সেকালে দাদাবাড়িটা যেমন ছিল
মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম | Monday, 21 March 2022
মা এক কোণে বসে ঘুমন্ত শিশুটাকে হাতপাখায় বাতাস করছেন। লম্বা ঘরের মেঝেতে সারি করে বিছানা পাতা, যে যেভাবে পারে শুয়ে পড়েছে। রাত তখন সবে ন’টা ছাড়ালো; গ্রাম-গঞ্জে একটু আগেই শুয়ে পড়ে কিনা মানুষ।
কিন্তু বড়দের চোখে ঘুম নামে না। শিশুর বাবা আর দাদা তখন এ মৌসুমে চাষাবাদে কোন গ্রামের কী অবস্থা তা নিয়ে আলাপ তুলেছেন। তাতে যোগ দিলেন শিশুর চাচা আর ফুপুরাও।
ঘুমন্ত শিশুটির স্বপ্ন পাড়ি জমায় দূর আকাশের চাঁদের দেশে। ওদিকে নীরব নিথর অন্ধকার গ্রামখানির এই ঘরটিতে হারিকেনের আলোয় জমে পৌরাণিক গল্পের আসর।
“তখনো তোমাদের জন্মই হয়নি, এই গ্রাম ছিল ঘন জঙ্গলে ভরা যেখানে বাঘের বসতি ছিল। জীবন তখন রোমাঞ্চকর ছিল,” বলে চলেন ঘরের সবচেয়ে বয়োঃবৃদ্ধ মানুষটি (শিশুটির দাদা)।
গল্পের সাথে বেড়ে চলে রাত, চাঁদ গিয়ে লুকোয় বাশবাগের আড়ালে। এই রাত জহির রায়হানের উপন্যাসের রাত, আবহমান গ্রামবাংলার হাজার বছরের পুরনো রাত।
ধুলো জমে যাওয়া স্মৃতির পাতা ঘেটে নিজের দাদাবাড়ির এরূপ চিত্রই এঁকেছেন এই লেখক। নিশ্চিত করেই বলা যায়, এ চিত্র সবারই, অন্তত ‘৯০’র দশকের কিংবা তার পূর্বেকার শিশুদের তো বটেই। বছরে দুই ইদে দাদাবাড়ি বেড়াতে যাবার চেয়ে বড় আনন্দ ঐ প্রজন্মের শিশুদের আর কী ছিল?
কল্পকাহিনীর গল্প আসর
সারাদিন ধুলায় মাখামাখি হয়ে খেলা শেষে সন্ধ্যায় বড় ঘরে চাটাই বিছিয়ে গল্পের আসর জমানোই ছিল সবচেয়ে আকাঙ্ক্ষিত সময়। এ আসরে দাদার মুখে শোনা যেত কেমন ঝোপঝাড়ে ভরপুর ছিল গ্রামখানি, কয়েক দশক আগে; ভরদুপুরেও কোনো এক রাস্তা ধরে একা হেঁটে যেতে পারতো না কেউ শিয়ালের ভয়ে।
দাদী গল্প করতেন মধ্যরাতে ঘরের চালায় গাছের পাতা পড়ার শব্দেও কেমন ভৌতিক আবহ তৈরি হতো তা নিয়ে। তখন সন্ধ্যা নামতেই গ্রামখানি ছমছমে অন্ধকারে ডুবে যেত; তখনো সেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছুতে যে বহু বাকি।
শোনা যেত গ্রীষ্মের দাবদাহে গ্রামের নদীতে গিয়ে প্রশান্তির অবগাহনের গল্প। কিংবা ভরা পূর্ণিমায় বর্ষার বানে ডুবে থাকা চাষের জমির উপর ডিঙি নিয়ে ঘুরে বেড়ানো, শাপলা-শালুক সংগ্রহ আর মাছ ধরার কেচ্ছা-কাহিনী।
“তখন গ্রামের প্রায় শতভাগ ঘরই একই কায়দায় বানানো হতো। চৌচালা ঘরগুলোয় একটি বড় ঘর (প্রধান ঘর) এবং একটি রসুইঘর। যাদের বেশি জায়গা ছিল তাদের ঘরে হয়তো একটি বারান্দা দেখা যেত যাতে থাকতো ছোট দুটি ঘর।”
