‘হেলা’: কৃষ্ণাঙ্গ নারীর অমর দেহ কোষরাজি এবং একটি মামলা
সৈয়দ মূসা রেজা | Friday, 8 October 2021
একজন মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ নারীর শরীর থেকে বিনা অনুমতিতে কেটে আনা কোষরাজি বিক্রি করার দায়ে মামলায় পড়েছে দেশটির জৈবপ্রযুক্তি কোম্পানি থার্মো ফিশার সায়েন্টিফিক ইনকর্পোরেটেড। ১৯৫১ সালে ক্যান্সার আক্রান্ত নারী হেনরিয়েটা ল্যাকস নামের এ নারীর দেহ-কোষরাজি হাতিয়ে নিয়েছিলেন জনস হপকিন্স হাসপাতালের চিকিৎসকরা। ক্যান্সার আক্রান্ত হেনরিয়েটার টিউমার থেকে এ কোষরাজি কেটে আনার জন্য কোনো অনুমতি নেওয়ার ধার ধারেনি জনস হপকিন্স। সে সময় প্রচলিত “বর্ণবাদী অন্যায্য চিকিৎসা ব্যবস্থার” আওতায় এ কোষরাজি যোগাড় করা হয়। গত সোমবার থার্মো ফিশারের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করে হেনরিয়েটা লাকস এস্টেট। অভিযোগে বলা হয়েছে, বিনা অনুমতিতে সংগ্রহ করা হয়েছে জানা সত্ত্বেও এ দেহ কোষরাজির গণ উৎপাদন এবং বিক্রি করছে থার্মো ফিশার।
পাঁচ সন্তানের জননী হেনরিয়েটার টিউমার থেকে কেটে আনা এ সব কোষ ‘হেলা’ কোষরাজি নামে পরিচিত। হেনরিয়েটার ‘হে’এবং ল্যাকসের ‘লা’মিলিয়ে ‘হেলা’ করা হয়। কার শরীর থেকে এ কোষরাজি কেটে আনা হয়েছে সে পরিচয় গোপন করার মতলবেই নামকে কায়দা করে সংক্ষেপ করা হয়েছিল। জনস হপকিন্সের কোষ কলা চাষ বিষয়ক গবেষণা বা টিস্যু কালচার গবেষণা বিভাগের প্রধান জর্জ গাই প্রথম ‘হেলা’ চাষের তদারকি করেন এবং এর বৃদ্ধি দেখতে পান। ‘হেলা’নামটিও জর্জ গাই দেন বলে ধারণা প্রচলিত আছে।
‘হেলা’কোষরাজি যোগাড়ের ইতিহাস জানে থার্মো ফিশার
বর্তমানকালে বিজ্ঞান এবং চিকিৎসা ক্ষেত্রে কোনো গবেষণা চালাতে গেলে তার সাথে জড়িত রোগীর সম্মতি নেওয়ার বাধ্য-বাধকতা রয়েছে। গবেষণা শুরুর আগেই এ সম্মতি নিতে হয়। কিন্তু ১৯৫১ সালে যখন ‘হেলা’ কোষরাজি সংগ্রহ করা হয় তখন এ রকম কোনো কিছুরই চল ছিল না। হেনরিয়েটার পারিবারিক আইনজীবীরা তাঁদের অভিযোগে বলেন, ‘হেলা’ কোষরাজির উৎপত্তি কি ভাবে হয়েছে সে কথা ভালো ভাবে জানার পরেও এ নিয়ে বাণিজ্যিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে থার্মো ফিশার। মামলায় বলা হয়েছে, ‘হেলা’ কোষরাজি যে হেনরিয়েটা ল্যাকসের শরীর থেকে চুরি করে কেটে নেওয়া হয়েছে সে কথা জানে থার্মো ফিশার। তারপরও মুনাফার জন্য হেনরিয়েটার দেহাংশকে ব্যবহার করছে এই প্রতিষ্ঠান।
বাল্টিমোরের আদালতে দায়ের করা মামলায় বাদীপক্ষ আরো বলেছে, ‘হেলা’ কোষরাজির বাণিজ্যকরণের মাধ্যমে মোট মুনাফাবাবদ প্রাপ্ত সমুদয় অর্থ হেনরিয়টা এস্টেটকে ফেরত দিতে হবে। এ ছাড়া, এই এস্টেটের সম্মতি ছাড়া ‘হেলা’ কোষরাজি ব্যবহার না করার বিষয় আদেশ দেওয়ার জন্য আদালতের প্রতি আহ্বান জানান হয়।
থার্মো ফিশারের ওয়েবসাইট থেকে জানা গেছে যে জৈবপ্রযুক্তির এ কোম্পানির বছরে আয় ৩৫ বিলিয়ন বা সাড়ে তিন হাজার কোটি ডলার। অবশ্য কোম্পানির মুখপাত্র এ মামলা নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি।
