logo

স্ট্যানিসওয়াফ লেম : ভিন্ন স্বাদের কল্প-বিজ্ঞানের যাদুকর

সৈয়দ মূসা রেজা | Wednesday, 15 September 2021


শতবর্ষ আগে তাঁর জন্ম হয়েছিল। পশ্চিমে তাঁর সমগোত্রীয় অনেক লেখকই বিশ্বব্যাপী পরিচিত ও পাঠক নন্দিত হয়ে উঠলেও তিনি রয়ে গেলেন অনেকটাই আড়ালে। তাঁর কল্প-বিজ্ঞানের (সায়েন্স ফিকশন) স্বাদে ছিল ভিন্নতা। প্রযুক্তির ব্যর্থতা আর মানুষের অস্তিত্বের তুচ্ছতাই হয়েছে তাঁর কাহিনীর মূল অ্যাখান। হয়ত এ কারণেই কল্প-বিজ্ঞান বলয়ের বাইরের বিপুল পাঠক-গোষ্ঠী চিনে নিতে পারেনি তাকে।  শক্তিমান, ভিন্ন ধারার কল্প-বিজ্ঞানের পোলিশ এই লেখকের নাম স্ট্যানিসওয়াফ লেম।

১৯২১ সালের ১২ সেপ্টেম্বর ইউক্রেনের লেভিভ নগরীর একটি ইহুদি পরিবারে জন্ম নেন লেম। তৎকালে, দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে, লেভিভ ছিল পোল্যান্ডেরই অংশ। লেভিভ (Lviv) বা (Lvov) লেভোভ উভয় নামেই এ নগরী পশ্চিমে পরিচয় লাভ করে। ১৯৩৯ সালে লেভিভকে দখল করে নেয় সোভিয়েত বাহিনী। মাত্র দু’বছর বাদে এটি নাৎসি জার্মানির বুটের তলায় চলে যায়। জাল কাগজপত্রের দৌলতেই দখলদার নাৎসি আমলের ধকল উতরাতে পারে তাঁর পরিবার। লেভিভ নগরীকে সোভিয়েত প্রজাতন্ত্র ইউক্রেনের সাথে সংযুক্ত করা হলে তাঁর পরিবার চলে আসে পোল্যান্ডে। বসবাস করতে থাকে চেক প্রজাতন্ত্রের নিকটবর্তী নগরী ক্রাকোতে। লেমেরও বাকি জীবন অতিবাহিত হয় পোল্যান্ডেই।

এ ভাবেই লেমের জীবনে দুটি অধ্যায় রচিত হয়। লেমের জীবনের প্রথম ভাগ কেটেছে হাঙ্গামা, লড়াই আর দখলদার বাহিনীর আওতায়। জীবনের দ্বিতীয় ভাগেরও অধিকাংশ জুড়ে রয়েছে কম্যুনিস্ট শাসন। জীবন অভিজ্ঞায় এমন দুই বিপরীত ধারাবাহিকতাই লেমকে হয়ত মানবজাতি এবং প্রযুক্তির আধিপত্য নিয়ে সংশয়ী করে তোলে। লেমের লেখনীতে প্রযুক্তি কখনোই গগনস্পর্শী উন্নয়নের নিশ্চয়তা হয়ে আসেনি। বরং বিপরীতটাই ঘটতে দেখা গেছে। ১৯৫১ সালে লেমের প্রথম বই ‘দ্য অ্যাস্ট্রোনেটস’ বা ‘নভোচারীরা’ প্রকাশিত হয়। কম্যুনিস্ট বাধা-নিষেধের কাঁচির তলে পড়েছিল তাঁর ‘নভোচারীরা।’ লেখকের মন ও মানসের সংশয়ের রেখাচিত্রের জলছাপ রয়েছে এ বইয়ে।

অন্যদিকে লেমের সমগোত্রীয় লেখকরা আমেরিকায় বিকশিত হয়েছেন প্রযুক্তির উন্নয়ন পর্বের মৌলিক আশাবাদের উর্বর ভূমিতে। তাদের কলমে খৈ ফুটেছে মহাকাশ বিজয়ের জয়জয়কারের পাশাপাশি মহাজাগতিক সাম্রাজ্য বিস্তার, যন্ত্রমানুষ বা রোবটের অগ্রযাত্রা, উন্নয়নের শক্তিতে ধাবিত প্রযুক্তির স্বপ্ন-রাজত্বের বিস্তার এবং মহাবিশ্বজয়ী মানব সভ্যতার বয়ান।

