logo

সৌদিতে বিদেশি বিনিয়োগ: সামাজিক দায়ের টানাপড়েন

এফই অনলাইন ডেস্ক | Saturday, 30 October 2021


জিসিসি (বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার, সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আর আমিরাতকে নিয়ে গঠিত উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ)’র শক্তিকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)।   দেশ দুইটির মধ্যে টক-মিষ্টি মিলিয়ে সুস্বাদু সম্পর্কের রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। ২০০৯ সালে জিসিসি কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থা গড়ার তোড়জোড় তলিয়ে যায়। ব্যাংকের কেন্দ্রীয় দফতর আবুধাবিতে নয় বরং রিয়াদে বসানো হবে জানার পর আমিরাত টুপ করে কেটে পড়ে। আর সে পরিকল্পনা তলিয়ে যায় পারস্য উপসাগরে।

আবুধাবির যুবরাজ শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল-নাহিয়ান সৌদি যুবরাজ মুহাম্মদ বিন সালমানের সুহৃদ হিসেবে আবির্ভূত হলে দেশ দুইটির সম্পর্কের পালে আবার জোরাল হাওয়া লাগে। এ সময়ে পিতা রাজা সালমানের উত্তরসূরি হিসেবে যুবরাজ মুহাম্মদের দ্রুত উদয় ঘটতে থাকে। কিন্তু ২০১৮ সালে সৌদি নির্বাসিত ভিন্ন মতাবলম্বী সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে পৈশাচিক পদ্ধতিতে খুন করা হলে দুই দেশের সম্পর্কের পাল থেকে সব হাওয়া বের হয়ে যায়; বরং লাগতে থাকে আবার ভাটার টান। এই হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে বিশ্ব কড়া ভাষায় সৌদি যুবরাজকে নিন্দা ও ধিক্কার দিতে থাকে। বাজে  সংক্রমণের মতো এটি আমিরাতকেও আষ্টেপৃষ্ঠে চেপে ধরতে পারে। এমন আশংকা মোটেও চেপে রাখতে পারেননি আমিরাতের নেতারা। ফল? সম্পর্কে নেমে আসে শীতলতা।

২০১৯-এ ইয়েমেনের চলমান যুদ্ধ থেকে আমিরাত নিজ সেনাদের সরিয়ে আনলে আরেকবার ক্ষুব্ধ হয় রিয়াদ। ২০১৫ সালের ২৬ মার্চ থেকে ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুদিদের বিরুদ্ধে সৌদি নেতৃত্বাধীন আরব জোট সর্বশক্তি দিয়ে যুদ্ধ করে চলেছে। আমিরাত এ জোট থেকে নিজ সেনাদের সরিয়ে আনে। অতি সম্প্রতি ওপেকের তেল উৎপাদনের বরাদ্দ নিয়ে দেশ দুইটির মধ্যে আরেক দফা ঘটে গেছে টানাপড়েন।

পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, যুবরাজ ইরানের এবং ইসলামপন্থীদের হুমকির মতো মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে অভিন্ন মত প্রকাশ করেন। তবে দুই দেশের সম্পর্কের বেলায় সৌদি আরব কনিষ্ঠ ভূমিকায় থাকবে তা মেনে নেন না তিনি।

রিয়াদের কর্তারা জোর গলায় দাবি করেন, তাদের মোটেও আমিরাতকে লক্ষবস্তু বানানোর বা আমিরাতকে খাটো করার ইচ্ছা নেই বরং তারা নিজ দেশের লক্ষ্য অর্জনে সকাল-সন্ধ্যা খেটে চলেছে।

সৌদি এক কর্তা বলেন, “এটা কখনোই সৌদি আরব বনাম আমিরাতের প্রতিযোগিতা নয়। সৌদি আরবের অভিলাষ, দেশটি আরো বহুদূর যাবে এবং দুবাইও সব সময় সেখানে থাকবে।” তিনি ছাদের দিকে হাত তুলে বলেন, “এ অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি ওই পর্যন্ত যাবে এবং সৌদি আরব এই প্রবৃদ্ধির বেশির ভাগ ধারণ করতে চাইছে।” তিনি আরো বলেন, সৌদি আরবের প্রবৃদ্ধি এই গোটা অঞ্চলের প্রবৃদ্ধি এবং সমৃদ্ধিতে পরিণত হবে।

সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের পতাকা

তবে ইচ্ছায় হোক আর ঘটনাক্রমেই হোক চাঁদমারির লক্ষ্যবিন্দু হয়েছে আমিরাতই। গত জুলাইতে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতই সামান্যতম ইঙ্গিত না দিয়েই ধুম করে পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে পণ্য আমদানি আইন বদলে দেয় সৌদি আরব। আগে বছরের পর বছর ধরে যে সব পণ্য শুল্কমুক্ত ছিল এ ঘোষণায় সেগুলোর ওপর ৫ থেকে শুরু করে ১৫ শতাংশ শুল্ক চাপিয়ে দেয় রিয়াদ।

জুলাইয়ে, এ আইন কার্যকর করার প্রথম মাসেই সৌদি আরবে আমিরাতের রপ্তানি কমে যায় এক তৃতীয়াংশ। ২০১৯ সালে দেশ দুইটির মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ২৪ বিলিয়ন ডলার। সৌদি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এতে সৌদি খাতে ২.৮ বিলিয়ন ডলার উদ্বৃত্ত হয়। আমিরাতের উপাত্তে বলা হয়, ওই বছর পুনঃরপ্তনিসহ মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ৩০ বিলিয়ন। আর আমিরাতের উদ্বৃদ্ধ হলো ১৭ বিলিয়ন।

বিতর্ক নেই কেবল সৌদি আরবের অর্থনীতির আকার নিয়ে। সৌদি আরবের অর্থনীতির পরিমাণ ৭০০ বিলিয়ন ডলার কিন্তু পাশে নিতান্তই বামন বনে গেছে আমিরাতের ৪২১ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি। অন্যদিকে প্রতিবেশী সৌদি আরবের জনসংখ্যা তিন কোটি ৩০ লাখ যা আমিরাতের তিনগুণ। আমিরাতের জনসংখ্যা এক কোটি হলেও তার ৯০ শতাংশই বহিরাগত বা প্রবাসী জনগোষ্ঠী।

প্রবীণ এক ব্যাংকারের ভাষ্য অনুযায়ী, “ভূখণ্ডের দিক থেকে সৌদি আরব পশ্চিমাঞ্চলীয় ইউরোপের সমান। দেশটির বিশাল দুই উপকূল দিয়ে চলে গেছে বিশ্বের দুই প্রধান নৌপথ। অর্থনৈতিক মানচিত্র যদি কেউ আঁকতে চায় তবে তাকে সবকিছুই দেখাতে হবে রিয়াদে। আমিরাতকে সব সময়ই সৌদি আরবের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে কখনো নিজের নীতি ও প্রকল্প বাস্তবায়ন করেনি। এখন দুই দেশের সম্মিলিত ভাবে কাজের সুযোগ এসেছে। তবে অনেক ক্ষেত্রেই সৌদি আরব বহু আলোকবর্ষ পিছনে পরে আছে- এখন বিষয়টি এসে দাঁড়িয়েছে আমিরাতের ক্ষিপ্রতা বনাম সৌদির অতিকায় তেলবাহী ট্যাংকারের সাথে প্রতিযোগিতার  পর্যায়ে।”

সীমিত চাহিদা

অর্থনীতিকে গোলাবারুদের কাতারে ফেলে হিসাব কষলে  দেখা যাবে বিশ্বের শীর্ষ তেল রপ্তানিকারী দেশ সৌদি আরবের অস্ত্রশক্তিকে যুবরাজ মুহাম্মদ শক্তিশালী করেছেন। সৌদিকে আধুনিক করে গড়ে তোলার মহতী উদ্দেশ্য নিয়ে মহা মহা প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এ সব প্রকল্প খাতে অঢেল অর্থের যোগান দিয়ে চলেছে যুবরাজ। সাড়ে ৪৫০  বিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে গঠন হয়েছে সৌদি স্বতন্ত্র সম্পদ তহবিল পাবলিক ইনভেসমেন্ট ফান্ড। ২০৩০ পর্যন্ত এ তহবিল দেশটির অর্থনৈতিক খাতে প্রতিবছর অন্তত ৪০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার শুনিয়েছে।

