স্বাস্থ্য সচেতন হোন প্রতিদিনের জীবনে
তানজিম হাসান পাটোয়ারী | Sunday, 29 August 2021
জীবনে সুস্থ ও সুন্দরভাবে বেঁচে থাকার জন্য সুস্থতার কোনো বিকল্প নেই। কারণ একটি সুস্থ দেহেই বাস করে একটি সুন্দর মন। বিভিন্ন কারণেই আমাদের পক্ষে সবসময় সুস্থ থাকা সম্ভব হয় না। তবে একটু চেষ্টা করলেই আমরা বিভিন্ন রোগ থেকে খুব সহজেই মুক্ত থাকতে পারি।
চলুন এই লেখায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া যাক, কীভাবে আমরা প্রাত্যহিক জীবনে বিভিন্ন ধরনের রোগকে প্রতিরোধ করে সুস্থ থাকতে পারি।
দন্ত্য বিভাগ
দন্ত্য বিশেষজ্ঞ ডা. জয়া রায় চৌধুরী প্রথমেই দাঁতের কিছু রোগের কথা বলেন, যার মধ্যে ক্যাভিটি (দাঁতে গর্ত হয়ে যাওয়া), ক্যালকুলাস (দাঁতের গোড়ায় পাথর জমে যাওয়া), আলসার, জিহবা ও এর আশেপাশে টিউমার অন্যতম। তিনি বলেন, দাঁতের রোগগুলোর মধ্যে ক্যাভিটি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, যাকে আমরা ‘দাঁতে পোকা হয়েছে’ বলে থাকি। কিন্তু বস্তুত দাঁতের পোকা বলতে কিছু নেই। এটি আসলে দাঁতে গর্ত হয়ে যাওয়া। তাছাড়া দাঁতে যে আলসার হয়, তা থেকে ওরাল ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পান, জর্দা, বা ধূমপানের কারণে এ ক্যান্সার বেশি হয়ে থাকে।
এসব রোগ হতে আগে থেকে কীভাবে মুক্ত থাকা যায় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “দাঁতের যেকোনো রোগ প্রতিরোধে সবচেয়ে কার্যকরী উপায় হচ্ছে, দিনে দু’বার; অর্থাৎ, রাতে ঘুমানোর আগে এবং সকালে খাবারের পরে দাঁত ব্রাশ করা। এছাড়া প্রতিদিন দুধ ও ডিমসহ ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস সমৃদ্ধ খাবার এবং ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ ফল খেতে হবে। এর পাশাপাশি প্রতি ৬ মাস পরপর দাঁতের চেকআপ করালে যে কোনো রোগ সহজেই ধরা পড়বে। বাদ দিতে হবে অতিরিক্ত গরম বা ঠান্ডা জাতীয় খাবার খাওয়া। এছাড়াও ধূমপান বা তামাক জাতীয় দ্রব্য সেবনের অভ্যাস থাকলে সেটিও বাদ দিতে হবে।”
মেডিসিন বিভাগ
আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে জ্বর, কাশি, সর্দি কিংবা এই ধরনের রোগগুলো এ বিভাগের আওতায় পড়ে। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. রাশেদুল হাসান বলেন, “মেডিসিন বিষয়ক রোগগুলো সাধারণত ধুলোবালি, আবহাওয়ার পরিবর্তন, অতিরিক্ত গরম বা ঠাণ্ডা পরিবেশে থাকা-এসব কারণে হয়ে থাকে। তাছাড়া কারোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো নির্দিষ্ট খাবার বা পরিবেশে এলার্জিজনিত সমস্যা হয়। এর ফলে সর্দি, বা কাশি হতে পারে। তাই এসব রোগ থেকে বাঁচতে অবশ্যই ঘরবাড়ি এবং কাজের পরিবেশ পরিষ্কার রাখতে হবে। পাশাপাশি যদি কোনো নির্দিষ্ট কিছুতে কারো অ্যালার্জিজনিত সমস্যা থাকে তাহলে সেটিও এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতে হবে।”
তাছাড়া সুস্থ থাকার জন্য সবার অবশ্যই নিয়মিত সুষম খাদ্য গ্রহণ ব্যায়াম করার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত।
তিনি আরো বলেন, “কাশিজনিত যে সমস্যাগুলো হয়, তা সাধারণত কোষ ঝিল্লী সংকুচিত হওয়ার কারণে হয়। পাশাপাশি অনেক সময় কফের রং পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। এসব ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।”
চক্ষু বিভাগ
চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. মোমিনুল ইসলাম জানান, “চোখের রোগগুলোর মধ্যে রয়েছে চোখ লাল হয়ে যাওয়া, চুলকানো, চোখে খুশকি হওয়া ইত্যাদি। চোখ লাল হয়ে যাওয়া কিংবা চুলকানিজনিত সমস্যাগুলো সাধারণত অ্যালার্জিজনিত কারণে হয়ে থাকে। তাই এসব ক্ষেত্রে যেসব খাবারে অ্যালার্জি আছে যেমন- বেগুন, গরুর মাংস, হাঁসের মাংস, হাঁসের ডিম ইত্যাদি খাসবারগুলো খাওয়া ত্যাগ করতে হবে।
আবার অনেকের চোখে খুশকি হয়, যার ফলে চোখের পাঁপড়ি ও এর আশেপাশে সাদা রঙের আঁশ কিংবা ঘুম থেকে ওঠার পর চোখ আঠালো হয়ে থাকতে পারে। সেক্ষেত্রে এক ধরণের চোখের শ্যাম্পু আছে, যা গোসলের সময় চোখের পাঁপড়িতে লাগাতে পারেন। এছাড়া রয়েছে একধরনের মলম, যা রাতে ঘুমানোর সময় চোখের পাঁপড়িতে লাগিয়ে ঘুমাতে পারেন। এতে করে চোখের খুশকি থেকে মুক্তি পাবেন। আবার অনেক সময় মাথার খুশকি থেকেও এই ধরনের সমস্যা হতে পারে। তাই নিয়মিত মাথা পরিষ্কার রাখতে হবে।”
চর্ম বিভাগ
মানবদেহের যে অঙ্গটির যত্নের ব্যাপারে সবাই একটু বেশি যত্নশীল থাকে, সেটি হচ্ছে ত্বক। সবাই চায়, নিজের ত্বককে আরো সুন্দর করতে। কিন্তু বিভিন্ন কারনে এই ত্বকের নানারকম সংক্রমণ দেখা যায়, যার মধ্যে ব্রণ বা গুটি ওঠা, চুলকানো, ক্ষত হয়ে যাওয়া অন্যতম।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. আফরোজা জেসমিনের মতে, “ত্বকের যত্নে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকা। কারণ, এতে করে ত্বকের রোগগুলো থেকে সহজে রক্ষা পাওয়া যায়। তাছাড়া কোনো খাবারে যদি আপনাদের অ্যালার্জি থাকে তাহলে অবশ্যই সেটি বর্জন করতে হবে।“
তিনি আরো বলেন, “বাজারে প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের ক্রিম, লোশন বা মলম পাওয়া যায়, যেখানে ঐসব পণ্য ব্যবহারে দ্রুত ফর্সা হওয়ার কথা বলা হয়। কিন্তু এসব পণ্য ব্যবহারে অনেকসময় ত্বকের মারাত্নক ক্ষতি হতে পারে। তাই যে কোনো পণ্য কেনার আগে অবশ্যই সেটির মান সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে তারপর পণ্যটি কিনতে হবে।”
নাক, কান, গলা বিভাগ
নাকের মাংস বেড়ে যাওয়া, গলা বা কানে ব্যথা- এমন সব সমস্যার কথা প্রায়ই শোনা যায়। এ বিষয়ে নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ ডা. মারুফ শাহরিয়ার বলেন, “গলা ফুলে যাওয়া, লাল হয়ে যাওয়া, কিংবা জ্বরের কারণে গলাব্যথা হতে পারে। এর থেকে বাঁচতে কুসুম গরম পানিতে হালকা লবণ দিয়ে গড়গড়া করতে পারেন।
আর, অতিরিক্ত ঠাণ্ডা খাবার খাওয়া বাদ দিতে হবে। কারণ, এর ফলে অনেকসময় টনসিল হতে পারে। আর কানে কটন, পাখির পালক বা এই জাতীয় জিনিস ব্যবহার থেকে বিরত থাকতে হবে। অন্যদিকে নাকের যত্নে ধুলাবালিযুক্ত স্থানে না যাওয়া কিংবা গেলেও মাস্ক পড়ে যাওয়া উচিত।”
সুন্দর ও সাবলীলভাবে বাঁচার জন্য সুস্থ থাকার কোনো বিকল্প নেই। একটু সাবধান থাকলেই আমরা বিভিন্ন রোগ থেকে সহজেই মুক্ত থাকতে পারি। তবে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নিয়ম-কানুন মেনে চলার পরও স্বাস্থ্য বিষয়ক কোনো সমস্যায় পড়লে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে।
তানজিম হাসান পাটোয়ারী চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং ও ইনস্যুরেন্স বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন।
tanjimhasan001@gmail.com