আইজাক আসিমভ, রে ব্র্যাডবারি এবং রবার্ট হেইনলিনের মতো বিশ্বখ্যাত কল্প-বিজ্ঞান লেখকের সাথে এ ভাবে পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে লেমের। এরপরও সত্যি করে বলতে গেলে, স্বীকার করতেই হবে, লেমই হলেন কল্প-বিজ্ঞান জগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লেখক যিনি ইংরেজি ভাষাতে লেখেননি।

লেমের সর্বাধিক বিক্রিত বই হলো ‘সোলারিস।’১৯৬১ সালে প্রথম প্রকাশিত হয় আর এ বইকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে দুটি চলচ্চিত্র। ১৯৭২ সালে আদ্রেই তারাকোভোস্কি তৈরি করেন চমৎকার একটি চলচ্চিত্র। আর দ্বিতীয়টি ২০০২ সাল তৈরি করেন স্টিভেন সোডারবার্গ। ‘সোলারিস’-কে লেখকের কল্প-বিজ্ঞান জগতের বিশ্বদর্শনের প্রতীক হিসেবে মনে করা যেতে পারে। গ্রহান্তরের ‘ন-মানুষের’ সাথে সাক্ষাৎ এবং তাদেরকে বোঝার ক্ষেত্রে মানুষের সীমাবদ্ধতাই তুলে ধরা হয়ে এ বইতে।

সোলারিস বইয়ের প্রচ্ছদ

বইয়ের কাহিনি থেকে আমরা জানতে পারি, সোলারিস নামক গ্রহের কাছাকাছি অবস্থিত মহাকাশ ঘাঁটিতে যান মনোবিদ ক্রিস কেলভিন। সোলারিসকে আবৃত করে রেখেছে জৈব পদার্থের এক মহাসাগর। পরে দেখা গেল এটি চেতনাধারী একটি জীব। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বছরের পর বছর ধরে এর সঙ্গে যোগাযোগ করার এবং তার আচার-আচরণ ব্যাখ্যার ব্যর্থ চেষ্টায় নিমজ্জিত থেকেছেন। মহাকাশ ঘাঁটি থেকে কেলভিন দেখতে পান, ঘাঁটির প্রতি মহাকাশচারীর জন্য একজন করে ‘অতিথি’ আবির্ভূত হচ্ছে। এ সব ‘অতিথি’  আসছে মহাকাশচারীর অতীত জীবন থেকে। এদের কেউ হয়ত মরেও গেছেন বা তখনো জীবিত আছেন। ‘সোলারিস’ নামের জীবিত সত্তার গ্রহের কারণেই এমনটি ঘটছে বলে ব্যাখ্যা করেন কেলভিন। আর মহাকাশ ঘাঁটিতে কেলভিনের ‘অতিথি’ হয়ে আসেন তাঁর মৃত স্ত্রী। যদিও সে অনেক আগেই আত্মহত্যা করেছে।

পশ্চিম কল্প-বিজ্ঞানের জগতে গ্রহ-মানুষরা হয় বন্ধুবৎসল রূপে এসেছে আর না হয় মানবজাতিকে ধ্বংস করার সংহারমূর্তিতে আবির্ভূত হয়েছে। সে তুলনায়, গ্রহ-মানুষের সাথে মানুষের সাক্ষাতকে ভিন্নতর ভাবে উপস্থাপন করেন লেম। এখানে, দুঃখবাদী ও হতাশাজনক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে আসেন তিনি। মানুষকে সীমিত ক্ষমতাবান হিসেবে দেখেন লেম। এ ছাড়া নিজ সংস্কৃতি এবং ভাষার বাধায় সবচেয়ে বেশি জর্জরিতও মানুষ। মানুষ মহাবিশ্বের মুখোমুখি হতে পারবে এবং জীবনের সকল রূপবৈচিত্রকে বিনা প্রশ্নে বা কষ্টে অনুধাবন করতে সক্ষম হবে বলে যে ধারণা করা হয় তাকেও নির্বাসনে দেন লেম। পাল্টা তিনি প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন, যে মানুষ নিজেকেই চিনতে পারল না সে কি করে মহাবিশ্বে জীবনের ভিন্নতর প্রকৃতির রূপকে উপলব্ধি করতে পারবে?

