৪০০ বছরের পুরোনো ওয়ারি খ্রিষ্টান কবরস্থানে 'অল সোলস ডে'
মোঃ ইমরান | Wednesday, 3 November 2021
নরম তুলোর মতো আরাম নিয়ে শীতের সূচনা হয় প্রকৃতিতে। নভেম্বরের বিকেলের সাথে মিশে বার্তা দেয় তার আগমনীর। শীতের এই আদুরে রোদ প্রার্থনা হয়ে লেগে থাকে পুরানো-নতুন কবরের গায়ে, পালিত হয় "অল সোলস ডে"।
প্রতিবছর ২ নভেম্বর, পুরো বিশ্ব জুড়ে মৃত ব্যক্তির আত্মার শান্তি কামনার উদ্দেশ্যে খ্রীষ্ট ধর্মের রীতি অনুসারে দিনটি পালন করা হয় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে।
পুরান ঢাকার ওয়ারীতে অবস্থিত, চারশ বছর পুরোনো এই খ্রীষ্টান কবরস্থানে সকাল থেকেই আয়োজন শুরু হয়। বিভিন্ন ধরনের ফুল, মোমবাতি বিক্রির জন্য কবরস্থানের মূল দরজার পাশে বসে দোকান। দুপুরের পর থেকেই দূর-দূরান্ত থেকে নানা বয়সী মানুষের সমাগম হতে থাকে। প্রত্যেকেই আসে তাদের স্বর্গবাসী প্রিয়দের খোঁজ নিতে। ঝুড়ি ভর্তি ফুল ও মোমবাতির সাথে যোগ হয় প্রার্থনা ও অতীতের স্মৃতি, কামনা করা হয় বিদেহী আত্মার শান্তি।
এভাবেই দিনটি পালন করতে প্রতি বছর চলে আসেন জেরম মন্টু গোমেজ। প্রতিবছরের দোসরা নভেম্বর তিনি ও তার স্ত্রী চলে আসেন ওয়ারী খ্রীষ্টান কবরস্থানে শায়িত তাদের প্রিয় ছেলেকে দেখতে। তিনি বলেন, "আমরা এই দিনটি মৃত আত্মাদের শান্তি কামনা করার জন্য পুরো বিশ্ব ব্যাপী এক সাথে পালন করি। এখানে আমার ছেলের কবর আছে। সে মারা যায় ২০১৮ সালে স্ট্রোক করে।
আমার ছেলে একজন কি-বোর্ড শিল্পী ছিল। আইয়ুব বাচ্চু, সোলস- বিভিন্ন ব্যান্ডের হয়ে অনেক গানে কনসার্টে কিবোর্ড বাজিয়েছে সে।
একটি কনসার্টে যাওয়ার আগে হঠাৎ তার শরীর খারাপ হয়। তখন সাথে সাথেই হাসপাতালে ভর্তি করানো হয় তাকে। তারপর, আমি হাসপাতালে পৌঁছিয়ে গিয়েই শুনি সে আর নেই।"
মন্টু গোমেজ বর্তমানে একজন বাবুর্চি; পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন দোহারে।
যেহেতু এই দিনটিতে যীশুর কাছে ফিরে যাওয়া মানুষের শান্তির জন্য পালিত হয় তাই প্রতিবার মন্টু গোমেজ ও তার স্ত্রী, ছেলের স্মরণে এখানে চলে আসেন। বিশেষ দিনটিতে ছেলের সান্নিধ্যে এসে তাদের খুব ভালো লাগে বলে তিনি জানান।
সোলস ডে'তে কবরগুলোকে নতুন করে সাজানো হয়। কেউ ব্যস্ত থাকে হলদে গাঁদা ও লাল গোলাপের চাদরে প্রিয়জনের কবরটি সাজাতে, আবার কেউ একাগ্র মনে মোমবাতি জ্বালিয়ে স্মরণ করে অতীতের মুহূর্তগুলোকে।
অনেকে নিজ হাতে আঁকে পবিত্র ক্রুশের এপিটাফ। পরম স্নেহ আর মমতায় লিখে দেয় যীশুর কাছে ফিরে যাওয়া কারো সন্তান, জীবনসঙ্গী কিংবা বন্ধুদের কথা। অনেকেই এখানে পরিবারের কচি কাঁচা সদস্যদের নিয়ে আসে। পরিচয় করিয়ে দেয় নতুনদের সাথে স্বর্গবাসী আত্মীয়ের কবরগুলোকে। এভাবেই শেখানো হয় বছরের পর বছর ধরে আপনজনের যত্ন নেয়ার শিক্ষা।
সারা বছর বন্ধ থাকা কবরস্থানটিতে এই দিন দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। একদিকে যেমন কোলাহলপূর্ণ মানুষের কণ্ঠ অপরদিকে দেখা যায় কেউ গভীর শান্তিতে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রিয়জনের কবরের দিকে। এরকমই একজন হলে এঞ্জেলা কচি হালদার। তিনি মিরপুরে থাকেন, নিযুক্ত আছেন 'খ্রীষ্টান মিনিস্ট্রি অফ চাইল্ড অ্যান্ড ইয়ুথ' এনজিওর অফিস সেক্রেটারি হিসেবে।
