স্ত্রীকে হত্যা করে তার দেহ-বিচ্ছিন্নি মাথা হাতে পুরো এলাকা ঘুরে বেড়ায় তার স্বামী। এমন ভয়াবহ দৃশ্যের কথা চিন্তা করতে গিয়ে আপনি বা আমি শিউরে উঠলেও, ঘটনার পুরোটা সময় জুড়ে এই ঘটনার মূল হোতার চেহারায় ছিলো গর্বের হাসি।
২০২২ সালের ৫ই ফেব্রুয়ারী ইরানের আহভাজ নগরীতে ঘটে যাওয়া এই ভয়ংকর ঘটনা পুরো বিশ্ববাসীকে আতঙ্কিত করে তোলে।
একজন নারীর প্রতি সহিংসতা ও নৃশংসতার মাত্রা কোথায় গিয়ে ঠেকেছে সেটি নিয়ে আবার ভাবতে বাধ্য করে।
নাম মোনা হায়দারি, বয়স ১৭ বছর। থাকতেন ইরানের আহভাজ নগরীতে। মাত্র ১২ বছর বয়সে পারিবারের চাপে বিয়ে হয় চাচাতো ভাই সাজ্জাদ হায়দারির সাথে, যার মাধ্যমে মোনার জীবনের কালো অধ্যায়ের সূচনা ঘটে।
কিন্তু তখন কি তিনি ধারণা করেছিলেন যে স্বামীর হাতেই একদিন প্রাণনাশ হবে তার? হয়তো ইরান থেকে তুর্কিস্তানে পালিয়ে যাওয়া এবং সেখান থেকে পরিবারের চাপে ফিরে আসার আগ মুহুর্ত পর্যন্তও নিজের এমন করুণ পরিণতির কথা চিন্তা করেননি মোনা।
নিজের পরিবারের কাছে অসংখ্যবার স্বামীর নির্যাতনের বিষয়টি জানিয়েছেন মোনা, করতে চেয়েছেন বিবাহবিচ্ছেদ। কিন্তু প্রতিবারই তার একমাত্র সন্তানের স্বার্থে স্বামীর সাথে মানিয়ে নেয়ার জন্য রাজি করিয়ে তাকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। শেষ পর্যন্ত অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে ২০২১ সালে ৩ বছরের ছেলে সন্তানকে রেখে তুর্কিস্তান পালিয়ে যান তিনি। কিন্তু বিধিবাম, শেষ রক্ষা হয়নি মোনা হায়দারীর। ৬ মাস পরে তুর্কি দূতাবাসের সাহায্য নিয়ে তার বাবা ও চাচা তাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন। এরপরই ঘটে যায় এই মর্মান্তিক ঘটনা।
সাজ্জাদ হায়দারী তার ভাইকে সাথে নিয়ে মোনাকে খুন করে। স্ত্রী হত্যা পরবর্তী ঘটনা মুহুর্তের মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে যায়। সেদিনই সাজ্জাদ এবং তার ভাইকে হত্যার দায়ে গ্রেফতার করা হয়।
তবে এতো কিছুর পরেও ইরানীয় আইন সাজ্জাদকেই পরিবারের নায়ক হিসেবে বিবেচনা করছে এবং অপরাধী হিসেবে দায়ী করছে নিহত মোনা হায়দারিকে। কারণ মোনা সাজ্জাদকে ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে তাকে ধোঁকা দিয়েছে। যা সাজ্জাদ ও তার পরিবারের জন্য অসম্মান বয়ে এনেছে। নিজের জীবন দিয়ে সেটির মূল্য দিয়েছেন মোনা যা 'অনার কিলিং বা সম্মান রক্ষার্থে হত্যা' নামে পরিচিত।
পরিবারের জন্য অসম্মান বয়ে আনার অভিযোগে যখন কোনো মেয়ে বা নারী সেই পরিবারের পুরুষ সদস্য দ্বারা হত্যার স্বীকার হয় তখন সেটিকে অনার কিলিং বলা হয়।
মোটকথা, অনার কিলিং হল কাউকে নিজের পরিবার বা গোত্রের সম্মানহানির দায়ে ঐ পরিবার বা গোত্রের অপর ব্যক্তি কর্তৃক হত্যা করা। যার মাধ্যমে এই সম্মানহানির উপযুক্ত প্রতিকার হয়েছে বলে মনে করা হয়।
অনার কিলিং এর প্রধান শিকার হন নারীরা। এর নজির পুরো বিশ্ব জুড়েই দেখা যায়। তবে মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ এশিয়াতে অনার কিলিং এর ঘটনা প্রবল।
