়েই ছবির কাহিনি।

দ্য শশাঙ্ক রিডেম্পশন সিনেমার অনুপ্রেরণার জায়গাটি খুঁজে পাওয়া যায় সিনেমাটিরই একটি সংলাপে: রিমেমবার, হোপ ইজ আ গুড থিং, মে বি দ্য বেস্ট অব থিংস, অ্যান্ড নো গুড থিং এভার ডাইজ (মনে রেখো, আশা একটি ভালো ব্যাপার, সম্ভবত সবচেয়ে ভালো বিষয়ের একটি এটি, এবং ভালো কোনো কিছুরই মৃত্যু নেই)। আশা এবং একাগ্রতা থাকলে মানুষ কী করতে পারে, সেটা যেন এ সিনেমায় জ্বলজ্বলে অক্ষরে লেখা হয়েছে। বিশেষ করে, মুক্তি পাওয়ার পর অ্যান্ডির ধারাবর্ষায় স্নানের দৃশ্যটি দেখে অনুপ্রাণিত হননি এমন মানুষ কমই আছেন। তাই জীবনে আরেকটু আশাবাদী হওয়ার জন্য সিনেমাটি দেখেই নেওয়া যেতে পারে। সিনেমাটিতে অভিনয় করেছেন টিম রবিন্স (অ্যান্ডি), মরগ্যান ফ্রিম্যান (রেড) প্রমুখ। ছবিটি পরিচালনা করেছেন ফ্র্যাঙ্ক ড্যারাবন্ট।

২. ফরেস্ট গাম্প

আইএমডিবির র‌্যাঙ্কিংয়ে বেশ ওপরের দিকে থাকা এই সিনেমাটির মূল চরিত্র হচ্ছে ফরেস্ট, যে কিনা ছোটবেলা থেকেই শারীরিক ও মানসিকভাবে নানা দিক দিয়ে বাধাপ্রাপ্ত। সে অনেক কিছুই বুঝে উঠতে পারে না, বেশির ভাগ সময়েই নিজের মতো একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে ফেলে। কিন্তু এই মানুষটিই নিজ গুণে একটা সময় হয়ে দাঁড়ায় যুদ্ধে অসামান্য সফল সৈনিক, অল আমেরিকান পিংপং টিমের খেলোয়াড়, বিশাল বুব্বা-গাম্প শ্রিম্প কোম্পানির মালিক এবং আরও অনেক কিছু।

ফরেস্ট গাম্পের চরিত্রের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে তার শিশুসুলভ আচরণ, এবং একই সঙ্গে তার পর্বতকঠিন একাগ্রতা। শুধু এই দুটো গুণের জন্যই ফরেস্ট গাম্প এগিয়ে যেতে পারে বহু বহুদূর। তা ছাড়া জীবন কী? জীবনের মানে কী? ধরনের প্রশ্ন যাদের মাথায় সর্বক্ষণই ঘুরপাক খায়, তাদের জন্য অনুপ্রেরণার একটি উৎকৃষ্ট জায়গা হতে পারে এই সিনেমাটি। ছবিটিতে ফরেস্ট গাম্পের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন টম হ্যাংকস। এই চরিত্রটির জন্যই তিনি সে বছর অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড লাভ করেন।

৩. কাস্ট অ্যাওয়ে

টম হ্যাংকস অভিনীত কাস্ট অ্যাওয়ে সম্ভবত সারভাইভাল জনরার সবচেয়ে আলোচিত সিনেমাগুলোর একটি। এর কাহিনিতে দেখা যায়, ফেডএক্সের সিস্টেমস অ্যানালিস্ট এক্সিকিউটিভ চাক নোলান্ড প্রচণ্ড সময়-সংবেদনশীল একজন মানুষ। প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় তিনি প্লেন ক্র্যাশের শিকার হন। তার ঠাঁই হয় একটি বেনামি, বসবাস-অযোগ্য দ্বীপে, একদিন বা দুদিনের জন্য নয়, দীর্ঘ চার বছরের জন্য। সঙ্গী হয় উইলসন কোম্পানির একটি ভলিবল, যার নাম দেওয়া হয় উইলসন।

এতগুলো বছর একটা নির্জন দ্বীপে একা পড়ে থাকা, তার চেয়েও জরুরি যেটা, বেঁচে থাকা, কীভাবে সম্ভব হতে পারে, এই সিনেমাটি না দেখলে হয়তো বোঝা সম্ভব হবে না। বেঁচে থাকার জন্য একজন মানুষ কী না করতে পারে, তা জানার জন্যও সিনেমাটি দেখে নেওয়া দরকার। প্রচণ্ড হতাশায় ভোগা মানুষগুলোর জন্য আদর্শ একটি সিনেমা হতে পারে এটি, একাকিত্বে ভোগা মানুষগুলোর জন্য হতে পারে বেশ ভালো অনুপ্রেরণা।