“আমাদের বড় ঘরের একপাশে একটি ৩ জন শোবার মতো বিছানা ছিল। কিন্তু রাত্রি হলে মেঝেতে বিছানো চাটাইয়ে শোবার জন্য এক দফা ঝগড়া হয়ে যেত,” হাসতে হাসতে বলে চলেন কবির, “সবাই মেঝেতে বিছানো ‘শক্ত’ শীতল পাটিতেই শোবার গো ধরতাম। কোনো কোনোদিন আস্ত বিছানাখানিই ফাঁকা থেকে যেত।”
হুমায়ূন কবির এখন পেশায় ব্যবসায়ী, ঢাকার সাভারের বাসিন্দা। দাদাবাড়িতে বেড়ানোর স্মৃতি জিজ্ঞেস করতেই অনর্গল বলে গেলেন তার গ্রাম, নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার এক ছোট্ট চরের গল্প।
“ভূত-প্রেতের গল্পে ছিল সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ। বাবা খুব একটা সায় না দিলেও চাচা-ফুপুরা জুড়ে দিতেন কোন বাড়ির কাকে জিনে ধরেছে আর কাকে পরী এসে তুলে নিয়ে গিয়েছে সেসব গল্প।”
সেসব গল্প শুনতে শুনতে ঘোর লাগতো কবিরের বা তার মতো ঢাকা থেকে গ্রামে বেড়াতে যাওয়া হাজারো শিশুর। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে ক্রমশ হারাতে থাকা কবির শেষপর্যন্ত মায়ের হাত না ধরে ঘুমনোর পূর্বে শৌচালয়ে যেতেও ভয় পেত।
মাটির চুলায় পিঠা আর শিশুদের পিঠা বানানোর আয়োজন
চলতি শতকের প্রথম দশকেও নিজগ্রামের অধিকাংশ বাড়ির রান্নাঘরখানি মূল ঘর থেকে আলাদা দেখা যেত, তাতে ছিল মাটির চুলা। পিঠাপুলির মৌসুমে এই রান্নাঘর হয়ে উঠতো জীবন্ত এক বায়োস্কোপ, যেখানে মা, বোন, দাদী, ফুপু আর খালাদের যাপিত জীবনের ছবি রিলে আকারে চলতো, দর্শক হিসেবে ঘিরে বসে থাকতো বাড়ির শিশুরা, তাদের হাতে চুলা থেকে ওঠানো গরম ধোঁয়া ওঠা ভাপা পিঠা।
এরকম পিঠার আসরে থাকার সৌভাগ্য হয়েছে নিশি আক্তারের। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করা নিশির গ্রামের বাড়িতে মূল ঘর থেকে ‘আলগা’ রান্নাঘরটি এখন আর নেই। টিনের ঘরের স্থলে উঠেছে পাকা ঘর, রান্নাঘরটি তারই অবিচ্ছিন্ন অংশ। এই নিয়ে মন খারাপ করা উচিৎ নাকি খুশি হওয়া উচিৎ, ঠিক করতে পারেন না তিনি।
“শীতকালে যখন ইদ হতো, তখন গ্রামে গেলে প্রত্যেক সন্ধ্যায় অঘোষিত একটি উৎসব জমতো রান্নাঘরে - পিঠা উৎসব। মা-ফুপু-চাচিরা একেক সন্ধ্যায় একেক রকম পিঠা বানাতে বসতেন, আমরা সব ভাইবোন পিড়ি পেতে বসে তাদের রান্না দেখতাম। আমাদের কিচিরমিচির শব্দে পুরো বাড়িটাই উৎসবমুখর হয়ে উঠতো।”
নিশির সাথে আলাপচারিতায় যোগ দিলেন নিশির মা নাজনিন বেগম। বাড়ির শিশুদের মিলনমেলা তাকে যারপরনাই আনন্দিত করতো।
“ওরা (নিজের শিশুদের ইঙ্গিত করে) ভীষণ দুষ্টু ছিল। চুপচাপ বসে পিঠা বানানো না দেখে নিজেরাও বানাতে চাইতো। সেই বানানো নিয়ে কত কসরত! ওদের জন্য বানানোর ব্যবস্থা করা আমাদের (তিনি এবং বাড়ির অন্যান্য নারীরা) জন্য ছিল আরেক এলাহি কান্ড।”