এবার চোখ ফেরোনো যাক দক্ষিণ এশিয়ার দিকে। মডেলিং, অভিনয় এবং ক্যারিয়ার সচেতনতাই কাল হয়ে দাঁড়ায় পাকিস্তানের জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়াকর্মী কানদিল বেলুচের জীবনে।
২০১৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারী তার ভাই ওয়াসিম আজিম তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেন। কানদিল বেলুচ হত্যাকান্ডকে পাকিস্তানের সবচেয়ে হাই প্রোফাইল অনার কিলিং ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ইন্টারনেটে ছবি আপলোড করা নিয়ে প্রায়ই কানদিলের ভাই তাকে হত্যার হুমকি দিতো। উল্লেখ্য, কানদিল তাদের পরিবারের জন্য অসম্মান বয়ে আনছে এই অভিযোগে আসলাম তাঁর ভাই ওয়াসিমকে বোনকে হত্যায় প্ররোচণা দিতেন। সেই বছর ঈদ উপলক্ষে কানদিল নিজ শহর মুলতানে গেলে এই ঘটনা ঘটে।
২০১৬ সালে কানদিলের বাবা আজিমের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করলেও, রায় শোনাতে কোর্ট সময় নেয় তিন বছর। ২০১৯ সালে ওয়াসিম আজিমকে যাবতজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। কিন্তু চলতি বছর পিতা - মাতার ক্ষমার ভিত্তিতে তাকে সাজা থেকে মুক্ত করে দেয়।
২০০৪ সালে আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপের কারণে অনার কিলিং এর জন্য সাজার পরিমাণ বৃদ্ধি করা হলেও চলমান পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। বরঞ্চ সাজাপ্রাপ্তির কিছুদিন পরেই অপরাধীদের মুক্ত করে দিতে দেখা যায়।
ব্যতিক্রম নয় ভারতের অবস্থাও। ২০১৪ সালে স্বামীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদ হওয়ার অনেক বছর পর ২০২০ সালে নতুন এক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন উত্তর প্রদেশের এক নারী। বিচ্ছেদের এতো বছর পর হয়তো জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু নিজের পরিবারই কাল হয়ে দাঁড়ালো সাইমা বানুর (৩৫) জীবনে।
সেবছর জুনের ২২ তারিখ রক্তাক্ত অবস্থায় নিজ বাসা থেকে উদ্ধার করা হয় সাইমাকে। এ ঘটনায় তার পিতা এবং চাচাতো ভাইকে গ্রেফতার করে পুলিশ। হত্যার কারণ হিসেবে তারা জানায়, সায়মা পরপুরুষের সাথে একটি অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে তাদের পরিবারের জন্য অসম্মান বয়ে আনছিলো। এই মানহানীর প্রতিকার হিসেবে তারা সম্মান রক্ষার্থে হত্যার পথ বেছে নেন।
দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে ভারতে অনার কিলিং এর সবচেয়ে বেশি ঘটে। ভারতের উত্তর প্রদেশে অনার কিলিং রেকর্ড সবচেয়ে বেশি মাত্রায় দেখা যায়। ২০১৬ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী সে বছর ভারতে ১৯২ টি সম্মান রক্ষার্থে হত্যার মামলা দাখিল করা হয়, যার মধ্যে ১৩১ টি ঘটনা ছিল উত্তর প্রদেশের।
ফারজানা জামান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে অধ্যয়নরত।
farjanazaman305@gmail.com