logo

সাবেক অর্থমন্ত্রী মুহিত যে দুটি কারণে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন

মাবরূর মাহমুদ | Monday, 2 May 2022


সাবেক অর্থমন্ত্রী মরহুম আবুল মাল আবদুল মুহিতের সাথে আমার প্রথম কথা বলার সুযোগ হয়েছিল সোনারগাঁও হোটেলে, আশির দশকের শেষের দিকে। আমি তখন স্কুলে অষ্টম-নবম শ্রেণিতে পড়ি। আমার বাবার সরকারি চাকরির সুবাদে তখন আমরা সোনারগাঁও হোটেলের সুইমিং পুলের মেম্বারশিপ পেয়েছিলাম।

আমার বাবা ছিলেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের উর্দ্ধতন কর্মকর্তা। সেসময় সরকারি মালিকানাধীন সোনারগাঁও হোটেলের পরিচালনা পর্ষদে সরকারি অফিসাররা থাকতেন। আমার বাবারও সুযোগ হয়েছিল পর পর কয়েক মেয়াদে পরিচালনা পর্ষদে প্রতিনিধিত্ব করার। সেই সুবাদে আমরা এই মেম্বারশিপ পেয়েছিলাম।

আমি তখন নিয়মিত সাইকেল চালিয়ে আমাদের কাকরাইলের বাসা থেকে সোনারগাঁও হোটেলে সুইমিং করতে যেতাম। মুহিত সাহেবও সেখানে আসতেন সাঁতার কাটতে। কোনদিন কথা বলার সুযোগ হয়নি। আর আমি তখন নিতান্তই কিশোর। কিন্তু তাঁকে সবাই চিনতো সাবেক মন্ত্রী হিসেবে। তাই আগ বাড়িয়ে তাঁর সাথে কথা বলার কোন চেষ্টাও আমি করিনি।

একদিন লকার রুমে গিয়ে দেখলাম তিনি আমার পাশেই দাঁড়িয়ে তাঁর জামাকাপড় লকারে রাখছেন। তাঁর পরনে একটি হাফ প্যান্ট। গায়ে জামা নেই। বোঝাই যাচ্ছে তিনি সাঁতারের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

তাঁকে কাছে পেয়ে আমি আর সেই সুযোগ হারালাম না, কথা বলা শুরু করলাম।

“আমি আপনাকে আমার ছোট মামার বাসায় অনেকবার দেখেছি। আপনি মনে হয় আমার ছোট মামার ক্লোজ ফ্রেন্ড।”

তিনি সহাস্যে জিজ্ঞেস করলেন,“ও তাই নাকি? তো, তোমার ছোট মামার নাম কী?”

“হেদায়েত আহমেদ। তিনি শিক্ষা সচিব ছিলেন।”

নাম শুনে আমার দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন, “ইয়েস, হেদু আমার ক্লোজ ফ্রেন্ড।”

তারপর ভুরু কিছুটা কুঁচকে সিলেটি ভাষায় আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কার পুয়া? (তুমি কার ছেলে?)”

“জ্বি, আমি ফারেহার পুয়া (আমি ফারেহার ছেলে)”, আমিও উত্তর দিলাম সিলেটি ভাষায়।

“ও আইচ্ছা।”

তারপরই আমাকে অবাক করে দিয়ে আঙ্গুল উচিয়ে আমাকে ধমকের সুরে বললেন, “তোমার বাফ কুনুদিন আমার কাসে আইসইন না (তোমার বাবা কোনদিন আমার কাছে আসেননি)।”

আমি থতমত খেয়ে গেলাম। বুঝতে পারলাম না তাঁর এই কথার কী উত্তর দেব। তিনিও কথা বাড়ালেন না। চলে গেলেন।

আমি বাসায় গিয়ে আমার বাবাকে এই কথা বললাম। আমার বাবা শুনে হেসে বললেন, হ্যাঁ, এটা ঠিকই। আমি ওনার কাছে কখনো যাইনি। এটা দেখি উনি মনে রেখেছেন।

এরপর তাঁর সাথে আমার দেখা হয় দীর্ঘদিন পর জেদ্দাতে। তিনি অর্থমন্ত্রী হিসেবে এসেছিলেন। আমার প্রতিষ্ঠানের একটি অনুষ্ঠানে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। সেই সুযোগে আমিও নিজের পরিচয় দিয়ে তাঁর সাথে অল্প আলাপ করেছি। কিন্তু এর বেশি কথা বলার আর সুযোগ হয়নি।

সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত আরেক সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানের মত কোন সংস্কারক ছিলেন না। তাই তাঁকে মানুষ একজন বিপ্লবী এবং সুপারম্যান হিসেবে মনে রাখবে না। তিনি অর্থমন্ত্রী হিসেবে রুটিন কাজ করে গেছেন। কোন বিরাট পরিবর্তন তিনি আনেননি, যদিও তাঁর মেয়াদ ছিল দীর্ঘ এক দশক এবং প্রাতিষ্ঠানিক অনেক সংস্কার করার অনেক সুযোগ তাঁর সামনে ছিল।

কিন্তু তারপরও আমি মনে করি অন্তত দুটি কারণে তাঁকে জাতি মনে রাখবে।

প্রথম কারণ হল, তাঁর দীর্ঘ মেয়াদে দেশে আর্থিক কোন সংকট হয়নি। অথচ এই সময়কালে সারা বিশ্বে অনেক উথান-পতন হয়েছে, ২০০৮ সালে বিশ্বমন্দা হয়েছে, কিন্তু তার কোন আঁচ বাংলাদেশে লাগেনি। হতে পারে এই সকল বিশ্ব ক্রাইসিসের আঁচ লাগার মত উঁচু অবস্থানে বাংলাদেশ তখন ছিল না। আবার এটাও হতে পারে, তাঁর দক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণেই বাংলাদেশ এই সকল বন্ধুর যাত্রায় বেঁচে গেছে।

বিপদে না পড়লে কিন্তু বোঝা যায় না সারেং কতটা দক্ষ। তাই সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের দক্ষতাও একই কারণে বোঝা যায়নি। কারণ তাঁর দীর্ঘ সময়কালে বাংলাদেশ কোন বিপদে পড়েনি।

দ্বিতীয় যে কারণের জন্য মানুষ তাকে মনে রাখবে, সেটা হল পদ্মা সেতুর অর্থায়ন।

একজন অর্থমন্ত্রীর মূল কাজই হচ্ছে সরকারকে টাকার যোগান দেয়া এবং সরকারের কোনো খাতে যাতে টাকার টান না পড়ে, তা খেয়াল রাখা। এটা করতে গিয়ে আবার দেখতে হবে, দেশের মুদ্রামান ঠিক থাকছে কি না। আপনি টাকার সংস্থান করলেন, কিন্তু তার জন্য দেশের মূদ্রামান যদি হড়হড় করে পড়ে যায়, তাহলে যে লাউ, সেই কদু!

পদ্মা সেতুর মত মেগা প্রজেক্টের অর্থায়নের এই পুরো বিষয়টা কিন্তু শুরু হয়েছে তার অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে। আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি এতো বড় একটা সেতু হয়ে যাচ্ছে সম্পূর্ণ নিজের টাকায়, কোন বিদেশি অর্থায়ন ছাড়াই! এটা তো অসম্ভব এবং অবাস্তব একটি বিষয় ছিল কিছুদিন আগেই, তাই না?

তার চেয়েও বড় কথা, এতো বড় সেতু যে আমরা নিজের টাকায় করে ফেলছি, আমরা কি সেটা টের পেয়েছি? সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা কি এর জন্য আটকে গেছে? দেশের অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থায়নে কি টাকার ঘাটতি পড়েছে? দেশের মুদ্রামান বিগত এক দশকে কি দ্রুত নেমে গেছে?

না। কোনটাই হয়নি। অথচ এই পুরো সেতুটির অর্থায়ন কীভাবে হবে, কোথা থেকে টাকা আসবে, সেই টাকা দিলে কোথায় কোথায় ঘাটতি হবে, সেই ঘাটতি কীভাবে মেটাতে হবে, এই সকল চিন্তা কিন্তু অর্থমন্ত্রী হিসেবে তাকেই করতে হয়েছে। অন্য কাউকে নয়।

এখানেই সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের বিশেষত্ব। এখানেই তিনি অনন্য। একজন সুপারম্যান, একজন সংস্কারক, একজন বিপ্লবী না হয়েও নীরবে কাজ করে যে মহীরুহ হওয়া যায়, সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতই তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ।

মহান আল্লাহপাক তাঁর সকল ভুল ক্ষমা করুন এবং তাঁকে জান্নাতে সুউচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমীন!

লেখক জেদ্দা প্রবাসী বাংলাদেশি এবং বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক ব্যাংকে কর্মরত। লেখাটি তাঁর ফেসবুক পাতা থেকে নেওয়া।

ideasfd@gmail.com