logo

সাড়া জাগিয়েছে মহাকাশের নতুন যে ছবিগুলো

সাজিদ আল মাহমুদ | Thursday, 14 July 2022


প্রথমবারের মত দূরবর্তী মহাকাশের বেশ কিছু ছবি পাঠিয়েছে সদ্য মহাকাশে প্রেরিত ‘জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ’। ছবিগুলো তাক লাগিয়ে দিয়েছে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের। পূর্বের হাবল টেলিস্কোপের তুলনায় এই নতুন টেলিস্কোপ মহাকাশের আরো স্পষ্ট ও পরিষ্কার ছবি তুলে আনছে। দেখা মিলছে দূরবর্তী সব নক্ষত্র ও ছায়াপথের সাথে।  

প্রথম ছবিটি প্রকাশিত হয় সোমবার। এটি এ যাবৎ কালের সবচেয়ে স্বচ্ছ ইনফ্রারেড ছবি হিসেবে বিবেচিত। আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ছবিটি প্রকাশ করেন। এরপর নাসা কর্তৃক মঙ্গলবার একে একে বাকি ছবিগুলো প্রকাশ করা হয়।

প্রথম ছবিটি এসএমএসিএস ০৭২৩ নামের একটি সুবিশাল ছায়াপথগুচ্ছের। এর বিশেষত্ব হলো, এই ছায়াপথগুলোর অতিরিক্ত ভর মহাকাশের স্থান - কালকে সংকুচিত করে ফেলে। অনেকটা ম্যাগনিফাইং গ্লাসের মতো কাজ করে। ফলে পেছনের দূরবর্তী ছায়াপথগুলো দৃষ্টিগোচর হয়। খেয়াল করলে দেখা যাবে দূরের ছায়াপথগুলো কেমন যেন বেঁকে যাচ্ছে।



এসএমএসিএস ০৭২৩ ছায়াপথগুচ্ছ ও এযাবৎ কালের সবচেয়ে দূরবর্তী ছবি।                    ছবি: নাসা




ছবিতে উজ্জল সাদা আলো হলো পৃথিবীর নিকটবর্তী নক্ষত্র, আর লাল আলো দূরবর্তী ছায়াপথগুলোকে নির্দেশ করে।  

নাসার দাবী, এটিই এখন পর্যন্ত মহাকাশের সবচেয়ে দূরবর্তী ছবি। এই ছবির সবচেয়ে কাছের যে ছায়াপথটি সেটিও প্রায় ৪৫০ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত। আর দূরেরগুলো প্রায় ১,৩০০ কোটি আলোকবর্ষ দূরের। 




ডব্লিউএএসপি-৯৬ বি এর বায়ুমন্ডলের ব্যাখ্যা                                                    ছবি: নাসা




এই ছবিটি হচ্ছে আমাদের সৌর জগতের নিকটবর্তী এক্সো প্ল্যানেট ডব্লিউএএসপি-৯৬ বি এর বায়ুমন্ডলের ব্যাখ্যা। ডব্লিউএএসপি-৯৬ বি হলো পৃথিবী থেকে প্রায় ১,১৫০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি গ্যাসীয় গ্রহ, অনেকটা বৃহস্পতির মত। তবে এর ভর আমাদের বৃহস্পতির প্রায় অর্ধেক।  

এক্সো প্ল্যানেট বলতে এমন সব গ্রহকে বোঝায় যা আমাদের সৌর জগতের বাইরে অবস্থিত। যা অন্য কোনো নক্ষত্র বা সূর্যকে আবর্তন করে। মহাকাশে নক্ষত্রের তুলনায় এই এক্সো প্ল্যানেটগুলো খুজে পাওয়া বেশ কঠিন, কারণ এগুলো কোনো আলোর উৎস না। দূর থেকে এগুলোকে সহজে দেখা যায় না।

এই গ্রহটি ২০১৪ সালে আবিষ্কার হলেও জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের সাহায্যে গ্রহটির বায়ুমন্ডল সম্পর্কে নতুন সব তথ্য উঠে এসেছে। ছবিতে দেখা যাচ্ছে এই গ্রহের বায়ুমন্ডলে পানি ও জলীয় বাষ্পের পরিমাণ।

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপ যেহেতু শক্তিশালী ইনফ্রারেড আলোর সাহায্যে দেখে, তাই এ সকল দূরবর্তী সৌরজগতের গ্রহগুলো খুঁজে পাওয়া এখন অনেকটাই সহজ হবে বলে ধারণা করছেন নাসার বিজ্ঞানীরা।

