‘মেয়েরা একা ভ্রমণ করতে পারে না!’ - সুরভীকে দেখুন
মোঃ ইমরান | Monday, 7 February 2022
‘তুমি মেয়ে, একা ভ্রমণ করো না,’ ‘পাহাড়ে ওঠা মেয়েদের জন্য নয়’ - এরকম অনেক কথাই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ১৬ হাজার ফিট উঁচুতে সামিট করেন তিনি। করেছেন র্যাপলিং ও হ্যা্মোকিংয়ের মতো দুঃসাহসী অভিযান। তিনি উদীয়মান ট্রাভেল ব্লগার সুরভী ইয়াসমিন।
সুরভীর সূচনা
“শুরু করি ২০১৬ সালে। আমি তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভ্রমণ দলের সাথে সিলেটে ট্রেকিং করতে বের হই। এভাবেই শুরু আমার ভ্রমণের গল্প,” বলছিলেন গিরি-নন্দিনী সুরভী ইয়াসমিন।
তিনি ঢাকার ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস থেকে পাবলিক রিলেশনে স্নাতক সম্পন্ন করে বর্তমানে থার্ড আই সল্যুইশনস নামে একটি বিজ্ঞাপন এজেন্সিতে কর্মরত আছেন।
সুরভীর দুঃসাহসী যত অভিযান বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া অবস্থাতেই শুরু হয়। বিশেষ করে সিলেটে ট্রেকিং করে এসে তিনি চিন্তা করেন এই ঝুলিতে আরো অভিজ্ঞতা ভরার।
এরপর থেকেই শুরু হয় তার একের পর এক পাহাড়ে ওঠার যাত্রা। কখনো ট্রেকিং, কখনো সামিট জয়, কখনো হ্যামোকিং, আবার কখনো সমুদ্রের ঠান্ডা নোনা জলে পা ভিজিয়ে শান্তির নিশ্বাস নেয়া - অনেক কিছুই তিনি ইতোমধ্যে করেছেন, আরো করবেন আগামীতে।
দুঃসাহসী অভিযান
সুরভির অভিযানগুলোর বিস্তৃতি দেশ ও দেশের বাইরেও। ২০১৬ তে সিলেটে অবস্থিত কালা পাহাড়ের দুর্গম ট্রেইলের মধ্যে দিয়ে তিনি যাত্রা শুরু করেন।

১২০ ফিট উঁচুতে এক্সট্রিম হ্যামোকিংয়ে সুরভী
অভিযান নিয়ে তিনি বলেন, “আমি সিলেটের মোটামুটি সব জায়গায় গিয়েছি। তাছাড়া খুলনা, বান্দরবান ও কক্সবাজার এবং ট্রেকিংয়ের জন্য মিরসরাই ও খৈয়াছড়া গিয়েছি।”
২০১৭ সালের এপ্রিলে ভারতের উত্তরাখণ্ডের ‘হার কি দুন’ জয় করেন এবং ২০১৮ সালে দার্জিলিংয়ের সান্দাকফুতে সামিট সম্পন্ন করেন সুরভী।
“দেশের বাইরে ভারতের দার্জিলিংয়ের সান্দাকফু এবং হিমালয়ের হার কি দুন সামিট সম্পন্ন করেছি। এগুলো প্রত্যেকটাই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দশ হাজার ফুট উপরে।”
হার কি দুনকে ঝুলন্ত উপত্যকা বলা হয়। চারপাশ বরফাচ্ছন্ন পাহাড় দিয়ে ঘেরা আর মধ্যে রয়েছে সবুজের সমারোহ। হার কি দুনের উচ্চতা ১১৭০০ ফুট; অর্থাৎ সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩৫০০ মিটার উপরে।
হিমালয়ের হার কি দুনের পরে ভারত ও নেপালের সীমান্তে সান্দাকফু চূড়ার অবস্থান। এটি পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ চূড়া, যার উচ্চতা ১১৯২২ ফুট।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে র্যাপলিং ও হ্যা্মোকিংয়ের ধারণা নতুন। র্যাপলিং হলো রশির সাহায্যে পাহাড় বেয়ে নিচে নামা। আর অনেক উঁচুতে দুইটি শক্ত অবলম্বনকে দড়ি বা তার দ্বারা যুক্ত করে বসে কিংবা শুয়ে থাকার স্থান তৈরি করাকে হ্যামোকিং বলে।