“ওরা কিম্ভূতকিমাকার পিঠা বানিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতো এবং নিজেদের বানানো পিঠাগুলো আগে প্রস্তুত (সেদ্ধ/ভাজা) করার জন্য গোল বাধিয়ে দিত। মাঝে এতোগুলো ময়দা (ও অন্যান্য পিঠার উপকরণ) নষ্ট করতো।”
বলতে বলতে হাসছিলেন নাজনিন বেগম। ঐ অপচয়টুকুতে তার কোনো আপত্তি থাকবার কথা যে নয়, তা তো অনুমেয়ই। তবে নিশির যুক্তি অন্যত্র।
“খুব সুন্দর করে বানানো পিঠা কিংবা ‘বেকা-তেরা’ পিঠা, দুটোই তো পেটেই যাচ্ছে। বানাতে পরলেই তো হলো,” ঠোঁট বাঁকিয়ে ভেংচি কাটলেন নিশি।
তখন বাড়িতে উঠান ছিল, উঠানে ছিল ‘বৈঠক’
নিশিদের আঙিনা থেকে বেরিয়ে লেখক গিয়েছিলেন তাহমিনা আক্তারের গ্রামে। এক সন্তানের মা তাহমিনা বিয়েসূত্রে এখন নরসিংদীর এক ছোট্ট চর গ্রামের বাসিন্দা, যদিও তিনি বেড়ে উঠেছেন ঢাকার নারায়ণগঞ্জে। বর্তমানে গ্রামের একটি কিন্ডারগার্টেন স্কুলে শিক্ষকতা করেন তিনি।
তাহমিনার স্মৃতির মানসপটে ইদের ছুটিতে গ্রামে আসার দিনগুলো এখনো তরতাজা। তাতে বিশেষ স্থান দখল করে আছে ‘বৈঠক’গুলো।
“ইদের ছুটিতে গ্রামের প্রতিটি বাড়ির ছেলেমেয়েদের একসাথে পাওয়া যেত, যারা এখন ঢাকায় বা দেশের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছেন। তাই ইদের পরদিনই সব বাড়ির মুরুব্বী আর তাদের ছেলেরা (তাহমিনাদের বাবা/চাচারা) মিলে যে কোনো একটি বাড়ির উঠানে বৈঠকের আয়োজন করতেন।”
“এই বৈঠকে বছরজুড়ে গ্রামের কোথায় কোন ঝামেলা হয়েছে, তাতে কোন বাড়ির কে জড়িত ছিল, সেসব উত্থাপিত হতো, চলতো তর্ক-বিতর্ক এবং মীমাংসার প্রয়াস। কখনো কেউ কেউ উত্তেজিত হয়ে বৈঠক ছেড়ে চলে যেতেন, কেউবা তাদের থামানোর চেষ্টা করতেন।”
তবে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সামাল দেবার লোকও বৈঠকে সদাই থাকতো। তাহমিনা বলেন, “পরক্ষণেই আবার রসিক কেউ একজন পরিস্থিত ঠান্ডা করতে কৌতুকপূর্ণ কিছু একটা বলতেন, হাসির রোল পড়ে যেত উঠানজুড়ে। আর চা পর্বে বিখ্যাত সল্টেজ (নোনতা) বিস্কুট চলে এলেই পরিস্থিত আপনি শান্ত হয়ে যেত।”
স্বাভাবিকভাবে, যা কিছু নিষিদ্ধ, যা কিছু হাত বাড়ালেই ধরা দেয় না, তার প্রতি মানুষের কৌতূহল দুর্বার। তাহমিনার কৌতূহল ছিল এই বৈঠক নিয়ে, যেখানে নারীদের আনাগোনা নিষিদ্ধ ছিল।
“বৈঠকের যুক্তি-তর্ক, রাগ-অভিমান, হাসি-মশকরা, বিবাদ আর মিটমাট - আমাদের (নারীদের) এসব শুনতে হতো বন্ধ দরজার পেছন থেকে। কখনো কখনো বাবার ধমকের ঝুঁকি নিয়েই চলে যেতাম বাইরে, দাঁড়াতাম কোনো গাছের আড়ালে।”
“এখন অবশ্য বৈঠকে নারীদের কঠোরভাবে দূরে রাখা হয় না। অবশ্য, বৈঠকই বা আগের মতো হয় কই?” দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে স্মৃতিচারণের পাট চুকালেন তাহমিনা।
দাদাবাড়ির সেই আমেজটা কি হারিয়ে গেল?
