৫৭ বছরেও সগৌরবে ঝুনুর মোরগ পোলাও
মাহমুদ নেওয়াজ জয় | Monday, 24 January 2022
পুরান ঢাকা ঘিরে নানা আগ্রহ-কৌতূহলের শেষ নেই মানুষের। তরুণরাই শুধু পুরনোর আগ্রহে নয়, একটু বয়স্ক অনেকেও যেন জড়িয়ে যান এখানের ফেলে আসা স্মৃতি রোমন্থনে।
পুরান ঢাকার অলি-গলি, রাস্তা আর খাবারের দোকানগুলো ঘিরে রয়েছে এমন অনেক জানা-অজানা গল্প। সময়ের পরিক্রমায় অনেক কিছু বদলে গেলেও স্মৃতি আঁকড়ে রয়ে গেছে ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন স্থাপনা, বিশেষত খাবার দোকানগুলো।
কুমার রমেন্দ্র নারায়ণের প্রতিষ্ঠা করা বলধা গার্ডেনের নাম জানা আছে সবারই। বলধা গার্ডেন থেকে স্বামীবাগ হয়ে আরো সামনে সোজা হেঁটে গেলে দয়াগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড। বাসস্ট্যান্ড থেকে ডানদিকে সোজা যেতে থাকলেই পৌঁছনো যায় নারিন্দায়।
ঢাকার সবচেয়ে পুরনো মসজিদ ‘বিনত বিবির মসজিদ’ থেকে হাতের কিছুটা ডানেই চোখে পড়ে নীল একটা সাইনবোর্ড- ‘ঝুনুর পোলাও ঘর।’

সন্ধ্যার দিকে পৌঁছে মোটামুটি ভিড় চোখে পড়বে ছোট ছিমছাম এই খাবারের দোকানটায়। দুই দিক মিলে দশটার মত টেবিল, একেকটায় চারজন বসতে পারবেন।
তাঁদের পোলাওয়ের বিশেষত্ব হলো এখানে আলাদা কোনো ঝোল রোস্ট নেই, একপ্লেট ঝরঝরে সাদা পোলাও (চিনিগুঁড়া চালের), সাথে দুই টুকরো বড় সাইজের দেশি মুরগির মাংস ও একটি সিদ্ধ ডিম পরিবেশন করা হয়।
প্রতিটা টেবিলেই আছে পানিতে ভিজিয়ে রাখা অনেকগুলো কাঁচামরিচ, নিতে পারেন যত ইচ্ছা তত। আর পাবেন তাদের তৈরি করা বোরহানি ও কোল্ড ড্রিংকস।
দোকানের চেহারায় হয়ত নেই আলাদা কোনো বিশেষত্ব, তবে পোলাও রান্নার কায়দাটি নিঃসন্দেহে এই দোকানকে আর দশটা দোকান থেকে আলাদা করেছে।
দেশি মুরগির মাংস প্রথমে সিদ্ধমত করে নেয়া হয়। পোলাওয়ের ক্ষেত্রেও চাল ধুয়ে-পানি ঝরিয়ে- মশলা দিয়ে রান্নার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়। পোলাও মোটামুটি হয়ে এলে মাংস এর সাথে মিশিয়ে নিয়ে পুরোটা হওয়া পর্যন্ত জ্বালে রাখা হয়। এর ফলে খাওয়ার সময় খদ্দেরের মনে হতে পারে যেন কাচ্চি খাওয়া হচ্ছে।
দোকানটির ক্যাশে থাকা মো.শামীম জানান, “প্রতিদিন বেলা দেড়টা থেকে রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত বিক্রি হয় এই পোলাও। প্রতিদিন প্রায় ৩০০-৪০০ মানুষ খান। দুপুরেই সবচেয়ে বেশি ভিড় হয় এখানে।”
দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাবুর্চি নূর উদ্দিন; ঝুনু তার ডাক নাম৷ ১৯৬৫ সালে যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকে আজ প্রায় ৫৭ বছর পরেও ঝুনুর পোলাওয়ের নামডাক কমেনি পুরান ঢাকায়।
এ সময়ের ভেতর নতুন অনেক রেস্টুরেন্ট গড়ে উঠেছে এই এলাকায়। মানুষের কাছেও বেড়েছে বাইরের খাবারের কদর। তবে ঝুনুর পোলাও ঘর এখনো ধরে রেখেছে প্রয়াত ঝুনুর পোলাও বানানোর রীতি, যার কারণে এখনো এটি অন্যান্য মোরগ পোলাওগুলো থেকে আলাদা।
অবশ্য মূল্যবৃদ্ধির ব্যাপারটা এখানেও চোখে পড়ার মতো। বছর দুয়েক আগেও একপ্লেট পোলাওয়ের দাম ছিলো ১২০ টাকা, যা এখন বেড়ে হয়েছে ১৭৫ টাকা।
কারণ হিসেবে শামীম জানালেন, “করোনা পরিস্থিতির পর অনেকদিন ব্যবসা ভালো চলেনি। আবার আমরা তো দেশি মুরগি দিয়ে বানাই, দাম বাড়ছে মুরগির। তাই আমাদেরও সেইভাবে বাড়াতে হয়েছে। তবে এখনো ভালো কাস্টমার পাই আমরা।”
স্বামীবাগ-দয়াগঞ্জ-নারিন্দা এলাকায় যারা যান পুরান ঢাকার স্বাদ নিতে, তাদের অনেকেই একবার হলেও এই মোরগ পোলাওয়ের স্বাদ নিতে ভোলেন না।
মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
mahmudnewaz939@gmail.com