না । এতেও খুশি হননি বিশ্লেষকরা। তাঁরা বরং প্রশ্ন তোলেন, যেসব মহা প্রকল্প নিয়ে মেতে উঠেছে সৌদি আরব, এ সব প্রকল্পের তহবিল কি ভাবে যোগাবে দেশটি? সৌদি আরবের আর্থিক বাহুবলই কেবল নতুন নতুন ব্যবসা দেশটিতে টেনে আনার কাজে কী যথেষ্ট হয়ে উঠতে পারবে? এ পর্যন্ত দেখা গেছে, বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগকারীরা যুবরাজের পরিকল্পনার প্রতি সীমিত আগ্রহ দেখিয়েছে। ভিশন ২০৩০ কর্মসূচি সূচনা করেন যুবরাজ ২০১৬ সালে। জাতিসংঘের উপাত্ত থেকে জানা যায়, এ খাতে একই বছর সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে ৭.৪৫ বিলিয়ন ডলার। ২০১৭’তে এ খাত কমেছে, বিনিয়োগকৃত অর্থের পরিমাণ ছিল মাত্র ১.৪২ বিলিয়ন ডলার।

গত বছর এ খাতে ৫.৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ হয়েছে এবং সরকারি কর্তারা বলছেন, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ৪০০ লাইসেন্স দেওয়া হয়েছে। আমিরাতে যে পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ হয়েছে এটি তার চার ভাগের এক ভাগ মাত্র। এ ছাড়া, বিনিয়োগের সর্বশেষ কৌশল হিসেবে অক্টোবরে রিয়াদ এ খাতে ১০০ বিলিয়নের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে।  সরল হিসাবেই দেখা যাচ্ছে  বিনিয়োগের সেই সৌদি লক্ষ্যমাত্রার একশ কোটি ডলারের, প্রবাদ বচনে কথিত, ‘দিল্লিধাম’এর আজও দেখা মেলেনি। বিনা সংশয়েই বলা যায় বহুল উচ্চারিত বাক্য, ‘দেহলি হানুজ দূর আস্ত’(দিল্লি এখনো অনেক দূরে)।

যুবরাজের শাসনামলে সৌদি আরবের আইন-নিয়ন্ত্রণ পরিবেশের অবনতি ঘটেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রবৃদ্ধি কমেছে দেশটির। পাশাপাশি সৌদি আরবের সুনামে কলঙ্কের মোটা কালো দাগ পড়েছে। এ সব বিষয়ের কথাই বলছেন বিশ্লেষকরা। খাসোগি হত্যাকাণ্ড এবং ২০১৭ সালে দেশটির ভেতরে চালানো অভিযানের কথা এ বাবদ তুলে ধরেন তারা। অভিযানের মধ্য দিয়ে শত শত রাজপুত্র এবং ব্যবসায়ীকে আটক করা হয়। তাদের ঠেলে দেওয়া হয় রিৎজ-কার্লটন হোটেলে। গোটা হোটেল হয়ে ওঠে বন্দি ও নির্যাতন শিবির। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সৌদি অংশীদাররাও এই অভিযানের হাত থেকে রেহাই পায়নি। আটক ব্যক্তিরা নিজদের সম্পদ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়ে বন্দিদশার শেষ ঘটিয়ে শ্বাস নিতে পারে মরুর মুক্ত বাতাসে।

তুলনামূলক ভাবে কম পরিচিত ব্যক্তিদের আটকের ধারা চলছে এবং সৌদি কর্তাব্যক্তিদের দাবি, দুর্নীতি বিরোধী অভিযানের অংশই এ তৎপরতা।

সৌদি আরবে বিনিয়োগের প্রসঙ্গে বলতে যেয়ে প্রবীণ এক পরামর্শক  পরিষ্কার ভাবে বলেন, “সৌদি আরবে বিনিয়োগকে কেন্দ্র করে নিজেদের সুখ্যাতি সমালোচনার মুখে পড়ে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগে রয়েছে কোনো কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী। সৌদিতে ব্যবসার যে সুযোগ রয়েছে সে দিকে তাকালে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। কেউ কেউ হয়ত অর্থ উপার্জনের নেশার এমন হাতছানি এড়াতে পারবে না। ব্যবসায় নামবে তারা। এ সত্ত্বেও অনেকে তাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে ভাবছে কিংবা তাদের অংশীদাররা হয়ত এমন বিষয়ে বিস্তর মাথা ঘামাচ্ছেন।”

[ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে বাংলায় রূপান্তর সৈয়দ মূসা রেজা]

 

আরো পড়ুন: অর্থনৈতিক বাহুবল খাটাতে চাইছে সৌদি আরব