হাত পাখা, টেবিল ফ্যান, স্ট্যান্ড ফ্যান, সিলিং ফ্যান, এয়ার কুলার, এয়ার কন্ডিশনার - তীব্র গরমে প্রশান্তি এনে দেওয়ার জন্য কত কিছুই না রয়েছে। বিদ্যুতের আশীর্বাদে মুহূর্তে সুইচ টিপে শীতল হাওয়া ছড়িয়ে পড়ে। এটি বর্তমান যুগের চিত্র।
তবে সেই ইংরেজদের আমলে, যখন তারা সর্বপ্রথম এই ভারত উপমহাদেশে এসেছিল তখনকার চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। গরমে ঠান্ডা ঠান্ডা হাওয়া উপভোগের জন্য সেইসময়ের ইংরেজরা এক নতুন পেশা ও পেশাদার গোষ্ঠীর সৃষ্টি করেছিলেন যারা পাংখাওয়ালা হিসেবে পরিচিত ছিল।
আঠারো শতকের শেষের দিকে ইংরেজরা যখন প্রথম ভারতের মাটিতে নিজেদের শাসন কায়েম করতে শুরু করল, আধিপত্য বিস্তারে কোনো বেগ পেতে না হলেও পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে নেয়াটা তাদের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। উষ্ণ আবহাওয়া (এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত গ্রীষ্মকাল থাকে তবে এপ্রিল ও মে মাসে সর্বোচ্চ দাবদাহ বিরাজ করে), মশার উপদ্রব, অতিরিক্ত ঝাল-মশলাযুক্ত খাবার ও ভাষাগত সমস্যা ইংরেজদের জন্য বেশ প্রতিকূল অবস্থার সৃষ্টি করেছিল।
ভারত উপমহাদেশে তখনও বিদ্যুৎ সুবিধা আসেনি। বৃটিশ ও ইউরোপিয়ান অধিবাসীরা গ্রীষ্মকালে ঠিকমতো রাতে ঘুমাতে পারত না। বলতে গেলে বছরের প্রায় অর্ধেক সময় তারা ঘুমজনিত নানা সমস্যায় ভুগত।
এর ফলে ঔপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থায় মারাত্মকভাবে প্রভাব ফেলেছিল। রাতের ঘুম ঠিক মতো না হওয়ার ফলে দিনের পুরোটা সময় যেমন এক ধরনের অস্বস্তিদায়ক অনুভূতি কাজ করে ঠিক তেমনি মেজাজটাও থাকে চিড়চিড়ে। সময়ানুবর্তিতা ও আমলাতান্ত্রিক পেশাদারিত্বেও একটা টালমাটাল অবস্থা দেখা দেয়।
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যেমন রাজ্য শাসন হয় না, ঠিক তেমনি দিনের পর দিন নিদ্রাহীন রাত কাটিয়ে ঘুম ঘুম চোখে শাসন ব্যবস্থা চালানো যায় না।
এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য পাখা দিয়ে বাতাসের এক অভিনব পন্থা বের করা হলো। তবে ইংরেজ ও তৎকালীন ভারতের বিত্তশালী ব্যক্তিদের জন্যই এই সুবিধা সীমাবদ্ধ ছিল, কারণ এটি যথেষ্ট ব্যয়বহুল। সবার পক্ষেই পাখা কেনাটা সহজ সাধ্য কোনো ব্যাপার ছিল না।
সেসময়ের পাখা এবং এর পুরো সেটআপটাই অন্য ধাঁচের ছিল। পাখা সাধারণত চারকোণা আকৃতির হতো এবং লম্বায় প্রায় ১০ ফিট থেকে শুরু করে ৪০ ফিট এমনকি এর বেশিও হতো। বেত বা হালকা কাঠের তৈরি এই পাখাগুলোর উপরে সুন্দর কাপড় দিয়ে নকশা করা থাকতো এবং নীচের দিকে অনেকটা ঝালরের মতো করে কাপড় আটকে দেয়া হতো। এই পাখাগুলো সিলিং থেকে ঝুলিয়ে দেয়া হতো এবং দড়ির সাহায্যে কিছু ভৃত্য বা দাস ক্রমাগত টেনে শীতল বাতাস ছড়িয়ে দেয়ার কাজে নিয়োজিত থাকত।
