‘পরমাণু অস্ত্র বিদায় না করলে ইউক্রেনকে ভয় পেতো রাশিয়া’
সৈয়দ মূসা রেজা | Wednesday, 23 February 2022
"শান্তি যদি চাও, তবে যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও"। কিংবা, "মুখে শান্তির কথা বলো, তবে হাতে মোটা লাঠি রেখো"। এসব কথা জানেন না এমন মানুষ বোধহয় দুনিয়ায় নেই। এরপরও, জানা এবং হাজার হাজার বার শোনা কথা না মেনে পস্তাতে হয় অনেককে। এই যেমন পস্তাচ্ছে, রাশিয়ার হামলার ভয়ে কম্পমান ইউক্রেন। পরমাণু অস্ত্র হাতছাড়া না হলে রাশিয়াকে ভয় পেতে হতো না। হতো না পস্তাতেও। ইউক্রেনের পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত অনেকেই এমন মনোভাব প্রকাশ করেছেন।
‘পরমাণু অস্ত্র বিদায় না করলে ইউক্রেনকে ভয় পেতো রাশিয়া’-এমনই মনে করেন ইউক্রেনের ৪৬তম ক্ষেপণাস্ত্র ডিভিশনের সাবেক কমান্ডার মেজর জেনারেল মাইকোলা ফিলাতোভ। পরমাণু অস্ত্র বিদায় করে দেওয়ার দুঃখ তাঁর একার নয়। গোটা ইউক্রেনবাসীই তাঁর সাথে এমন বেদনায় শরিক হয়েছে বলে মনে করেন তিনি। ইউক্রেনের পরমাণু অস্ত্রের ভাণ্ডার হারানোর ব্যথায় আজ তারা শোকার্ত। বিলেতের সবচেয়ে পুরোনো দৈনিক দ্য টাইমসের অ্যান্থনি লয়েড সম্প্রতি এ নিয়ে বড়সড় এক প্রতিবেদন করেছেন।
এ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাওয়ার পর ইউক্রেনের বরাতে জুটেছিল ৮৬টি ক্ষেপণাস্ত্র সাইলো বা ভূতলস্থ ভাণ্ডার। সোভিয়েতের পরমাণু বোমা বসানো ১৭০০ ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে সাতশ-র বেশি মজুদ ছিল ইউক্রেনের এসব ভাণ্ডারে।
১৯৯৪ সালে যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার সাথে সই করা বুদাপেস্ট চুক্তির আওতায় এসব ক্ষেপণাস্ত্র হস্তান্তর করে বা ধ্বংস করে ইউক্রেন। চুক্তিতে ইউক্রেনের অখণ্ডতার নিশ্চয়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। বলা হয়েছে, আগ্রাসী হামলার মুখে ইউক্রেনকে দেওয়া হবে সুরক্ষার নিশ্চয়তাও। ইউক্রেনের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে সে সময় অনেক বড় বড় বাণী শোনানো হয়। একে, সে সময়ে বিশ্বজুড়ে পরমাণু অস্ত্র মজুদ হ্রাসের ক্ষেত্রে ধরিত্রীর ভবিষ্যৎ আশার আলোকবর্তিকা হিসেবেও ঘোষণা করা হয়।
তাহলে কী শেখায় বুদাপেস্ট চুক্তি?
