স্পাইডারম্যান নো ওয়ে হোম - মন্দকেও আরেকটি সুযোগ দেয়ার কথা বলে গেল যে সিনেমা
সাদমান ফাকিদ | Thursday, 6 January 2022
একটি শব্দ দিয়ে যদি ‘স্পাইডার-ম্যান: নো ওয়ে হোম’ সিনেমাটিকে বর্ণনা করতে হয় তবে সে শব্দটি হবে ‘কাইন্ডনেস’ বা উদারতা। ভালো-খারাপ, সাফল্য-ব্যর্থতা, সবকিছুর প্রতি শর্তহীন উদারতা।
সিনেমাটি একটি প্রশ্নের উপর ঘুরপাক খায় - "Are things considered as failure worth saving?" সেই প্রশ্নই ঘুরে ফিরে বারবার দর্শকের কাছে আসে। মানুষ যা কিছুকে ব্যর্থ ভাবে সেগুলোকে কি দ্বিতীয় সুযোগ দেয়া যায়?
খারাপ জিনিসকে ভালো বানানো গেলে সেই ভালোটা কি এই পৃথিবীতে থাকার অধিকার রাখে? খারাপ কিছু কি আসলে সহজাতভাবেই খারাপ, নাকি সেই খারাপের পেছনে কোনো গল্প আছে? সে গল্পকে বদলানো গেলে, খারাপকে ভালো বানানো গেলে, সেই ভালোটা কি মানুষের কাছে গ্রহণীয়?
এই থিম মুভির আনাচে কানাচে সর্বত্র লুকানো। গল্পের দিকে তাকালে সিনেমার মূল দ্বন্দ্বটাই এটাকে ঘিরে। ধরা যাক অন্যসব প্যারালাল ইউনিভার্স থেকে অনেক রাগী রাগী শক্তিশালী মানুষ এই ইউনিভার্সে এসে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো শুরু করেছে। তাদেরকে কী পাল্টা আক্রমণ করা হবে? নিজেদের ইউনিভার্সে ফেরত পাঠানো হবে যেখানে তারা ফিরে যাওয়া মাত্রই মৃত্যুমুখে পতিত হবে?
নাকি কেন তারা এত রাগান্বিত তা বোঝার চেষ্টা করে, তাদেরকে উদারভাবে গ্রহণ করে, তাদেরকে বদলানোর চেষ্টা করা হবে?
অধিকাংশই হয়তো প্রথম বিকল্পটিই বেছে নেবে। কেউ খারাপ কিছু করলে হয় বিপরীতে খারাপ কিছু করে তাদেরকে জবাব দেয়া হবে, না হলে "তাতে আমার কী" ভেবে মুখ ফিরিয়ে নেয়া হবে।
অধিকাংশ এরকম ব্লকবাস্টার সিনেমায় এটাকে মোরাল কোনো ডিলেমা হিসেবেই দেখানো হয় না, ভিলেনকে মারতে হবে এটাই স্বাভাবিক।
অথচ এই সিনেমায় এটাকে একটা মোরাল ডিলেমা হিসেবে সামনে নিয়ে আসা হলো। পিটার এই ভাঙাচোড়া মানুষগুলোকে আবার সম্পূর্ণ করার চেষ্টা করবে, তাদের জীবনের যেই দুর্ঘটনা তাদেরকে এরকম ভিলেনের রূপ দিয়েছে সেই দুর্ঘটনাগুলোকে সে উল্টে দিতে চাইবে।
সিনেমার গল্পের উত্তেজনায় এই চিন্তাটা হয়তো দর্শকের চোখ এড়িয়ে যায়। কিন্তু এটা তো আসলে বর্তমানে প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার ক্যাপিটাল পানিশমেন্টের বিপরীত চিন্তা। গতানুগতিক বিচার ব্যবস্থা যেখানে প্রতিশোধ চায়, সেখানে পিটার চাচ্ছে পুনর্বাসন আর নিরাময়।
