মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র গত সপ্তাহে স্বৈরাচারের দিকে তার যাত্রায় আরেকটি পদক্ষেপ নিয়েছে। এর কারণ হলো লিজ চেনি নিজ ওয়াইমিং এলাকার রিপাবলিকান প্রাথমিক বাছাইতে হেরেছেন। তাঁর বাবা সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি। জর্জ ডব্লিউ বুশের অধীনে ইরাক যুদ্ধের পরিকল্পনা করেছিলেন চেনি। লিজ নিজেও সন্দেহাতীত ভাবে কট্টর রক্ষণশীল। তারপরও তিনি রিপাবলিকানদের দৃষ্টিতে কেন ঘৃণিত হয়ে উঠেছেন? কি ছিল তার অপরাধ? লিজ বিশ্বাস করেন যে সুষ্ঠু নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়া তাদের "মহান নেতা"র মিথ্যাবাণী প্রচারের চেয়েও বড় ধরণের কর্তব্য।
রিপাবলিকান পার্টি এখন গ্রহণ করেছে ১৯৩০-এর দশকের জার্মানদের ফুয়েরারপ্রিনজিপ বা নেতৃত্ব নীতি। এ নীতি অনুযায়ী, নেতার প্রতি আনুগত্য হবে প্রশ্নাতীত। কোনটা সত্য এবং সঠিক তা নির্ধারণ করে দেবেন তিনিই। তার এই নির্ধারণ করাকেই মানতে বাধ্যগত থাকতে হবে। ট্রাম্পের মহা মিথ্যা বা বিগ লাইকে রিপাবলিকানরা এ ভাবেই কোলে টেনে নিয়েছেন। গত মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প জিতেছিলেন বলে যে কথা রিপাবলিকানরা দাবি করছেন সেটি হলো এই নীতির এক নিখুঁত উদাহরণ। এ ছাড়াও এটি সরাসরি উদার গণতন্ত্রের অন্যতম মূল মূল্যবোধ, সুষ্ঠু নির্বাচনেরও বিরোধী অবস্থান করে নিয়েছে। খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এমন এক ভাবনার বিকাশ ঘটবে - মাত্র দশটি বছর আগেও আমেরিকার অধিকাংশ মানুষের কাছে তা ছিল অকল্পনীয়। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে এমনটি সম্ভব হয়ে ওঠে। এবারে ট্রাম্পের পরাজয়ের এবং তার মহা মিথ্যার প্রতি নিজ দলের যে জোরালো প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে তা হয়ে উঠেছে আরেকটি ভাগ্য নির্ধারক মুহূর্ত ।
গণতন্ত্রকে ধ্বংস করা কঠিন নয়- এমন বাক্য যুক্তিসহ তুলে ধরেছেন হাউ ডেমোক্রেসিস ডাই নামের দুর্দান্ত বইয়ে হার্ভার্ডের স্টিভেন লেভিটস্কি এবং ড্যানিয়েল জিব্লাট। অতীত কালে এবং সাম্প্রতিককালেও অনেকবার এমন ঘটনা ঘটেছে। প্রথমত, নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রেফারিদের (বিচার বিভাগ, কর কর্তৃপক্ষ, গোয়েন্দা সংস্থা এবং আইন প্রয়োগকারীদের) স্বমতে আনতে হবে। তৃতীয়ত, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং সর্বোপরি মিডিয়াকে পাশে ঠেলে দিতে হবে বা বা নির্মূল করতে হবে। নেতা আজকের জন্য যে মিথ্যাকে সবচেয়ে দরকারী বা প্রয়োজনীয় মনে করবেন তার বিপরীতে যে সব বিষয়ে বিরোধী পক্ষ অবস্থান নেবে তার সবগুলোকে ভুয়া এবং অবৈধ বলা জোরের সাথে বজায় রাখতে হবে।