কবির, নিশি, তাহমিনা কিংবা এই লেখকের মতো আজকালকার শিশুরা তাদের শেকড়ের সাথে অতটা নিবিড়ভাবে যুক্ত নয়। তারা পায় না কোনো মায়াবী রাত, ছেলে-বুড়োর গল্পের আসর কিংবা বাড়ির উঠানে পিঠা উৎসব। জীবন এখন বিভাজিত প্রত্যেকের নিজস্ব গন্ডির ভেতরে, বছরঘুরে ইদ এলেও আগের মতো এই আলাদা গন্ডিগুলো এক রেখায় মেলে না আর।
এই ভাবনা আলিফ আহমেদেরও। বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি, স্ত্রী আর ৩ বছরের কন্যাশিশুটিকে নিয়ে ঢাকার কংক্রিটের দালানে আবদ্ধ তার জীবন। ছুটিতে গ্রামে গেলেও শৈশবের সে আমেজটা তিনি খুঁজে পাননা।
“সময়ের সাথে গ্রাম উন্নত হয়েছে। বাড়ি বাড়ি একত্রে মিশে থাকা চৌচালা ঘরের গ্রাম এখন পাকা ঘরে ভরে উঠেছে, বাড়ি বাড়ি হয়েছে দেয়ালের বিভাজন। হারিকেন আর কুপির আলো নেই আর, এখন রাতে ৮/৯টায় গ্রাম নীরব হয় না। রাত পর্যন্ত চলে ঘরে ঘরে টিভি।”
“প্রযুক্তি আর অবকাঠামোয় মানুষের জীবন আরেকটু সহজ হলে তা নিয়ে কারোরই আপত্তি থাকবার কথা না। কিন্তু কোথায় যেন কিছু একটা হারিয়ে গেছে। আমার মেয়েটা (মুনিয়া) ঢাকার বন্দী বাসা থেকে গ্রামে এসেও নিজের ঘরেই বন্দী। পাশের বাড়িরি শিশুগুলোর সাথে তার মেশা হয় না, যেমন মিশে যেতাম আমি,” বলছিলেন আলিফ।
নিজের শৈশবে ইদের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দাদাবাড়িতে যেতে আলিফ যতটা উদগ্রীব ছিলেন, কয়েকবছর পর তার মেয়েটি আরেকটু বড় হলে, সে যেতে চাইবে তো গ্রামে? - এরকম প্রশ্ন এখনই ঘুরপাক খায় আলিফের মনে।
উন্নয়ন তার আপন গতিতে চলবে। যতক্ষণ পর্যন্ত তা জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাবে, ততক্ষণ তাকে স্বাগতম জানাতেই হবে। তবে এর মাঝে কিছু একটা হারিয়ে যাবে, যেটা আলিফ বুঝতে চেষ্টা করেন।
এই ‘কিছু একটা’ হয়তো বন্ধন, হয়তো মাটির ঘ্রাণ কিংবা প্রকৃতির আরো কাছে থাকা, হয়তো অকৃত্রিম জীবনব্যবস্থা, হয়তো কিছুই না। হয়তো প্রত্যেকের শৈশবের দাদাবাড়ি তার স্মৃতির মানসপটে দেয়ালচিত্র হয়ে ঝুলবে, এটিই নিয়তি।
লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতায় স্নাতক সম্পন্ন করে বর্তমানে একটি ইংরেজি দৈনিকে কর্মরত।
msislam8686@gmail.com