logo

সাইবার বুলিং প্রতিরোধে

সোফিয়া নুর | Wednesday, 28 April 2021


সাইবার বুলিং। শব্দজোড়া পরিচিত মনে হচ্ছে?

ধরুন, ইন্টারনেটে খবরের শিরোনাম পড়ছেন আপনি। অথবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেইসবুক বা ইনস্টাগ্রামে ঘুরতে ঘুরতে চোখে পড়লো ফোনকল বা ডিজিটাল বার্তার মাধ্যমে কাউকে নেতিবাচক মন্তব্য করে আঘাত করার কথা, বা আপনার প্রিয় আন্তর্জাতিক পর্যায়ের জনপ্রিয় কোনো তারকাকে তার গোপন তথ্য ফাঁস করে হুমকি দেওয়ার ঘটনা।

চেনা ঘটনা লাগছে?

আমরা ডিজিটাল যুগে বসবাস করছি। ডিজিটাল জীবন ব্যবস্থায় সবকিছু দ্রুত হওয়া শুরু হয়েছে। হুমকির ডিজিটাল রূপ যদি বলতে হয়, তাহলে যে শব্দজোড়া না বললেই নয় -- তাই হলো ‘সাইবার বুলিং’। কাউকে ফোন, ইলেকট্রনিক মাধ্যম যেমন কম্পিউটার বা স্মার্টফোনে তর্জন-গর্জন করা বা কোনো স্বার্থ আদায় করে নেবার উদ্দেশে হুমকি দিয়ে ভয় দেখানোর কাজটা সাইবার বুলিং এর আওতায় পড়ে। এছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহার করে বা সাইবার আক্রমণের সাহায্যে অনেকসময় নাটকীয় খবর বা গুজব রটিয়ে কারো ব্যক্তিত্বে আঘাত করা, সামাজিকভাবে কাউকে অপ্রীতিকর পরিস্থিতিতে ফেলা - এসব বিষয়ও সাইবার বুলিং এর মাঝে ফেলা যায়।

ইন্টারনেটের যুগ অতি সক্রিয় হবার পর কিছুটা ভাটা পড়েছে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিতকর্মে। শেকড় গেড়ে বসেছে অপকর্মের নানান উপায়। ইউরোপিয়ান জার্নাল অফ ডেভেলপমেন্ট সাইকোলজি’র একটি গবেষণামতে, যাদের সেলফ ইস্টিম বা আত্মমর্যাদার অনুভূতি যতটা দুর্বল, তারা তত বেশি বুলিং এর শিকার হয়ে থাকেন।

আত্মমর্যাদার বিষয়টি বুলিং এর সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। উত্যক্তকারীরা সাধারণত মানসিকভাবে দুর্বল এমন মানুষকে লক্ষ্য করে থাকে। অর্থাৎ, মানুষের দুর্বল জায়গায় আঘাত করাটা উত্যক্তকরণের প্রধান উদ্দেশ্য। ব্যক্তির স্পর্শকাতর বিষয়কে কেন্দ্র করে ক্ষতি করতেই মূলত এমনটা করা হয়।

সাম্প্রতিক সময়ে সাইবার বুলিং বেড়ে যাওয়ার আরেকটি কারণ হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবাধ বিচরণ। হোয়াটসঅ্যাপ, ফেইসবুক এবং রেডিটসহ বিভিন্ন মাধ্যমে সাইবার বুলিইংয়ের অনেকভাবে প্রকাশ ঘটে থাকে। বুলিং এর শিকার ব্যক্তিটি বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সম্মুখীন হয়ে থাকেন।

ইয়েল নিউজপেপারে প্রকাশিত তথ্যমতে, আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী যারা সাইবার বুলিং এর চক্রের শিকার হন, তারা হতাশা, মানসিক চাপ, উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করে। জীবন সম্পর্কে তাদের ধারণাও হয় নেতিবাচক।