এটি ব্যয়বহুল হওয়ার কারনে কেবলমাত্র রাজবাড়ি ও সরকারি ভবনগুলোতেই এর ব্যবহার দেখা যেতো। শোবার ঘর, তৈরি হবার ঘর, বসার ঘর, খাওয়ার ঘর, বাথরুম ও বিভিন্ন অফিস কক্ষে পাখা সেট করা হতো।
বাতাস করার এই কাজটি বিরামহীনভাবে যারা করে যেতো তাদেরকে বলা হতো পাংখাওয়ালা। ঘরের এক কোণায় বসে বা দেওয়াল ফুটো করে দড়ি বাইরে বের করে দিয়ে পাশের ঘর বা বারান্দা থেকে তারা দড়ি টেনে টেনে বাতাস করত।
সমাজের একদম নিম্ন আয়ের মানুষদের এই পেশায় নিযুক্ত করা হতো এবং মাস শেষে নামমাত্র সম্মানী দেয়া হতো। তবে নির্বাচনের ক্ষেত্রে ইংরেজরা বধির মানুষদের বেশি পছন্দ করতেন কারণ তাদের সামনে অনায়াসে যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ও গোপন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা নিরাপদ।
সারাদিন বাতাস করার ক্ষেত্রে দুজন বা দুদল পাংখাওয়ালার প্রয়োজন হতো। প্রত্যেকে ১২ ঘণ্টা করে বাতাস করার কাজ করতো। কেবলমাত্র সকালে ও সন্ধ্যায় তারা তাদের কাজ থেকে অব্যহতি পেতো। বাতাস করার কাজটি খুব কঠিন ছিল তা নয়, তবে টানা একভাবে কাজ করে যাওয়াটা ভীষণ ক্লান্তিকর।
দাসদের উপর ইংরেজদের অত্যাচার নতুন কিছু নয়। এক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম ছিল না।
বাতাস করতে করতে যেন তারা ঘুমিয়ে না পড়ে এইজন্য তাদের মাথার চুল পেছনে কোনো কিছুর সাথে আটকে রাখা হতো।
অনেকসময় তাদের বগলের নীচে একটি জীবন্ত পাতিহাঁস বা রাজহাঁস ধরে রাখতে দেওয়া হতো, ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লে বগলের তলা থেকে হাঁস ছুটে গেলেই রীতিমত কঠিন শাস্তি পেতে হতো পাংখাওয়ালাদের।
বসে বসে হাত দিয়ে দড়ি টানার পাশাপাশি অনেকে শুয়ে থেকে পা দিয়ে দড়ি টানার কাজ করতো। তাদের শরীরের নীচে চিনি ছিটিয়ে দেয়া হতো যাতে করে ঘুমিয়ে পড়লে এই ঘর্মাক্ত মানুষগুলোর গায়ের ঘামের আকর্ষণে ছুটে আসা পিঁপড়ার কামড়ে তারা আবার জেগে যায়!
বিশেষত রাতের বেলায় যারা বাতাস করতো, মনিবরা ঘুমিয়ে পড়লে তারাও অনেকসময় কিছুটা স্বস্তিবোধ করে ক্লান্তির ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ত। বাতাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে গরমে ঘুম ভেঙে ইংরেজদের মেজাজ যেতো বিগড়ে। বাইরে বেরিয়ে এসে ঘুমে আচ্ছন্ন পাংখাওয়ালাদের গালিগালাজ করার মধ্যেই তাদের ক্রোধ সীমাবদ্ধ থাকত না। তাদের শরীরে সজোরে লাথি বা মাথার একপাশে চপেটাঘাত করতে তাদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা কাজ করত না। এমনকি পানি রাখার বড় বড় পাত্র তাদের গায়ে ছুঁড়ে মারত।
সময়ের পরিক্রমায় বিদ্যুৎ সুবিধা এলো আর ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হলো পাংখাওয়ালা নামক এক ধরনের শ্রমজীবী মানুষদের গল্প গাঁথা।
শবনম জাবীন চৌধুরী ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের ফার্মেসি বিভাগ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।
zabin860@gmail.com