এভারিস্ত গ্যালোয়া, মাত্র বিশ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়া এক ফরাসী তরুণ। সময়ের হিসেবে অত্যন্ত সামান্য এই জীবনের পুরোটা অবশ্য দারুণ বৈচিত্র্যে ভরপুর। এতোই উত্থানপতন আর রোমাঞ্চ সেখানে যে, তার জীবনকে সিনেমার গল্প ভেবে বসলেও ভুল হয় না। রাজনৈতিক সংগ্রাম, প্রেম আর মৃত্যুর বেদনার্ত ছোঁয়ার বাইরে এভারিস্ত গ্যালোয়া গণিত ও বিজ্ঞানপ্রেমীদের কাছে পরিচিত এক রাতের গণিতবিদ নামে।
গ্যালোয়ার জন্ম ১৮৮১ সালের ২৫ অক্টোবর, ফ্রান্সের বুর্গ-লা-রেইনে। ছোটবেলায় পড়াশুনায় বেশ ভালো ছিলেন তিনি, ল্যাটিন ভাষায় দক্ষতার জন্য পুরস্কারও পেয়েছিলেন। এরই মধ্যে ১৪ বছর বয়সে গণিতের সাথে প্রথমবারের মতো পরিচয় ঘটে গ্যালোয়ার, আর এরপরই হঠাৎ করেই পাল্টে যায় তাঁর জীবনের মোড়।
গণিতকে এতোটাই পছন্দ করে ফেলেন গ্যালোয়া যে তিনি সবকিছু বাদ দিয়ে দিনরাত পড়ে থাকতে শুরু করলেন নানা ধরণের গাণিতিক সমস্যা নিয়ে। শুরুতে অন্য সব বিষয়ে অকৃতকার্য হলেও গণিতে ভালো নম্বর পেতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে সমস্যা বাড়তে থাকে। গ্যালোয়ার মনে হতে থাকে তাকে শিক্ষকরা পড়াতে পারছেন না। এদিকে পরীক্ষার প্রশ্নগুলো গ্যালোয়া এমনভাবে উত্তর করতে শুরু করেন যে শিক্ষকরাও তার খেই হারিয়ে ফেলতে থাকেন। ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো, গণিতেও বাজে নম্বর পেতে শুরু করলেন গ্যালোয়া।
গ্যালোয়া গণিতের জন্য তৎকালীন ফ্রান্সের সবচেয়ে নামকরা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইকোল পলিটেকনিকে ভর্তি পরীক্ষায় বসেছিলেন, কিন্তু মৌখিক পরীক্ষায় উপযুক্ত ব্যাখ্যা করতে না পারার কারণে তার সেখানে পড়া হয়নি। পরে তুলনামূলক নিচের দিকের প্রতিষ্ঠান ইকোল প্রিপারেটরিতে ভর্তি হন। মাত্র ১৫ বছর বয়সের গ্যালোয়া ততোদিনে পড়ে ফেলেছেন আদ্রিয়েন-মারি-লেগ্রেন্দের লেখা এলিমেন্টস অব জিওমেট্রি, ল্যাগ্রাঞ্জের লেখা ইকুয়েশন থিওরির বইয়ের মতো গণিতের খটমটে সব বই।
শিল্পীর আঁকায় এভারিস্ত গ্যালোয়া।ছবি: ডেভিয়ান আর্ট
ইকোল পলিটেকনিকে ভর্তি হতে না পারলেও নিয়মিত গণিত নিয়ে কাজ করে যাচ্ছিলেন গ্যালোয়া। এ সময়েই ত্রিঘাত, চতুর্ঘাত ও পঞ্চমঘাত সমীকরণের ওপর তার লেখা গবেষণাপত্রগুলো পাঠিয়ে দেন অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের কাছে। সেগুলো বিচার করার দায়িত্বে থাকা বিখ্যাত গণিতবিদ কশি পেপারগুলো পড়েই বুঝতে পারেন, গণিতের রাজ্যে আগমন ঘটেছে নতুন এক রাজপুত্রের। কশি পেপারগুলো প্রতিযোগিতার জন্য একটু ভিন্নভাবে সাজিয়ে আবার জমা দিতে বলেন। কশির মতো গণিতজ্ঞের কাছ থেকে পাওয়া এই স্বীকৃতি গ্যালোয়াকে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করেছিল এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশুনার ওপর ভরসা না করে নিজে থেকেই গণিতের চর্চা বাড়িয়ে দিতে থাকেন।
এদিকে ফ্রান্সে তখন উত্তাল সময় চলছে। রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বাড়ছে আন্দোলন, রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি পুরো দেশ। এরই মধ্যে রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের স্বীকার হয়ে ১৮২৯ - এ আত্মহত্যা করেন গ্যালোয়ার বাবা। সব মিলিয়ে শান্ত স্বভাবের গ্যালোয়া হঠাৎ করেই রুক্ষ আর বেপরোয়া হয়ে উঠতে শুরু করেন।