কী এমন বৈশিষ্ঠ রয়েছে ‘হেলা’ কোষরাজিতে? হ্যাঁ ‘হেলা’ কোষরাজির রয়েছে বিশেষ গুণ। হেনরিয়েটা ল্যাকসের শরীরের টিউমার থেকে কেটে আনা কোষরাজিতে রয়েছে একট এইচপিভির (হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস)’এর বিশেষ শক্তিশালী ‘প্রজাতি’ বা স্ট্রেন রয়েছে। এটিই এ সব কোষকে তাদের চিরকাল বেঁচে থাকতে সাহায্য করছে। শরীর থেকে সরিয়ে নেওয়ার পর সাধারণ ভাবে বেশিদিন বাঁচে না কোষরাজি। ‘হেলা’ কোষরাজি গবেষণাগারের পরিবেশে কেবল বেঁচেই থাকে না বরং সংখ্যায়ও বাড়ে। কোষরাজির এমন বিশেষ গুণের সদ্ব্যবহার করে একে গবেষণাগারে চাষ বা কালচার করা যায়। চাষ করা কোষ বেঁচে থাকতে পারে অনির্দিষ্টকাল অবধি। এটিই দেহের বাইরে অমরত্ব অর্জনকারী মানব দেহের প্রথম কোষরাজি। ফলে পৃথিবীর যে কোনো গবেষণাগারে মানব দেহের অভিন্ন কোষরাজি উৎপাদন এবং এ নিয়ে গবেষণা করা বিজ্ঞানীদের জন্য সম্ভব হয়ে ওঠে।
‘হেলা’র কোষরাজির আগে আর কোনো কোষরাজিকেই এ ভাবে বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি। চিকিৎসা বিজ্ঞান সংক্রান্ত দুনিয়ার সব নামকরা গবেষণাগারেই ‘হেলা’ কোষরাজি পাওয়া যাবে। এ সবই মূল ‘হেলা’ থেকে উৎপাদিত। এ সব কোষ নিয়ে গবেষণার কারণেই জরায়ু ক্যান্সারের টিকা বের করা গেছে। জোনাস সাল্ক পোলিও টিকা তৈরি করেন ‘হেলা’ ব্যবহার করে। জিনের মানচিত্র তৈরি, আধুনিক কালের স্টেম সেল বা বুনিয়াদি কোষ নিয়ে চোখ ধাঁধানো গবেষণাসহ অগণিত গবেষণা এবং উদ্ভাবনে এ কোষরাজি সেই ১৯৫১ সাল থেকেই ব্যবহার হয়ে আসছে। মানুষের শরীরে পরমাণু বোমার প্রভাব খতিয়ে দেখতে ব্যবহার হয়েছে ‘হেলা’। মহাকাশে কোষ গবেষণার জন্যও আমেরিকা ও রাশিয়া উভয় দেশই ‘হেলা’-কে পাঠিয়েছে। এ ছাড়া, গুগল বলছে, মানুষের শরীরে করোনা ভাইরাসের তৎপরতা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ গবেষণার হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে ‘হেলা’ কোষরাজি। বেশ পুরানো এক হিসাবে বলা হয়েছে, তখন পর্যন্ত যে পরিমাণ ‘হেলা’ কোষরাজি উৎপাদন করা হয়েছে তার মোট ওজন হবে ৫ কোটি মেট্রিক টন। (মার্কিন সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল বা সিডিসি’র হিসাবে বলা হচ্ছে গড় মার্কিন পূর্ণ বয়সী পুরুষের গড় ওজন ৯০ কেজি। তা হলে এবারে নিজেই অঙ্ক কষে দেখুন তো কতো মানুষের সমান হচ্ছে এই ‘হেলা’ কোষরাজির ওজন!) এ কোষ যদি একটার পর একটা সাজিয়ে রাখা যায় তার দৈর্ঘ্য হবে ৩৫ কোটি ফুটেরও বেশি।
‘হেলা’ কোষরাজির অসাধারণ দিকগুলো তুলে ধরা হয় রেবেকা স্কুলেটের দ্য ইমোরটাল লাইফ অফ হেনরিয়েটা ল্যাকস নামের বইতে। একই নামে একটি চমৎকার চলচ্চিত্রও তৈরি হয়েছে। এতে হেনরিয়েটার মেয়ের ভূমিকায় অভিনয় করে অপরা উইনফ্রে দর্শকমনে ছাপ ফেলতে পেরেছেন।