তৃতীয় ছবিটি হচ্ছে একটি নীহারিকার। নাম ‘সাউদার্থ রিং নেবুলা’। পৃথিবী থেকে এর দুরত্ব প্রায় ২,০০০ আলোকবর্ষ।




সাউদার্ন রিং নেবুলা                                                                 ছবি: নাসা





সাধারণত যখন একটি নক্ষত্রের মৃত্যু হয় তখন সেটা বিস্ফোরিত হয়ে নীহারিকার জন্ম দেয়। মহাকাশে গ্যাস ও ধুলিকণাসহ অন্যান্য পদার্থ ছড়িয়ে পরতে শুরু করে। তা থেকে আবার নতুন নক্ষত্রের জন্ম হয়।  

ছবিতে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে কিভাবে নীহারিকার গ্যাসীয় পদার্থগুলো মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ছে। পেছনের ক্ষুদ্র আলোকছটাগুলো এক একটি ছায়াপথ নির্দেশ করে। নীহারিকার এই পরিষ্কার ছবি থেকে নতুন নক্ষত্রের জন্ম ও জীবনচক্র সম্পর্কে আরো পরিস্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব বলে বিশ্বাস জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের।





স্টিফেনস কুইন্টেট                                                   ছবি: নাসা 

স্টিফেন’স কুইন্টেট হলো পৃথিবী থেকে প্রায় উনত্রিশ কোটি আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত পাঁচটি ছায়াপথ। এগুলোর বিশেষত্ব হলো, এই ছায়াপথগুলো একে অপরের খুবই নিকটে অবস্থিত এবং একটি ছায়াপথের সাথে আরেকটি ছায়াপথের সংঘর্ষ ঘটছে।

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের সাহায্যে তোলা নতুন এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে, দুটি ছায়াপথের সংঘর্ষের ফলে এক সুবিশাল শক ওয়েভের সৃষ্টি হয়েছে।  

প্রতিটি ছায়াপথের মাঝেই একটি ব্ল্যাকহোল বা কৃষ্ণ গহবর থাকে। ছায়াপথের সংঘর্ষের ফলে কৃষ্ণ গহবরগুলো মিলিত হয়ে অনেক সময় সুপার ম্যাসিভ ব্ল্যাকহোলের জন্ম দেয়।

নাসার দাবী, এই ছায়াপথগুলোর এতটা স্বচ্ছ ছবি এই প্রথম তোলা সম্ভব হয়েছে। এর মাধ্যমে ছায়াপথের সংঘর্ষ ও নতুন ছায়াপথের জন্ম প্রক্রিয়ার বিষয়ে ধারণা লাভ করা যাবে।

শেষ ছবিটি পৃথিবী থেকে প্রায় ৭,৬০০ আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত একটি নেবুলা বা নীহারিকার অংশ বিশেষ। নীহারিকাটির নাম ‘ক্যারিনা’। একটি মহাকাশের সবচেয়ে বড় নিহারিকগুলোর একটি।







ক্যারিনা নেবুলা                                                                              ছবি: নাসা   

ছবিতে পাহাড়ের মত দেখতে অংশটি হলো গ্যাস ও ধুলাবালির সংমিশ্রণ।

নীহারিকা হতে নির্গত গ্যাস ও ধুলিকণা থেকে নক্ষত্রের জন্ম হয়। এই ‘ক্যারিনা’ নীহারিকাটি থেকে এরূপ অসংখ্য নক্ষত্রের জন্ম হয়েছে যার আকার আমাদের সূর্যের চেয়েও অনেক বড়।

নাসার মতে, এখন পর্যন্ত এটিই একটি নীহারিকার সবচেয়ে নিখুঁত ও বিস্তারিত ছবি। জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের শক্তিশালী লেন্সের সাহায্যে এই স্বচ্ছ ও পরিষ্কার ছবি নেয়া সম্ভব হয়েছে। একটি নক্ষত্রের জন্ম প্রক্রিয়া উদঘাটনে টেলিস্কোপটি বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। 

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপ মহাকাশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে বিগত বছরের ২৫ ডিসেম্বর। নাসার দাবী, এই টেলিস্কোপটি প্রায় বিশ বছর মহাকাশে অবস্থান করবে।

এ তো কেবলই শুরু। এই টেলিস্কোপের সাহায্যে আগামী দিনগুলোতে আরো স্বচ্ছ ও গুরুত্বপূর্ণ সব ছবি ধারণ করা সম্ভব হবে, যা মহাকাশ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞানকে আরো সমৃদ্ধ করবে।

 

সাজিদ আল মাহমুদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়াশুনা করছেন।

shajidmahmud11@gmail.com