হ্যাঁ। রুশ হামলার আশঙ্কার মুখে দাঁড়িয়ে সে কথার জবাব দিলেন সাবেক কর্নেল, ৬০ বছর বয়সী গেনাদি। তিনি বলেন, “বুদাপেস্টের চুক্তির শিক্ষা সবার কাছেই এখন পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। আর তা হলো, নিরস্ত্রীকরণ করো না।” পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্র ছোঁড়ার দায়িত্বে নিযুক্ত ছিলেন প্রথম নামে পরিচিত সাবেক এই কর্নেল। তিনি বলেন, ইউক্রেনের ভাণ্ডারে যদি পরমাণু ক্ষেপণাস্ত্রগুলো থাকতো তবে ক্রিমিয়াও আমাদের থাকতো। থাকতো দোনবাস অঞ্চলটিও। তিনি আরো বলেন, “এসব ক্ষেপণাস্ত্র ছিল ইউক্রেনের শক্তি এবং সুরক্ষা। বুদাপেস্ট চুক্তি ইউক্রেনকে হীনবল করে দিয়েছে।”
পরমাণু দায়িত্ব পালনের দিনগুলো
আদেশ পাওয়া মাত্র পরমাণু অস্ত্রের বোতাম টিপে দেওয়ার জন্য সদা প্রস্তুত থাকতেন গেদানিসহ ছয় সদস্যের একটি দল। ১২তলা ভূতল অস্ত্র ভাণ্ডারের শেষ দুই তলায় দায়িত্ব পালনে নিয়োজিত থাকতেন তাঁরা। বোতাম টেপার যন্ত্রটি ভূপৃষ্ঠ থেকে ৪৫ মিটার গভীরে ছিল। পাশাপাশি দু’জন থাকতেন এ দায়িত্বে। আদেশ পাওয়া মাত্রই একযোগে দু’জনকে টিপতে হতো বোতাম। তাদের চেয়ারের সাথে বসানো ছিল ছাইদানি। ধূমপান যেন কাজে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় সেজন্য এ ব্যবস্থা। আরামে সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে বিশ্বকে পরমাণু প্রলয়ে ধ্বংস করার অবকাশ তাদের দেওয়া হয়েছিল।
তৃতীয় আরেকজনও থাকতেন তাঁদের সাথে। তিন মিটার প্রশস্ত ভিন্ন একটি যোগাযোগ প্রকোষ্ঠে নিয়োজিত থাকতেন তিনি। ছয়জনের দল, এছাড়া, অপর তিন ব্যক্তি পাশের এক চিলতে জায়গায় বিশ্রাম নিতেন বা ঘুমাতেন। পর্যায়ক্রমে এ ছয় ব্যক্তিকে কর্তব্য পালনে সদা সতর্ক থাকতে হতো।
দায়িত্ব পালনের সময়ের কথা বলতে যেয়ে গেনাদি বলেন, “সত্যিই কখনো বোতাম টেপার হুকুম পাবো কিনা তা না ভাবার চেষ্টা করতাম। একইসাথে বাইরে, ভূপৃষ্ঠে আমাদের পরিবার-পরিজন রয়েছে; পরমাণু যুদ্ধ বাঁধলে তাদের কী হবে তাও কখনো ভাবতাম না। হুকুম পাওয়া মাত্র বোতাম টিপে দেওয়ার জন্য আমাদের বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।”
বোতাম টেপার আগেই যদি গেনাদিসহ তার সহকর্মীদের মৃত্যু ঘটে যায় তা হলে কী হবে? হ্যাঁ, সে ভাবনাও করা হয়েছিল। অস্ত্র ভাণ্ডারটিতে ‘মৃত-ব্যক্তির-হাত’ হিসেবে পরিচিত একটি স্পর্শক বা সেন্সর বসানো ছিল। এটি তেজস্ক্রিয়তার মাপ রাখতো। পরমাণু হামলার মধ্য দিয়ে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। ওই মাত্রায় কোনো জীবের পক্ষেই টিকে থাকা সম্ভব হয় না। তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা ওই পর্যায়ে গেলে তখন পরমাণু অস্ত্রের বোতাম টেপার জন্য আর গেনাদির দলের ওপর নির্ভর করা হবে না। বরং ‘মৃত-ব্যক্তির-হাত’ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই সে দায়িত্ব পালন করবে। এতে পরমাণু যুদ্ধ অব্যাহত থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা ছিল। কেউ বেঁচে থাকুক আর না থাকুক পরমাণু যুদ্ধ শুরু হলে তা আর বন্ধ হবে না। ‘মৃত-ব্যক্তির-হাত’-টি দেখতে ছিল ব্যাঙের ছাতার মতো। পরমাণু বোমা ফেলার পর অবিকল একই আকৃতির অগ্নিগোলকের সৃষ্টি হয়।