প্রথম মেয়াদে, নিজ সমর্থকদের কাছে তাঁর মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার কাজে ট্রাম্প অনেক অগ্রগতি লাভ করেন। কিন্তু ট্রাম্প বা তাঁর অধীনস্থ কেউই এখনও নির্বাচনী ব্যবস্থা বা সরকারের কলকব্জাকে বিকল করার বা বদলে দেওয়ার, রি ইঞ্জিনিয়ারিং করার পদ্ধতি বের করতে পারেননি। তার এ নিয়ে কখনোই কাজ করেননি এটা যেমন ঠিক। তেমনি ঠিক কথা হলো, অন্ধ আনুগত্য, যোগ্য এবং নিবেদিত সঠিক সহকারীচক্রও ট্রাম্পের ছিল না। বরং তাঁকে ঘিরে ছিল এমন একদল লোক যাদের অন্তত কিছুটা হলেও নীতিবোধ ছিল। রিপাবলিকান দলে এখন তাদেরকে অবিশ্বস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
তবে এখন পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। তিনি এখন দলকে অনেকটাই নিজের মনের মতো করে নিয়েছেন। লিজ চেনির হেরে যাওয়াই তার প্রমাণ। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, রিপাবলিকানদের মধ্যে ব্যাপকভাবে মনে করা হয়, ট্রাম্পের সব আচরণই মার্কিন সব আইন বা কংগ্রেসর কাছে দায়বদ্ধতার উর্ধ্বে।
রবার্ট কাগান বলেন, ট্রাম্প ও তাঁর দল, গত নির্বাচনকে "চুরি" করা হয়েছে বলে মিথ্যাকে কাজে লাগিয়ে মার্কিন নির্বাচন ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা সৃষ্টি করতে চাইছেন। এ কাজে তাঁরা অনেক এগিয়ে যাচ্ছেন।
ট্রাম্পবাদের গুরুত্বপূর্ণ পরবর্তী পর্যায় হল রাষ্ট্রের মূল প্রতিষ্ঠানগুলো দখল করা। সেখানকার নেতা ও কর্মীদেরকে বদলে দিয়ে ট্রাম্পের প্রতি অন্ধভাবে অনুগত ব্যক্তিদের বসানো। এ কাজে শতভাগ সফল হতে হলে ট্রাম্পকে প্রথমে প্রেসিডেন্ট হতে হবে। এ কারণেই নির্বাচন ব্যবস্থাকে নস্যাৎ করার কাজের অগ্রগতির মতোই ট্রাম্পকে কারাগারের বাইরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সম্প্রতি দুটি নিবন্ধে অ্যাক্সিওসের জোনাথন সোয়ান আরও কিছু কথা বলেছেন এবং এ কাজের জন্য অত্যাবশ্যক হিসেবে বিবেচিত হবে সে কথাগুলো। সোয়ান বলেন, একটি নীল নকশা বাস্তবায়ন নিশ্চিত করার জন্য মার্কিন সরকারের উপর থেকে নিচ পর্যন্ত সবস্তরে অন্ধ অনুগত কর্মী থাকত হবে। তিনি আরও বলেন, এই মতলব হাসিলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো সরকারী সংস্থাগুলোতে স্থায়ী কর্মীদের সরিয়ে সেখানে সতর্কতার সাথে যাচাই করা অনুগত কর্মীদের বসান। রিপাবলিকানরা যদি কংগ্রেসকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে তবেই এমনটি কল্পনা করা কোনও কঠিন বিষয় হবে না।
মনে করুন, ট্রাম্পের অন্ধ অনুগতরা এফবিআই, সিআইএ এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বিভাগের নেতৃত্ব রয়েছেন। ওই সব সংস্থার কর্মীরাও ট্রাম্প-অনুগত। ধরুন, ট্রাম্পের খয়ের খা এক প্রতিরক্ষামন্ত্রীর আওতায় মার্কিন সামরিক বাহিনীর বড় বড় পদগুলোতে ট্রাম্পপন্থীরা বসে আছেন। মনে করুন ট্রাম্প-অনুগতরাই ফেডারেল রিজার্ভসহ সব উল্লেখযোগ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থার পরিচালনা পর্ষদের আসন জুড়ে রয়েছেন। এবারে কল্পনা করুন, সে সময় মার্কিন আইনের শাসন এবং নাগরিক অধিকারের স্বরূপটি কি দাঁড়াবে। এবারে আরেক ধাপ এগিয়ে ভাবুন এই ধরনের সংস্থাগুলো বিশেষ করে মিডিয়াসহ স্বতন্ত্র ও স্বাধীন ব্যবসার উপর কী বিপুল পরিমাণে চাপ দিতে পারবে।
