logo

সারোগেসির সাতপাঁচ

মাহমুদ নেওয়াজ জয় | Saturday, 5 February 2022


সম্প্রতি মা-বাবা হয়েছেন অভিনয়শিল্পী দম্পতি প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ও নিক জোনাস৷ কিন্তু প্রথাগতভাবে নয়। তারা আশ্রয় নিয়েছেন বিশেষ এক পদ্ধতির, যার নাম 'সারোগেসি।' এরপর থেকেই তুমুল আলাপ-আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়েছে এই পদ্ধতিটি ।

সারোগেসি মূলত গর্ভাশয় ভাড়া নেয়ার মাধ্যমে সন্তান জন্মদানের প্রক্রিয়া। দুইভাবে সারোগেসি করা সম্ভব,

১. যদি মা একেবারেই সমর্থ না হন, সেক্ষেত্রে সারোগেট মা-র ডিম্বাণু ও বাবার শুক্রাণু নিয়ে আলাদাভাবে নিষেক ঘটিয়ে ভ্রুণকে সারোগেড় মা-র গর্ভাশয়ে স্থাপন করা হয়৷ একে বলা হয় 'পার্শিয়াল সারোগেসি।'

২. যদি মা ডিম্বাণু প্রদানে সমর্থ হন, সেক্ষেত্রে বাবার শুক্রাণু ও মার ডিম্বাণুর নিষেক ঘটিয়ে তা সারোগেট মা-র গর্ভাশয়ে স্থাপন করা হয়। একে বলা হয় 'ট্রু সারোগেসি’

সারোগেসির মাধ্যমে নিঃসন্তান অনেক দম্পতিই সন্তানের মুখ দেখছেন। তবে পদ্ধতিটি বিতর্কের উর্ধ্বে নয়।একজন সারোগেট মা যদি সন্তানকে ডিম্বাণু না দিয়েও থাকেন, তবু গর্ভধারণের যন্ত্রণা তো তাঁকে সহ্য করতে হয়৷  ট্রু সারোগেসিতে শুক্রাণু-ডিম্বাণু বাবা-মাদের থাকায় সন্তানের ওপর সারোগেট মা-র কোনো অধিকার থাকেনা। পার্শিয়াল সারোগেসিতে অধিকার থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা অনেকক্ষেত্রেই দেখা যায় না।

আবার, সারোগেসির ব্যাপারটা অনেকক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট  কর্তৃপক্ষের জন্য বিশাল আর্থিক লাভের সুযোগ নিয়ে আসে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেই যেমন প্রচুর দরিদ্র নারী জীবিকার মাধ্যম হিসেবে এটি বেছে নিচ্ছেন। যার প্রেক্ষিতে সারোগেসিকে অনেকটা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণের মত সিদ্ধান্তও সেখানে গৃহীত হয়েছে।

আশিয়ান মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকার রেজিস্টার (মেডিসিন)  ডা. প্রমা অর্চি সিদ্দিকীর মতে,  “এটি ( সারোগেসি) হলো  গর্ভ ভাড়াদানের মতো। ডিম্বাণু ও  শুক্রাণু  Artificial Reproductive Technology  ব্যবহার করে ভ্রুণ গর্ভ ভাড়াদানে ইচ্ছুক নারীর গর্ভে স্থাপন করা। এক্ষেত্রে কোনোভাবেই বাচ্চাটি জেনেটিক্যালি 'সারোগেট মায়ের' সাথে সম্পর্কিত হবেন না। অর্থাৎ,  বাচ্চার বৈশিষ্ট্য তার বায়োলজিক্যাল পিতা- মাতার মতো হবে।”

তিনি আরো বলেন, “বাইরের দেশে সারোগেসির প্রকারভেদ আছে, একটি হল অ্যালট্রুইস্টিক সারোগেসি, যেখানে শুধুমাত্র বায়োলজিক্যাল মায়ের শারীরিক সমস্যা থাকলে বা কোনো নিঃসন্তান দম্পতির মঙ্গল কামনা করে কেউ তার গর্ভ ভাড়া দিতে রাজি হয়। এক্ষেত্রে কোনো ধরনের টাকা পয়সার দেনা পাওনা জড়িত থাকে না। আরেকটি হলো কমার্শিয়াল সারোগেসি, যেখানে একজন সুস্থ স্বাস্থ্যবান নারী অর্থের বিনিময়ে একজন নিঃসন্তান দম্পতি বা বায়োলজিকাল মা (যিনি কোনো অসুস্থতার কারনে গর্ভধারনে অক্ষম) তার সন্তান ধারণে রাজি হয়।”

ডা. প্রমা  জানান সারোগেট মা-র ওপর আরোপিত বিভিন্ন মেডিক্যাল নীতির কথা, “সারোগেট মা কেবলমাত্র সন্তান ধারন করবেন এবং তিনি সন্তান সম্পর্কিত কোনো দাবী দাওয়া উত্থাপন করতে পারবেন না।”

“তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় দরিদ্র- প্রান্তিক নারীদের মাধ্যমে কমার্শিয়াল সারোগেসি  ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়তা পাওয়ার একমাত্র কারণ হলো, নারীদের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক দুর্বলতা। সারোগেট মায়েদের নিয়ে যে স্বাস্থ্যবিষয়ক জটিলতা বা অন্যান্য সামাজিক জটিলতা হতে পারে সেক্ষেত্রেও কোনো সুস্পষ্ট পদক্ষেপ নেই।অনেক সারোগেট মা গর্ভধারণ পরবর্তী জটিলতায় ভুগতে পারেন -এ বিষয়ক জরুরি ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রেই নিতে দেখা যায় না।”

তবে বর্তমানে প্রথম বিশ্বে এই ধরনের সারোগেসিতে গর্ভাশয়ে ভ্রুণ স্থাপনে আগ্রহী হচ্ছেন অনেকেই, প্রত্যেকেই যে দারিদ্র্যের কারণে এই কাজে এগিয়ে আসেন, এমন ধারনা অমূলক। কমার্শিয়াল সারোগেসি নিঃসন্তান দম্পতি বা জুটির জন্য সন্তান গ্রহণের একটি কার্যকর প্রক্রিয়া হয়ে উঠছে বিশ্বজুড়ে, যদিও বেশ কিছু সমাজব্যবস্থায় এই পদ্ধতি এখনো গৃহীত হয়নি, ট্যাবু হয়ে রয়েছে।

মাহমুদ নেওয়াজ জয় বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।

mahmudnewaz939@gmail.com