হেনরিয়েটার মৃত্যুর ঠিক ৭০ বছর পরেই থার্মো ফিশারের নামে মামলা ঠুকে দেওয়া হলো। মামলায় আরো বলা হয়, ১৯৫০’এর দশকে জনস হপকিন্সের একদল শ্বেতাঙ্গ চিকিৎসকের শিকার হয়ে ওঠেন জরায়ু ক্যান্সারে আক্রান্ত কৃষ্ণাঙ্গ নারীরা। অনুমতি তো দূরের কথা, না জানিয়েই রোগীর জরায়ু মুখ থেকে কোষরাজির নমুনা হাতিয়ে নেন তাঁরা। রেবেকা তাঁর বইতে জানান, সে যুগে জনস হপকিন্সের কাছাকাছি কালো মানুষরা ‘নিশি বৈদ্য’ বা ‘নাইট ডাক্তার’ নামে পরিচিত একদল কল্পিত চিকিৎসকের ভয়ে ভীত ছিল। কালো মানুষদের মধ্যে বিশ্বাস ছিল, রাতের আধারে তারা কালোদের ধরে গুম করে ফেলে। তাদেরকে নানা চিকিৎসা গবেষণায় ব্যবহার করে।
হেনরিয়েটা ল্যাকসের বঞ্চনা সে যুগের কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর অভিন্ন এবং দুর্ভাগ্যজনক সংগ্রামের প্রতিনিধিত্ব করছে। কৃষ্ণাঙ্গ মানুষগুলোর এ নির্যাতন চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগণিত বিকাশ ও মুনাফার প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে। কিন্তু সে মানুষগুলোকে কোনো ক্ষতিপূরণ দেওয়া তো দূরের কথা তাদের অবদান পর্যন্ত স্বীকার করার ধার কেউ ধারেনি। কালোদের এমন অমানবিক পর্যায়ে ঠেলে দেওয়ার বিনিময়ে নথিভুক্ত করা হয়েছে বা করা হয়নি এমন অনেক সমীক্ষাই সফল হয়েছে। অথচ সেই কালোদের অবদান মুক্ত কণ্ঠে স্বীকার করতে যেয়ে অনেকেরই জিভ বা কলমকে বোবায় ধরে।

দ্য ইমমোরটাল লাইফ অব হেনরিয়েটা ল্যাকস চলচ্চিত্রে লেখিকা রেবেকা স্কুলটের ভূমিকায় রোজ ব্রায়ার্ন (বামে) এবং হেনরিয়েটার কন্যা ডেবরাহ ল্যাকসের ভূমিকায় অপরা উইনফ্রে - এইচবিও
হেনরিয়েটা এস্টেটের পক্ষ নিয়ে যে আইনজীবী মামলায় নেমেছেন তাঁদেরই একজন হলেন ফ্লোরিডাভিত্তিক নাগরিক অধিকার বিষয়ক আইনজীবী বেন ক্রাম্প। মার্কিন পুলিশদের হাতে নিহত কৃষ্ণাঙ্গ সন্তান ট্রেভন মার্টিন, মাইকেল ব্রাউন, ব্রেওনা টেলর এবং জর্জ ফ্লয়েডের পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করার মধ্য দিয়ে দেশটির জাতীয় অঙ্গনে খ্যাতিমান হয়ে ওঠেন ক্রাম্প। এ সব কালো মানুষের পুলিশের হাতে মৃত্যু এবং সেগুলোকে কেন্দ্র্র করে মার্কিন গণসচেতনতা দেশটিতে পুলিশ ব্যবস্থা সংস্কারের পথ করে দেয়। পাশাপাশি জাতিগত ন্যায় বিচারের ক্ষেত্রে গতি সৃষ্টি করে।
জনস হপকিন্স মেডিসিন জানায়, ২০১০-এ রেবেকার বইটি প্রকাশের পর ল্যাকস পরিবারের সাথে এ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ৫০ বছরের বেশি সময়ের পারস্পরিক সম্পর্ক পর্যালোচনা করা হয়। তারা আরো জানায়, ‘হেলা’কোষরাজি কখনোই তারা বিক্রি করেনি। এ কোষ আবিষ্কার বা বিতরণ করে কোনো মুনাফা অর্জন করেনি। ‘হেলা’ সংক্রান্ত কোনো বিষয়ের স্বত্বও তাদের নেই। তবে এ সংক্রান্ত নৈতিক দায়িত্ব তাদের আছে বলে স্বীকার করে।
জনস হপকিন্স মেডিসিনের ওয়েবসাইটে আরো বলা হয়েছে, হেনরিয়েটা ল্যাকসের পরিবারের জন্য গত কয়েক দশকের বিভিন্ন সময়ে আরো অনেক কিছু করা যেত এবং করা উচিত ছিল।
১৯৫১ সালে হেনরিয়েটা ল্যাকসের শরীর থেকে ক্যান্সার কোষরাজি পুন: উৎপাদনের মাধ্যমে যুগের পর যুগ ধরে চিকিৎসা বিজ্ঞানের নানা শাখাতে ব্যবহার হচ্ছে। নানা গবেষণা এবং উদ্ভাবনের কাজে লাগছে এ সব। আর এ সব কোষকে কেন্দ্র করেই অবশেষে বহু বিলিয়ন ডলারের জৈবপ্রযুক্তি শিল্পের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
[সিবিসি অবলম্বনে]