সাধারণ উপায়ে হুমকি দেওয়ার তুলনায় সাইবার স্পেসে হুমকির অনুপাত অনেকটা কম, অর্থাৎ সাইবার বুলিং সাধারণ হুমকির থেকে কম হয়ে থাকে। কিন্তু অনেক দুর্বৃত্তকারো আছে যারা সরাসরি ভয় দেখিয়ে কাজ আদায় করিয়ে নিয়ে বা অসৌজন্যমূলক আচরণের মাধ্যমে কাউকে হেনস্থা করে নিজের পরিচয় প্রকাশ করতে চান না। যারা গোপনে, অনৈতিক ও অপ্রীতিকর উপায়ে তাদের স্বার্থ সিদ্ধি করতে চায় তারা মোবাইল, ইন্টারনেট, টেক্সট ম্যাসেজ ইত্যাদিসহ আরো নানান মাধ্যমে অন্যকে আপত্তিকর কাজ করতে বাধ্য করার চেষ্টা করে থাকেন।

মানসিক ব্যাপারগুলো এক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। হতাশা, বিষণ্ণতাসহ মনস্তাত্ত্বিক যেকোনো অসুবিধাকে গুরুত্বের সাথে দেখে তা সমাধান করে বুলিং কমানো সম্ভব। শিক্ষকরা এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে পারেন। সামাজিকভাবে আমরা সচেতনতা, সাবধানতা বৃদ্ধি করতে পারি। নিজেরা নিজেদের অবহিত করতে পারি, অন্যদের জানাতে পারি। কাউকে অপদস্থ হতে দেখলে সে ব্যাপারে নিজে থেকে পদক্ষেপ নিতে পারি, আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়টিকে তুলে ধরলে ক্রমান্বয়ে সচেতনতা বাড়বে। এ ব্যাপারে মানুষকে আরো সুস্পষ্টভাবে জানানোর জন্য শিক্ষামূলক কনটেন্ট আপলোড করা বা তুলে ধরা যেতে পারে।

তথ্য প্রযুক্তি আইন সাইবার বুলিং কমাতে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারে। কোনো সিস্টেমে আকস্মিক প্রবেশ এবং সংবেদনশীল তথ্য ছড়িয়ে দেবার জন্য জরিমানাসহ শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে একটি গণসচেতনতামূলক দৃষ্টান্ত তৈরি হয়। ইতিবাচক ব্যক্তিস্বাধীনতা ক্ষুণ্ন না করে তথ্য প্রযুক্তি আইন যতটা সম্ভব প্রায়োগিক করতে হবে। কেউ সাইবার বুলিং করলে তাকে আইনের আওতায় এনে বিষয়টির যথার্থ সমাধান করতে হবে এবং এ ঘটনার শিকার ব্যক্তিকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দানের ব্যবস্থা করতে হবে।

নিরাপত্তা নেটওয়ার্কের প্রয়োগ বাড়াতে হবে সব খাতেই। আমাদের দেশে তথ্য প্রযুক্তিমূলক শিক্ষার বিস্তৃতি বাড়াতে হবে, যাতে অন্ততপক্ষে ইন্টারনেট বা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ব্যাপারে সাক্ষরতা বৃদ্ধি পায়। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় দ্রুত সব কাজ করা হয়ে যায়; তাই এর মাধ্যমে ইতিবাচক কিছু যেমন করা সম্ভব, তেমনি নেতিবাচক অনেক কিছুও সম্ভব। ফলে সম্মিলিতভাবে ইতিবাচক কাজকে উৎসাহ যোগাতে হবে। ডিজিটাল মাধ্যমগুলো মানুষকে সাহায্য করার উদ্দেশ্যে বানানো, কাউকে আঘাত বা কারো ক্ষতি করার জন্য নয়, এর সঠিক ব্যবহার আমাদের, অর্থাৎ ব্যবহারকারীদেরই নিশ্চিত করতে হবে।

সোফিয়া নুর ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছেন।

sofiautilitarian@gmail.com