logo

স্বেচ্ছাসেবা আসলে নিজেরও সেবা

অদ্রি বর্মন | Sunday, 15 August 2021


“মানুষ মানুষের জন্য/ জীবন জীবনের জন্য/ একটু সহানুভূতি কি/ মানুষ পেতে পারে না?”

ভূপেন হাজারিকার এ গান আরেক কিছুই বলে দেয়। অন্যের দুঃখ-দুর্দশাকে কিছুটা লাঘব করার জন্য যে ব্যক্তিরা নিস্বার্থে এগিয়ে আসে, তারাই হচ্ছে স্বেচ্ছাসেবক আর তারা যে কাজটি করে, সেটিই মূলত স্বেচ্ছাসেবা।

কালে কালে স্বেচ্ছাসেবার বিভিন্ন পরিবর্তন এসেছে। ধারনা করা হয় যে, স্বেচ্ছাসেবক বা ইংরেজি Volunteer শব্দটি এসেছে ১৬০০ সালের দিকে । তখনকার সময়ে স্বেচ্ছাসেবক বলতে বোঝানো হতো, একজন ব্যক্তি স্বেচ্ছায় সামরিক বাহিনীতে যোগদান করাকে। পরবর্তী সময়ে তা ধীরে ধীরে পরিবর্তন হয়ে বর্তমান সময়ের স্বেচ্ছাসেবায় এসে পৌঁছেছে। যার লক্ষ্য হল নিজের স্বার্থ বিবেচনা না করে পরের উপকারে এগিয়ে আশা।

স্বেচ্ছাসেবার মূল উদ্দেশ্য হলো স্বার্থবিহীন সেবা করা। তবে এখানে প্রত্যক্ষ স্বার্থ না থাকলেও পরোক্ষ কিছু ‘স্বার্থ’ ঠিকই আছে। হ্যাঁ, স্বেচ্ছাসেবায় অর্থচাহিদা ব্যক্তি জীবনে থাকে না ঠিক, কিন্তু অন্য অনেক কিছুই আমাদের পূরণ হয়। আর আজকের এ লেখায় আলোচনা হবে স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে প্রাপ্ত আমাদের সেসব উপকার বা সুবিধা নিয়েই।

সিলেট লিডিং ইউনিভার্সিটি কালচারাল ক্লাবের প্রেসিডেন্ট বিশাখ গোস্বামী মনে করিয়ে দেন আত্মতৃপ্তির দিকটি, “মানুষ প্রতিনিয়ত বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত থাকে। আমরা গান-বাজনার মাধ্যমে তাদেরকে কিছুটা সময়ের জন্য বিনোদন দিই, এতে তারা কিছুটা হলেও আনন্দিত হয়। এই খুশিটা যখন আমরা দেখি, তখন আমাদের অনেক মানসিক প্রশান্তি কাজ করে। এর ফলে নিজের ব্যক্তিজীবনে কাজ করার গতি অনেক বেড়ে যায়।

আত্মতৃপ্তির বিষয়টি নিঃসন্দেহে স্বেচ্ছাসেবার একটি অন্যতম প্রধান প্রাপ্তি। মন ভালো থাকলে সবকিছুই আমাদের ভালো লাগে। বিভিন্ন ধরনের কাজ করার উদ্দীপনা পাই, সে কাজ ব্যক্তিগত হোক বা সামাজিক হোক। অন্যান্য কাজের চেয়ে সেবার কাজের মধ্যে আত্মতৃপ্তি বেশি থাকে, যদিও ব্যক্তি বিশেষে এটি ভিন্নও হয়।