ইউক্রেনের প্রেভোমাইস্কে ২০০১ সালে ধ্বংস করে দেয়া একটি পরমাণু ক্ষেপনাস্ত্র ভাণ্ডার দেখছেন একজন ইউক্রেনীয় সেনা কর্মকর্ত — রয়টার্স ফাইল ছবি
এই অস্ত্র ভাণ্ডারটির ওপরে বসানো ছিল উত্তরমুখো বিশাল এক অ্যান্টেনা। পরমাণু যুদ্ধের পর বাধ্যতামূলকভাবে ৪৫ দিন কাটানোর পরই মাটির তলার কেন্দ্র থেকে বাইরে আসার অনুমতি দেওয়া ছিল। সত্যি যুদ্ধ হলে সে সময়ে বেঁচে থাকা লোকজন বাইরে এসে আদিগন্ত পোড়া ছাই আর বিধ্বস্ত প্রান্তরই কেবল দেখতে পেতো। আরো দেখতে পেতো যে দিক নির্ণয়ের কম্পাসও কাজ করছে না। সে সময়ে এই অ্যান্টেনার অবস্থান থেকে পরমাণু যুদ্ধে মৃত গ্রহটির দিক নির্ণয় করতে পারতো। পরমাণু যুদ্ধ হয়নি তাই এসব আর কাজে লাগেনি।
ইউক্রেন সংকট এবং পরমাণু বিস্তার রোধ
ইউক্রেন সংকটের জেরে পরমাণু বিস্তার রোধের বেলায় ভিন্ন বার্তা বয়ে আনবে বুদাপেস্ট চুক্তি। পরমাণু বিস্তার রোধের তৎপরতার ওপর প্রবলভাবেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এ চুক্তি।
এমনি আশঙ্কা ব্যক্ত করেন পদার্থবিদ এবং পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ বিশেষজ্ঞ এবং ওয়াশিংটনের ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটির প্রতিষ্ঠাতা ডেভিড আলব্রাইট। তিনি বলেন “ইরান এবং উত্তর কোরিয়া ইউক্রেনকে আরেক উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরবে। তারা বলবে, বুদাপেস্ট চুক্তির পরও ইউক্রেনে পরমাণু অস্ত্র পরিত্যাগের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হয়নি।”
পরমাণু অস্ত্র রক্ষণাবেক্ষনের কাজটি সহজ সাধ্য নয়। বুদাপেস্ট চুক্তি না হলেও ইউক্রেন নিজ আওতায় থাকা সোভিয়েতের পরমাণু অস্ত্রকে চালু অবস্থায় রাখতে পারতো কিনা তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন আলব্রাইট। পরমাণু বোমাকে অবিরাম বিশেষ ধরণের তদারকি করতে হয়। এছাড়া, ক্ষেপণাস্ত্র বা রকেট ইঞ্জিনের প্রতি বছর ৫ শতাংশ করে ক্ষয় ঘটে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর হয়তো রুশ পরমাণু প্রকৌশলীদের সহায়তা পেত না ইউক্রেন। সেক্ষেত্রে দেশটির পক্ষে ৫ বা ১০ বছরের বেশি পরমাণু অস্ত্রের ক্ষয় ঠেকানো সম্ভব হতো না বলে মনে করেন আলব্রাইট।
আলব্রাইটের যুক্তিতে কাবু হননি ৪৬তম ক্ষেপণাস্ত্র ডিভিশনের সাবেক কমান্ডার মেজর জেনারেল মাইকোলা ফিলাতোভ। তিনি দাবি করেন, “ইউক্রেনের আওতায় থাকলে এসব ক্ষেপণাস্ত্র এবং বোমাকে আজীবন চালু রাখতে পারতাম।” তিনি আরো বলেন, ইউক্রেনে যে পরিমাণ পরমাণু বোমা ছিল তা দিয়ে আমেরিকাকে চার বারের বেশি ধ্বংস করে দেওয়া যেত।
হুকুম পেলে বোতাম টিপতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা হতো না বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, “হুকুম পেলে আমরা আর মাথা ঘামাতে যেতাম না। হুকুম মানার শিক্ষাই আমাদের দেওয়া হয়েছে। সেজন্য আমরা প্রস্তুতও ছিলাম। মনের গভীরে হয়তো উঁকি দিত এই হুকুম পালনের মানে হলো দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়া, কিন্তু হুকুম পালন করে আমাদের পিতৃভূমিকে রক্ষা করছি সে বিশ্বাস আমাদের থাকতোই।”
তিনি আপেক্ষ করে বলেন, “আমেরিকাকে এককালে যে ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে ঠেকিয়েছি, তা দিয়েই এখন ঠেকানো যেত রাশিয়াকেও।”
[দ্য টাইমস অবলম্বনে]
syed.musareza@gmail.com