সময়ের সীমারেখা মিটিয়ে মহীনের ঘোড়াগুলি চলছে আজও
অনিন্দিতা চৌধুরী | Wednesday, 22 December 2021
‘মহীনের ঘোড়াগুলো ঘাস খায় কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে’ - জীবনানন্দ দাশের আধুনিক কবিতার পৃষ্ঠায় উঠে আসে এক প্রাগৈতিহাসিক চারণভূমির দৃশ্যপট। আর এর জের ধরে জীবনানন্দের মৃত্যুর বেশ কয়েকবছর পর, ১৯৭৬ সালে স্বপ্নালু কিছু তরুণের হাত ধরে আবারো ফিরে আসে সেইসব ঘোড়া। বহুবচনে সাধুভাষার আঁচ লেগে গতি ফিরে পায় টগবগে খুরগুলোও।
এ ভূখণ্ডের সীমারেখায় যা আগে কখনো শোনা হয়নি, ভাবা হয়নি - সেই সুর ও তালে পা চালিয়ে চলে পাগলাটে সেই দলটা।
তখনো গান মানে শান্ত-স্থির, উত্তেজনা শুধু জীবনে; গানে তার রূপান্তর ঘটানো হয়নি। তবে বদল এলো; বদল যাদের মাধ্যমে এলো, এখনো বর্তমান সেই তাদের স্মৃতিময় অ্যালবামগুলো নিয়েই আজকের লেখা।
সংবিগ্ন পাখিকুল ও কলকাতা বিষয়ক
প্রথম অ্যালবাম ‘সংবিগ্ন পাখিকুল ও কলকাতা বিষয়ক’ আসে ১৯৭৭ সালে। ষাট কিংবা সত্তরের টালমাটাল কলকাতা শহরের ট্রামপোড়া গন্ধ কিংবা উত্তেজনার স্পর্শ মঞ্চে নিয়ে আসেন সাতজন যুবক।
দলের নামটাও সেই সাতকে কেন্দ্র করে প্রথম শোয়ের সময় দিয়ে ফেলেন ‘সপ্তর্ষি।’ তবে সে নাম পরে পালটে যায় এবং পালটে যাওয়া নামেই আমরা আজো তাদের চিনি, কিছুটা জানি ও অনেকটা মনে রাখি।
‘মেরুন সন্ধ্যালোকে’ হারিয়ে যেতে চাওয়া উদাসী মনের ডাকে, কলকাতা থেকে অনেক দূরে বসেও ‘স্মৃতির ভেতর ট্রামের ধ্বনি’ বিবাগী সুর গড়ার কথা বলে এই অ্যালবাম। ‘স্টিমার ঘাটের ভোঁ’ ঘুরেফিরে আসে গানের সুরে সুরে।
অজানা উড়ন্ত বস্তু বা অ-উ-ব
১৯৭৮ সালে মুক্তি পায় অ্যালবামটি। ব্যান্ডটির অভিষেক অ্যালবাম এটি। এই অ্যালবামটিতে মাত্র দুটো গানই রয়েছে। দুটোরই গীতিকার রঞ্জন ঘোষাল।
অ্যালবামের নামেই প্রথম গান। সময়ের কঠিন করাতের নিচে প্রতিদিন বলি হওয়া কিছু ভৌতিক কেরানির গল্প বলা হয় এতে, চাহিদার স্কেলে দৌড়াতে গিয়ে যারা প্রায়ই হাঁপিয়ে ওঠে, সেই তাদের কাব্য লেখে এসব গানেরা।
আবছায়া সন্ধ্যার ভিড়ে বারবার ফিরে আসার একটি মেসঘর, লুকিয়ে-চুরিয়ে ভাগ করে নেয়া ঘেমো জীবনগুলোর কেউ ‘রুখু দাড়ি’ তো কেউ নিশাচর ইঁদুরের সঙ্গী হয়।