বাবার মৃত্যুর পর গ্যালোয়া প্যারিসে ফিরে কশির পরামর্শ অনুযায়ী সাজানো গবেষণাপত্র দুটি আবার জমা দিলেন। কিন্তু পুরস্কার ঘোষণার আগেই বিচারক স্যার জোসেফ ফুরিয়ারের মৃত্যু হলে গ্যালোয়া আর পুরস্কার পাননি এবং পরবর্তীতে তার গবেষণাপত্র হারিয়ে গেছে বলে জানায় অ্যাকাডেমি অব সায়েন্স। কিন্তু গ্যালোয়ার সন্দেহ হয় যে গবেষণাপত্র হারানোর বিষয়টা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। পরবর্তীতে তার গবেষণাপত্র অযৌক্তিক আখ্যা দিয়ে বাতিল হওয়ায় গ্যালোয়ার সন্দেহ আরো ঘনীভুত হয়। রাগের মাথায় গ্যালোয়া রাষ্ট্রবিরোধী এক প্রতিবেদন লিখে ফেললেন। যার ফলে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কার করা হয়।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর গ্যালোয়ার জীবন যেন পুরোপুরি উচ্ছন্নে চলে গেল। একদিন রাস্তায় মাতাল হয়ে সরকারবিরোধী মিছিল করছেন তো পরদিন ছুরি হাতে সম্রাটকে হত্যার হুমকি দিচ্ছেন। আর এইসব কারণে গ্রেফতারও হচ্ছিলেন প্রতিনিয়ত। এই বেপরোয়া জীবনের মধ্যেই গ্যালোয়া প্রেমে পড়ে যান স্টাফানি ফেলিসি নামক প্যারিসের এক ডাক্তারের মেয়ের। কিন্তু স্টাফানি ছিলেন আরেক সম্ভ্রান্ত যুবক পেশ্চু ডি অরবনভিলের বাগদত্তা এবং পেশ্চু এই গ্যালোয়ার অনুরক্ত হওয়ার বিষয়টিকে মোটেও ভালো চোখে দেখেননি। অতঃপর অপমান এবং ক্রোধে উন্মত্ত পেশ্চু গ্যালোয়াকে ডুয়েল লড়াইয়ের চ্যালেঞ্জ দেন।
ডুয়েল চ্যালেঞ্জ পাওয়ার পরই গ্যালোয়ার যেন বোধ ফিরে আসে। তিনি বুঝতে পারেন ডুয়েলের ফলাফল কী হতে চলেছে এবং তখনই তাঁর মনে হয় যে এতোদিনের করা তার সব কাজ হারিয়ে যাবে কালের অতলে। তাই ডুয়েলের আগের রাতে সারারাত জেগে এভারিস্ত গ্যালোয়া লিখে ফেলেন তার সারা জীবনে আবিষ্কার করা সব গাণিতিক তত্ত্ব লিপিবদ্ধ করতে শুরু করেন।
.png)
কাটাকুটিযুক্ত এলোমেলোভাবে লেখা গ্যালোয়ার গাণিতিক তত্ত্ব।ছবি: সায়েন্স ফর অল
এদিকে ভোর ঘনিয়ে আসছে, উৎকণ্ঠায় কাজ এগোচ্ছেনা, বারবার মনে আসছে ভালোবাসার মেয়েটির মুখ - সব মিলিয়ে খাতা ভর্তি এখানে ওখানে মেয়েটির নাম, কাটাকুটি, আর তারই ভেতর গ্যালোয়া লিখে ফেললেন বিশ বছরের জীবনে আবিষ্কৃত সব তত্ত্ব। সেগুলো এতোই সংক্ষিপ্ত করে লেখেন যে অনেক বড় বড় গণিতবিদদেরও সেসব তত্ত্বের অর্থ উদঘাটন করতে দীর্ঘদিন লেগে যায়। সব লেখার পর এক বিশ্বস্ত ও ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে লেখাগুলো চিঠি হিসেবে পাঠিয়ে ইউরোপের সব গণিতবিদদের কাছে পাঠিয়ে দিতে বলেন।
আঁকা ছবিতে পেশ্চু ও গ্যালোয়ার ডুয়েল।ছবি:এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা
যথারীতি পরদিন, ৩১ মে ১৮৩২, সকালের ডুয়েলে পেশ্চুর বুলেটে প্রাণ হারালেন গ্যালোয়া। তার লেখাগুলো বন্ধুর সাহায্যে ইউরোপের বড় বড় গণিতজ্ঞদের কাছে গেলেও এলোমেলো কাটাকুটি লেখার মর্মোদ্ধার করতে আগ্রহীও হননি কেউ। এর প্রায় ১০ বছর পর জোসেফ লিউভিলের কাছে চিঠিগুলো পৌঁছালে তিনি সেগুলোর অর্থ উদ্ধার করতে সক্ষম হন এবং পৃথিবীবাসী জানতে পারে গ্যালোয়ার কাজ সম্পর্কে।

বুর্গ লা রেইনের সমাধিক্ষেত্র, যেখানে শায়িত আছেন গ্যালোয়া/ছবি: উইকিপিডিয়া
লিউভিলের জন্যেই প্রথমবারের মতো সবাই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সম্মান জানালো এই তরুণ গণিতজ্ঞকে। স্বীকৃতি মিললো ঠিকই, কিন্তু একটু দেরী হওয়াতে দেখে যাওয়া হলো না গ্যালোয়ার। তবু অনাগত প্রজন্ম থেকে শুরু করে সবার কাছেই গ্যালোয়া থেকে যাবেন তার জীবনের শেষ রাতের কাজের জন্য, রয়ে যাবেন চির অমর হয়ে।
সিরাজুল আরিফিন বর্তমানে ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে কম্পিউটার সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত।
sherajularifin@iut-dhaka.edu