সিনেমাটিকে আরো গভীরভাবে দেখলে দেখা যাবে সিনেমাটি নিজেই এই কাজটি করার চেষ্টা করছে। আগের স্পাইডার-ম্যান সিরিজগুলোকে ‘স্পাইডার-ম্যান’ চরিত্রের ফিল্ম রাইটসধারী সনি বাতিল হিসেবে ফেলে দিয়েছিলো। সেই অভিনেতা আর ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোকে ব্যর্থ হিসেবে ধরে নিয়ে নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি তৈরি করেছিলো।
এই মুভিতে এসে সেসব বাতিলদের প্রত্যেককেই তো দ্বিতীয় সুযোগ দেয়া হলো, তাদের অপূর্ণতাগুলোকে পূর্ণতায় রূপ দেয়ার চেষ্টা করা হলো।
টোবি ম্যাগুয়ারের পিটার মৃত্যু থেকে বাঁচালো তার বন্ধুর বাবাকে, এন্ড্রু গার্লফিল্ডের পিটার বাঁচালো মিশেলকে – এভাবে আমরা তাদের অতীত ব্যর্থতাগুলোকে শুধরে নিতে দেখলাম।
পুরোনো প্রত্যেকটি চরিত্রকে এখানে অনেক মায়া দিয়ে লেখা হয়েছে, তাদের শক্তির দিকগুলোকেই বের করে এনে দেখানো হয়েছে। কোনো খারাপ কিছু থেকেও ভালোটা বের করে আনার ব্যাপারটা যে কত সুন্দর হতে পারে তা-ই এই সিনেমার থিম।
মুভির মূল গল্পের শুরুটা হয়েছিলো সেই দ্বিতীয় সুযোগ চাওয়া থেকেই। পিটার তার বন্ধুদের কলেজ এডমিশনের জন্য দ্বিতীয় সুযোগ চায়, আর উদার স্টিফেন স্ট্রেঞ্জ সে সুযোগ তৈরি করে দেয়। এই উদারতাই হাতবদল হতে থাকে পুরো সিনেমায়।
সিনেমাজুড়ে দর্শকের আবেগ নিয়ে খেলতে থাকেন পরিচালক। আন্ট মে’র মৃত্যু, পুরোনো স্পাইডারম্যানদের আগমন, ভুল শুধরে নিতে পিটারের নিজেকে বিসর্জনের সিদ্ধন্ত - সবই দর্শককে আবেগতাড়িত করে।
থিম ছেড়ে টেকনিক্যাল দিকে দৃষ্টিপাত করলেও চোখে পড়বে এই সিনেমা তৈরিতে সৃজনশীলতার ছড়াছড়ি। প্রথগত শট আর রিভার্স শটের বাইরে গিয়ে অনেক দৃশ্যই হ্যান্ডহেল্ড ক্যামেরায় একক কন্টিনিউয়াস শটের মতো করে ধারণ করা হয়েছে, যা রোমাঞ্চ তৈরি করতে বেশ কার্যকর ছিলো।
সিনেমাটিতে মিউজিক বেশিরভাগ সময়েই থিয়েট্রিক্যাল ছিলো, তবে সেখানে নতুনত্বের অভাব লক্ষণীয়। অভিনয়ের দিক দিয়ে টম হল্যান্ড, অ্যান্ড্রু গারফিল্ড এবং উইলেম ডেফোর পারফরমেন্স আলাদাভাবে নজর কেড়েছে সবার।
ছবিটি সত্যিকার অর্থেই পুরোপুরি “স্পাইডার-ম্যান” ভক্তদের জন্য তৈরি। এটাকে পুরোপুরি উপভোগ করতে হলে ২০০৩-২০০৭ সময়কালের স্যাম রায়মি পরিচালিত ‘স্পাইডার-ম্যান’ ফিল্ম সিরিজ এবং ২০১২-২০১৪ সময়কালের ‘দ্যা অ্যামেজিং স্পাইডার-ম্যান’ ফিল্ম সিরিজগুলোও দেখে ফেলতে হবে।
সব মিলিয়ে সিনেমাটিকে ১৯৬২ সালে মারভেলের কমিক বুকে জন্ম নেয়া স্পাইডার-ম্যান চরিত্রটির এতদিনের ইতিহাসের একটি উদযাপন হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়, যা বিভিন্ন প্রজন্মের সব স্পাইডার-ম্যান ভক্তদেরই মুগ্ধ করবে।
sadman.fakid69@gmail.com