কচি হালদার, প্রতিবছর ওয়ারীতে আসেন তার ভগ্নিপতির কবরটিকে নতুন করে সাজাতে। তিনি বলেন, "আমরা তিন বোন। ইনি (জর্জ সলিল হালদার) হলেন আমার ভগ্নিপতি। আমার বড় ভাইয়ের মতো, আমার পড়াশোনাও করিয়েছেন তিনি। তার মারা যাবার দশ দিন পরেই জন্ম হয় আমার ভাগ্নের। তারপর থেকে অনেক কষ্ট ও সংগ্রাম করেই আমার বোন বেঁচে আছে। প্রতিবছরই এখানে আসি, না আসলে যেন ভালো লাগে না। তাই এখানে আসা হয়, ফুল আর মোমবাতি দিয়ে সাজিয়ে দেই তার শায়িত স্থান। গত বছর আসতে পারি নি করোনার জন্য। আজকে আমি এসেছি, বোন আসতে পারে নি তার অফিস আছে বলে। এবার আসতে না পারলেও স্নেহ ও ভালোবাসা দিয়ে ঠিকই স্মরণ করে যাচ্ছে সে।
তাই, গতকাল রাতে ফুল কিনে দিয়ে গেল আমাকে। আজকে এখন পর্যন্ত সে কয়েকবার ফোন দিয়ে খোঁজ খবর নিচ্ছে যে ঠিক মতো সব করেছি কিনা, কিভাবে সাজিয়েছি, সব কিছু কেমন।"
তিনি আরও বলেন, "আমাদের সবাইকেই ফিরে যেতে হবে একদিন। এতো অহংকার আর বড়াই করার অর্থ নেই কোন। সবাই মিলেমিশে শান্তিতে থাকবো, প্রিয়জনদের যত্ন নিব এটাই আমাদের কামনা। আজকের দিনটি আমরা উৎসর্গ করি তাদের জন্যেই। তাছাড়া প্রতিবছর পরিচিত মানুষের সাথে এই সুযোগে দেখা হয়ে যায়। এখন আমাদের প্রার্থনাই সব কিছু। আমাদের প্রার্থনা গুলো যেন হৃদয়ে ভাষা হয়ে পৌঁছে যায় তার কাছে, এটাই শুধু চাওয়া।"
ঢাকার সবচেয়ে পুরোনো চারশত বছর আগে স্থাপিত কবরস্থানটিতে অনেকগুলো কবরের লেখাই এখন নেই। পর্তুগিজ ও আর্মেনিয়া থেকে আগত ধর্ম জাজক থেকে শুরু করে বণিকসহ তৎকালীন বিভিন্ন মন্ত্রী ও ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অনেকের কবরই রয়েছে এখানে। এদের মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন যে কবরটি পাওয়া যায় তা হলো কলকাতার মন্ত্রী জোসেফ প্যাগেটের যিনি ১৭২৪ সালে ২৬ বছর বয়সে মারা যান।
জোসেফ ছাড়াও বিখ্যাত আর্মেনিয়ান জমিদার ও বণিক নিকোলা পোগজ (১৮৭৬) এবং ওশেনোগ্রাফির জনক জেমস রেনেলের কন্যা জেইন রেনেলের কবর এখানে পাওয়া যায়। আরেকটি করব পাওয়া যায় যেখানে শায়িত আছে শিওয়েন দম্পতি; উইলিয়াম শিওয়েন ও তার স্ত্রী রেবেকা শিওয়েন ; কবরটি ১৭৬৬ সালের।
যত্ন-অযত্নে পড়ে থাকে কবরগুলো। যেগুলো প্রাচীন সেগুলো আছে অস্পষ্ট এপিটাফে ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে। সমসাময়িক কবর গুলো রয়েছে ফুলে ও আলোতে পরম যত্নে, যেখানে কোচি হালদার ও মন্টু গোমেজের মতো মানুষের মায়া, স্নেহ ও ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে প্রতি নভেম্বরের দুইয়ে আমার যেন জীবিত হয়ে ওঠে পবিত্র আত্মারা।
পাখির মতো প্রার্থনা গুলো উড়ে যায় আকাশের পানে, হয়তো দূরে কেউ অপেক্ষা করছে তাদের প্রিয়জনের বার্তা জন্যে।
ঝুরঝুরে মাটির ভবনটিকে আগলে রেখেছে তার সাথে বেড়ে ওঠা প্রবীন বৃক্ষটি। শীতের কোমল রোদ্দুর মমতাময়ী বৃক্ষের শাখা প্রশাখা দ্বারা পরিশোধিত হয়ে পড়ে এপিটাফের লেখার উপর "the dust returns to the earth as it was, and the spirit returns to God who gave it. অর্থাৎ অতঃপর ধুলো পৃথিবীতে ফিরে আসবে যেখানে সে ছিল আর আত্মা ফিরে যাবে ঈশ্বরের নিকটে যিনি এতে জীবন দিয়েছেন।" (Ecclesiastes 12:7, বাইবেল আদি পুস্তক)
মোঃ ইমরান, বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ এবং সাংবাদিকতা বিভাগের মাস্টার্সে অধ্যয়নরত।
mohd.imranasifkhan@gmail.com