১১০ ফিট উঁচুতে র্যাপলিং করছেন সুরভী
সুরভীর জানান তিনি ২০১৮ তে চট্টগ্রামে ১১০ ফিট উঁচু থেকে র্যাপলিং করেছিলেন এবং ২০২১ সালে ১২০ ফিট উঁচুতে এক্সট্রিম হ্যামোকিং করেছিলেন।
নারীরা একা ভ্রমণ করতে পারেন না?
ভ্রমণ ও ট্রেকিং শুরু করার পর ভ্লগিংয়ে প্রতি ঝোঁক আসে সুরভীর। ভ্রমণ যাত্রা ভিডিও করার পেছনেও কারণ রয়েছে তার।

“মেয়েদের একা ভ্রমণ নিয়ে বরাবরই পূর্ব ধারণা থাকে যে একা ভ্রমণ মেয়েদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়াও ট্র্যাকিং, পাহাড়ে ওঠা এসব তো আরো পারবে না। আমি মূলত এই ধারণাটিকে ভাঙতে চাই। দেখিয়ে দিতে চাই যে সাবধানতা অবলম্বন করে একা ভ্রমণ করা যায়।”
শুধুই কি এই ধারণা থেকে সুরভীর ট্রাভেল ব্লগিং করা? উত্তর- না। তিনি বলেন, “বাংলাদেশের ভ্রমণ জায়গা গুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, কীভাবে সেখানে যাওয়া যায়, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা কেমন এই সব কিছুই আমার ব্লগের অংশ।”
সতর্কতা- ভ্রমণের আগে ও চলাকালীন
ব্লগ গুলোতে সুরভী তার ভ্রমণের আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন। যাত্রা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সবকিছু তার ব্লগে থাকে যা সুরভীর ব্লগের উদ্দেশ্য।
“কোথাও যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে আমি সে জায়গা সম্পর্কে গবেষণা করা শুরু করি। কীভাবে যাব, কার মাধ্যমে যাব, কোন হোটেলে থাকবো, যাওয়ার রাস্তা কীরকম, কতক্ষণ লাগতে পারে? সব কিছু নিয়ে গবেষণা করি,” নিরাপত্তার সাথে ভ্রমণ করা যায় কিভাবে এই প্রসঙ্গে বলছিলেন সুরভী।

যাত্রা পথে করণীয় সম্পর্কে তিনি বলেন, “সবসময় চেষ্টা করি যেখানে থাকবো তাদের কাছ থেকে গাড়ির চেয়ে নেয়া। গাড়ি চালকদের স্পষ্ট করে বুঝিয়ে দেই যে আমি যেভাবে যেতে চাই ঠিক সেভাবেই যেন আমাকে নিয়ে যাওয়া হয়। এভাবে সমস্যা অনেকটাই কমে যায়।”
"এছাড়া যাত্রাপথে প্রতিনিয়ত হোটেল ম্যানেজারের সাথে যোগাযোগ করতে থাকি যে আমি কখন কোথায় আছি। আমার ব্লগ গুলোতে একাকী ভ্রমণের এই দিক গুলো তুলে ধরি। মেয়েদের একা ভ্রমণের জন্য কক্সবাজার নিরাপদ নয়। তাই আমি কক্সবাজার ব্লগটি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড করি।"
সুরভীর আগামী
অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে সুরভী এতদূর এগিয়েছেন, সামনে আরো এগিয়ে যেতে চান। এই উদ্দেশ্যে পেশাদারি মনোভাব নিয়েই তিনি ব্লগিং শুরু করেছেন।
“ব্লগে ব্যবহার করা ডিভাইসগুলো বেশ ব্যয়বহুল। আমি সবকিছুই নিজস্ব অর্থায়নে করেছি। আমার বর্তমান পেশা ও ছবি আঁকার মাধ্যমে যা আয় করি সেখান থেকেই ব্লগিং করি। মূলত আমার একটি কাজ অপর কাজটিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে।”

সুরভীর পরিকল্পনা কী? তিনি বিশ্বাঙ্গনে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করতে চান, বিশ্ববাসীকে দেখাতে চান দেশের সৌন্দর্য।
“দেশবাসীকে দেখাতে চাই মেয়েরাও একা ভ্রমণ করতে পারে, বলতে চাই পর্যটন কেন্দ্রগুলো পরিস্কার রাখা জরুরি - পরিবেশগতভাবে ও সামাজিকভাবে।”
“পাতাল ফেড়ে নামব নীচে, উঠব আবার আকাশ ফুঁড়ে,
বিশ্ব-জগৎ দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে”
নজরুলের কবিতায় দুঃসাহসী যত অভিযানের আশা ব্যক্ত করা হয়েছে সেসব আশার প্রতিচ্ছবিই যেন সুরভী ইয়াসমিন।
মোঃ ইমরান বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।
mohd.imranasifkhan@gmail.com