লেম ৩০টির বেশি বই এবং অনেকগুলো নিবন্ধ লিখেছেন। তিনি ছিলেন একজন বহুমুখী লেখক। উপন্যাস, ছোটগল্প, দার্শনিক নিবন্ধ, সাহিত্য সমালোচনা, বেতার নাটক, চিত্রনাট্য, একটি আত্মজীবনীসহ বহু বিজ্ঞানরচনা বের হয়েছে তাঁর কলম থেকে। বিজ্ঞান-কল্প রচনায় সিদ্ধহস্ত ছিলেন এবং এ সব রচনা বহুমুখিতায় ভরপুর ছিল। নিবিড় লিপিকুশলতার মধ্য দিয়ে একাধারে রোমাঞ্চকর বা থ্রিলার, প্রযুক্তির বিশদ বিবরণপূর্ণ বিজ্ঞান নির্ভর কঠিন বিষয়বস্তু সমৃদ্ধ রচনা লেখা, রাজনৈতিক প্রহসন এবং  জীবন ও সমাজের অসুস্থ বিষয়গুলো হাস্যরসের মাধ্যমে পরিবেশন মগ্নতায় আচ্ছন্ন থেকেছেন। তিনি লিখেছেন নিজ ভাষায়, পোলিশে। তবে তাঁর দুই ডজন বই ইংরেজিসহ ৪০টির বেশি ভাষায় অনূদিত হয়েছে।

টাইপরাইটারে লিখছেন লেম

কল্প-বিজ্ঞান দিয়ে কতো সম্পদশালী এবং প্রকারভেদের বৈচিত্র্যের প্রাসাদগুণ সম্পন্ন রচনা তৈরি করা যায় তারই সাক্ষ্য দিচ্ছে লেমের গোটা সৃষ্টিকর্ম। কল্প-বিজ্ঞান লেখক ফিলিপ কে. ডিককে বাদে বাকি মার্কিন লেখকদের অনেকটা হীন চোখে দেখেছেন লেম। মার্কিন লেখকদের সমালোচনা করতে গিয়ে তিনি কঠোর ভাষারই আশ্রয় নেন। তিনি বলেন, "বেশিরভাগ আমেরিকান কল্প-বিজ্ঞান লেখকের বৈজ্ঞানিক অজ্ঞতা তাঁদের রচনার জঘন্য সাহিত্যিক গুণের মতোই অবর্ণনীয়।"

লেম ২০০৬ সালে মারা যান। মৃত্যুর আগেতা বটেই, মৃত্যুর পরও তিনি তুলনামূলক ভাবে আড়ালবাসীই হয়ে রইলেন। অথচ তাঁর সমগোত্রীয় ও সমসাময়িক পশ্চিমের লেখকদের অনেকেই সাংস্কৃতিক প্রতীক হয়ে উঠেছেন। মৃত্যুর পরও তাঁদের কারো কারো রচনার নানা অভিযোজন ঘটেছে। ফলে, তাঁদের জনপ্রিয়তা বা তাদের রচনার অনুগমন বেড়েছে। কিন্তু লেমের ক্ষেত্রে এমনটা এখনো ঘটেনি। এর অন্তর্নিহিত কারণটি হয়ত এই যে, তার রচিত গল্প-গাথায় প্রবল বিস্ফোরণ বা পতনমুখো সাম্রাজ্য এবং আন্তমহাজাগতিক প্রেম কাহিনী শোনানো হয়নি। আরো খারাপ এই যে, সব সময় লাগসই, যুতসই পাঠকের চিত্ত সন্তোষকারী জবাবেরও অবতারণা করেননি তিনি। তিনি বরং মেনে নিয়েছেন, মহাজগতের ওই সীমাহীন তেপান্তরের প্রান্তরে মানুষ তেমন গুরুত্বের দাবিদার নয় বরং এখনো পুরোটাই ঢেকে আছে অজানার অন্ধকারে।

syed.musareza@gmail.com

[হারেৎস অবলম্বনে]