স্বৈরাচারের অধীনে বাজার হবে ধামাধরা পুঁজিবাদের অভয়অরণ্য। সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের চেহারা খুবই ভিন্ন হবে? হতে পারে, ফেডারেল ব্যবস্থা এবং বিচার বিভাগ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা রক্ষা করবে। কিন্তু তারপরও ফেডারেল সরকারের কর্মী হয়ে তাদের শেষকথা হবে নেতার আনুগত্য করা। এমন পরিস্থিতিতে নেতার কামনা-বাসনা বা ইচ্ছাকে প্রতিরোধ করা কঠিনই হবে।
স্বৈরাচার মানে জবাবদিহিহীন শাসন। এর অর্থ যোগ্য বা নাক গলানো শাসন নয়। এটাও সম্ভব যে স্বৈরতন্ত্র অযোগ্য এবং অলস হবে। এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচার, আর এটাই শেষ কথা।
বিশ্বের জন্য এই ধরনের দ্বিতীয় ট্রাম্প প্রশাসনের অর্থ কী দাঁড়াবে? সর্বোপরি মিত্রদের জন্য মানে কি দাঁড়াবে? "আমেরিকা-প্রথম" জাতীয়তাবাদী ভাবধারার মার্কিন প্রশাসন হলে এবং তাদের শাসন ব্যবস্থা আগে যা বলা হয়েছে তেমনটি হলে উদার আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অবশিষ্ট বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রে তার প্রভাব কি হবে? বৈশ্বিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে এ শাসন ব্যবস্থার অর্থ কী হবে? এমন সব প্রশ্নের জবাবে বলতে হবে - " না ভালো কিছুই হবে না।" "আমেরিকান ব্যতিক্রমবাদ"এর ইতি ঘটার অর্থ হলো সম্ভবত বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভিত্তি হিসাবে স্বতন্ত্র স্বার্থ বলয়মণ্ডলী গঠিত হবে। কেউ কেউ হয়ত তা পছন্দ করতেও পারেন। । তবে এর মধ্য দিয়ে বিপর্যয়কর একটি রূপান্তরও হবে। সে রূপান্তরটি হবে স্বৈরাচারের জগতের দিকে।
২৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে, রোমান প্রজাতন্ত্র রূপান্তরিত হয়ে সামরিক একনায়কত্বের রূপ নিয়েছিল। একে আমরা রোমান সাম্রাজ্য বলি। এটা অসম্ভব নয় যে এমন একটি রূপান্তরের প্রক্রিয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও চলছে। এখনও বেশিরভাগ মানুষের কাছে বিষয়টি অকল্পনীয় বলে মনে হতে পারে। আমি আশা করি যে তাই যেন হয়। মোদ্দা কথা হলো ট্রাম্প বুড়ো হয়ে গেছেন। তাঁর কোনও উপযুক্ত বিকল্প কেউ নেই। তবুও প্রতিদিন তিনি সুযোগ নিচ্ছেন। মার্কিন প্রজাতন্ত্রের নৈতিক অবক্ষয় প্রকাশ করছেন। আমেরিকান রক্ষণশীলতা এখন একটি উগ্র জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। এই রক্ষণশীলতা এক ব্যক্তির উদ্ভাবিত সত্যের প্রতি অনুগত এবং "ডিপ স্টেট" এর জন্য নিবেদিত প্রাণ। ডিপ স্টেট বলতে তাদের নিজস্ব সরকারকেই বোঝানো হচ্ছে। ডিক চেনি বলেছেন যে ডোনাল্ড ট্রাম্প "মার্কিন প্রজাতন্ত্রের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।" এ ক্ষেত্রে আমাদের চেনিকেই বিশ্বাস করা উচিত: ট্রাম্প সত্যিই তাই।
[মার্টিন উলফ, ফাইনান্সিয়াল টাইমসের চীফ ইকোনমিকস কমেনটেটর। লেখাটি মূল ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা।]