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের কাজের দ্বারা একটা বিশাল জনগোষ্ঠী, প্রাণীকূল, পরিবেশ উপকৃত হয়। সেইসাথে এসব কাজের মাধ্যমে নিজের অনেক দক্ষতা অর্জন হয় যা ব্যক্তিজীবন, বিশেষত কর্মজীবনে অনেক কাজে আসে। এমনই একটি হলো যোগাযোগ দক্ষতা। সেবামূলক কাজের জন্য আমরা অনেক ধরনের মানুষের সাথে কথা বলি, অনেক নতুন নতুন উদ্ভূত সমস্যা সমাধানের জন্য দলগতভাবে কাজ করি। এর মাধ্যমে আমাদের যোগাযোগ দক্ষতা বৃদ্ধি পায়।

ইয়ুথ এন্ডিং হাঙ্গার বাংলাদেশ, মৌলভীবাজার জেলা সহ-সমন্বয়কারী শুভজিৎ সিংহ বলেন, “সাংগঠনিক কাজের মাধ্যমে আমরা ধীরে ধীরে শিখতে থাকি, কীভাবে মানুষের সাথে কথা বলতে হয়, যোগাযোগ করতে হয়, বা নেটওয়ার্কিং তৈরি করতে হয়, কোনো কিছু ম্যানেজ করতে হয় ইত্যাদি বিষয়। এতে করে নানা বিষয়ে দক্ষতা বৃদ্ধি পায়, যা পরবর্তী সময়ে আমাদের বাস্তব জীবনে বিভিন্ন ভাবে কাজে লাগে।"

স্বেচ্ছাসেবা এমন একটি দিক যা আমাদের চরিত্র গঠনে সহায়তা করে। বিবেক-বুদ্ধির মাধ্যমে বিচার বিবেচনা করার ক্ষমতা গড়তে সাহায্য করে।

অভিযাত্রী মানবতার কল্যাণে আমরাসংগঠনের সদস্য শতাব্দী চৌধুরী রিয়া বলেন, “মানুষের চরিত্র গঠনের প্রথম ধাপ গড়ে উঠে নিজের পরিবারের শিক্ষার মাধ্যমে। পরবর্তীতে স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের মাধ্যমে অবচেতন প্রক্রিয়ায় নিজের চরিত্র সুন্দর ও সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে।

বর্তমান সময়ে যারা চাকরি জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখছেন, তারা একটা সাধারণ শর্ত খেয়াল করে থাকবেন- ‘অভিজ্ঞতা। শুধু একাডেমিক সার্টিফিকেট থাকলে হবে না, অভিজ্ঞতাও প্রয়োজন। স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজের সাথে জড়িত ব্যক্তিদের এই অভিজ্ঞতা কাজের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। তারা সবসময় নতুন নতুন কাজ করার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে থাকে। প্রতিকূল অবস্থায় নিজে স্থির থেকে কীভাবে কাজ করতে হয়, তা স্বেচ্ছাসেবার মাধ্যমে গড়ে ওঠে। এছাড়া বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেব কাজে স্বীকৃতিপত্র বা সনদও প্রদান করা হয়, যা নিজের অর্জনে অন্য মাত্রা যোগ করে।

স্বপ্ন ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের সদস্য অর্ঘ্য সময় বর্ম্মণ জানান, তিনি আগে ইংরেজিতে কথা বলতে পারতেন, কিন্তু অনেক ভীতি কাজ করত। স্বেচ্ছাসেবার উদ্দেশ্য নিয়ে তিনি উক্ত সংগঠনে যোগ দেন এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত হন। একবার এই সংগঠনের পক্ষ ইন্টারন্যাশনাল সামিটে সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন। এর ফলে তাঁর ভয়ভীতি দূর হয়েছে এবং দায়িত্ববোধ অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। তিনি আরো বলেছেন যে কিছুদিন আগে তাঁর একটি চাকরি হয়েছে, সেখানে এই দক্ষতাগুলো অনেক কাজে এসেছে।

অদ্রি বর্মন বর্তমানে শ্রীমঙ্গল সরকারি কলেজের হিসাববিজ্ঞান বিভাগে সম্মান চতুর্থ বর্ষে অধ্যয়নরত।

audribormon@gmail.com