৪. তারে জামিন পার

ঈশান আওয়াস্থি, ছোট্ট একটা বাচ্চা, ডিসলেক্সিয়ার শিকার। পড়াশোনায় মাথা নেই। অঙ্ক ভুল হয়। সঠিক বানানের বালাই নেই। অক্ষর লেখে কিম্ভূতরকম উল্টো করে। অথচ তার বড় ভাই সোনার টুকরো ছেলে, যেমন পড়ায়, তেমনি খেলায়, তেমনি আর সবকিছুতে। তাই বাবা ঈশানের ওপর খুবই অসন্তুষ্ট। অতএব, অপারগতার শাস্তিস্বরূপ ঈশানকে যেতে হয় এক কঠোর নিয়মের বোর্ডিং স্কুলে। সেখানেই তার সঙ্গে দেখা হয় রাম শংকর নিকুম্ভের, যিনি স্কুলটির নতুন আঁকার শিক্ষক। এর পর থেকেই পাল্টে যেতে থাকে ঈশানের জীবন।

যারা শারীরিক বা মানসিকভাবে একটু দুর্বলতার শিকার, কিংবা যারা খুব ইনফিরিয়রিটিতে ভোগেন, তাদের জন্য খুব ভালো অনুপ্রেরণা হতে পারে এই সিনেমাটি। শুধুমাত্র একটু পথপ্রদর্শন কীভাবে রাতারাতি একজন মানুষের প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারে, সেটাই দেখা যাবে এই সিনেমায়। সিনেমাটিতে ঈশানের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন দারশিল সাফারি এবং তার শিক্ষকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন আমির খান।

৫. বেলাশেষে

কলকাতার এই সিনেমাটি খুব সম্ভবত আপামর বাঙালির মনেই নতুন একটা বোধের জন্ম দেয়। আমাদের ঠিক আগের যে প্রজন্ম, আমাদের বাপ-দাদাদের যে প্রজন্ম, তাদের জীবন এখন কেমন কাটে? তারা কি ভালো আছেন? কিংবা, অর্ধশতাব্দী এক সঙ্গে, এক ছাদের নিচে কাটানোর পর কোনো দম্পতির নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া কেমন থাকে? ভালোবাসাটা একইরকম থাকে কি? বেলাশেষে সিনেমার গল্পই এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। সিনেমাটিতে মুখ্য ভূমিকায় অভিনয় করেছেন সদ্যপ্রয়াত সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং আরতি বন্দ্যোপাধ্যায়।

৬. আসা যাওয়ার মাঝে

গল্পটা দুজন স্বামী-স্ত্রীর। স্বামীটি প্রিন্টিং প্রেসে কাজ করেন, আর স্ত্রী হ্যান্ডব্যাগ তৈরির কারখানায়। একজন ডে শিফটে, অন্যজন নাইট শিফটে। একজন সকালবেলা ফেরেন, অন্যজন রাতে। এই আসা-যাওয়ার মাঝে তাদের দেখা হয় সকালবেলায়, অল্প কিছুক্ষণের জন্য, সবদিন হয়তো তাও হয় না।

যেসব মানুষ একটি সম্পর্কে আছেন, এবং অপর পাশের মানুষকে খুব একটা সময় দিতে পারেন না বলে দুঃখিত, লজ্জিত এবং চিন্তিত, কিংবা যেসব মানুষের প্রিয় মানুষটার প্রতি অভিযোগ সময় দিতে না পারার জন্য, তাদের জন্য অবশ্যই একটি অনুপ্রেরণাদায়ী সিনেমা এটি। এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন ঋত্বিক চক্রবর্তী এবং বাসবদত্তা চট্টোপাধ্যায়। পরিচালনা করেছেন আদিত্য বিক্রম সেনগুপ্ত।

সিনেমাকে বলা হয় লার্জার দ্যান লাইফ। এই টার্মটির সবচেয়ে বড় সার্থকতা এখানেই যে, কিছু কিছু সিনেমা মানুষের জীবনে, কাজকর্মে এতটাই প্রভাব ফেলে, যে সেই সব সিনেমা আর নিছক সিনেমা থাকে না, হয়ে ওঠে একেকটা অনুপ্রেরণার নাম। তাই, সিনেমা হাসুক, হাসাক, কাঁদুক, কাঁদাক, সঙ্গী হয়ে থাকুক সব সময়। সিনেমা চলুক সিনেমার ডায়ালগের মতোই, পিকচার আভি বাকি হ্যায় মেরে দোস্ত!

Share if you like