দ্বিতীয় গানে নগরবাসীর প্রতি এক প্রত্যক্ষ বক্তব্য ছুঁড়ে দেয়া হয়। ‘শোনো সুধীজন,’ সম্বোধনেই যেন স্পষ্ট, এখানে কোনো লুকোছাপার সুযোগ নেই।
‘তোমাদের অন্যায়ে আমাদের অবহেলা মিশে কোন নরক মাতায় তা জানো কি?’- এমন তীরের মতো ছুটে আসা প্রশ্ন শ্রোতাহৃদয়ে যে বিনোদন হিসেবেই গানকে রাখবে না, তাতে সন্দেহ নেই। সন্দেহ ছিল না মহীনের ঘোড়াগুলিরও, তাইতো নির্দ্বিধায় মঞ্চ কাঁপিয়েছে, ছুঁড়ে গেছে একের পর এক ‘গানবোমা।’
দৃশ্যমান মহীনের ঘোড়াগুলি
‘অজানা উড়ন্ত বস্তু’র পরবর্তী বছর, অর্থাৎ ১৯৭৯ সালে বের হয় এই অ্যালবামটি। এর প্রথম গানেই কেমন যেন বিদায়ের সুর লেগে আছে।
‘শব্দহীন শব্দের এই আঁধারে’ না ফেরার পণ করে চলে যাবার বার্তা দিতেই যেন অ্যালবামটি আনলেন তারা।
দ্বিতীয় গানটির নামও বিদায় কিংবা শেষের দিকেই নির্দেশ করছে- ‘চৈত্রের কাফন।’ অভিমানী আবহ জুড়ে মহীনের ঘোড়াগুলি দৃশ্যপট থেকে দূরে সরে যেতেই যেন শেষবার দৃশ্যমান হতে চেয়েছিলেন।
আবার বছর কুড়ি পরে
জীবনানন্দ ফিরে এলেন আবারো; তারই আরেকটি কবিতার নামে রাখা হলো অ্যালবামটির নাম। নতুন কোনো গান নয়, পুরনোর ভিড়ে পুরনোকে পুঁজি করেই এটি হচ্ছে মহীনের ঘোড়াগুলি ব্যান্ডের চতুর্থ, তবে প্রথম সম্পাদিত অ্যালবাম।
সবচেয়ে নতুন হওয়ায়, প্রাপ্তির বেলায় অপেক্ষাকৃত সহজলভ্যতা আর শোনবার কালে আরেকটু স্পষ্টতার কারণে এটিই হয়ে উঠলো বর্তমান প্রজন্মের কাছে মহীনের ঘোড়াগুলির কামব্যাক।
এই অ্যালবামের হাত ধরেই ফিরে যাওয়া হলো পুরনো গানগুলোর কাছে, অনলাইনে বহুবার সার্চ করা হলো মৌলিক গানগুলো।
নাগরিক ব্যস্ততা, ভিড়ঠেলা একলা মন, বদলে যাওয়া জীবন ও দৃশ্যপট, মানুষের মাঝে মানুষের কথা, শহুরে রাস্তার না রাখা কথার দল - সব মিলিয়ে মহীনের ঘোড়াগুলির পত্তন ঘটেছিল এক নির্দিষ্ট সময়ে, নির্দিষ্ট স্থানের গণ্ডিকে আশ্রয় করে।
কিন্তু সেসব স্থান আর সময়কে অতিক্রম করে কবে যে তারা নিজেদের কথা আর সুরের জাদু ছড়িয়ে দিয়েছে বহুদূরে, তার হিসেব করা দায়। ভাবতে ভালো লাগে, মহীনের ঘোড়াগুলো এখনো কোনো জোছনায় ঘুরেফিরে ঘাস খায়, বেয়াড়া ছেলের দল রকগানে নতুন জোয়ার আনতে চলে, কফিনের শেষ পেরেকটা ঠোকার আগেই নতুন কোনো শুরুর গল্প লেখা হয়।
অনিন্দিতা চৌধুরী বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পড়াশোনা করছেন।
anindetamonti3@gmail.com