logo

সমন্বয়হীনতায় বন্দরনগরীতে দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে বায়ু দূষণ

মিনহাজুর রহমান শিহাব | Monday, 20 December 2021


বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, ব্যবসা-বাণিজ্যের বহুমুখী প্রসার, জনসংখ্যা, আবাসন ও শিল্প-স্থাপনা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। তবে এই শিল্পায়ন কিংবা নগরায়ন যেন বিষফোঁড়া হয়ে উঠেছে এই শহরের জন্য।

যথাযথ নিয়মকানুন অনুসরণ না করে উন্নয়নকাজের ফলে অনেক আগে থেকেই মাত্রাতিরিক্ত বায়ুদূষণের শিকার এই শহর। ক্রমাগত দূষণের ফলে ধূলাবালি ও ধোঁয়ার সঙ্গে বন্দরনগরীর বাতাসে বাড়ছে ব্ল্যাক কার্বনসহ নানা বিষাক্ত উপাদান।

বাতাসের গুণগত মান নির্ভর করে বায়ুতে ভাসমান সূক্ষ্ম ধূলিকণার পরিমাণ (পার্টিকুলেট ম্যাটার বা পিএম-১০) এবং অতি সূক্ষ্ণ ধূলিকণার পরিমাণের (পিএম ২.৫) উপর, যা পরিমাপ করা হয় প্রতি ঘনমিটারে মাইক্রোগ্রাম (পার্টস পার মিলিয়ন-পিপিএম) এককে। পিএম ২.৫, পিএম ১০ ছাড়াও সালফার ডাই অক্সাইড, কার্বন মনো-অক্সাইড, নাইট্রোজেন ডাই-অক্সাইড ও গ্রাউন্ড লেভেল ওজোনে সৃষ্ট বায়ুদূষণ বিবেচনা করে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা একিউআই তৈরি হয়। একিউআই নম্বর যত বাড়তে থাকে, বায়ুমান তত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

বায়ুতে সবচেয়ে ক্ষতিকর উপাদান অতিসুক্ষ্ম ধুলিকনা পিএম ২.৫ যা বর্তমানে চট্টগ্রামের বাতাসে সহনীয় মাত্রার চেয়ে প্রায় ৪ গুণ বেশি । এগুলো যত বেশি হবে তাপমাত্রার তারতম্যও তত বেশি হবে। এছাড়া নগরীর বায়ুতে দূষিত উপাদানের প্রায় ৬৫ ভাগই ধূলিকনা। পরিবেশবিদদের মতে ধুলোর দূষণ ছাড়িয়ে যাচ্ছে ইটভাটার দূষণকেও।

সাধারণত প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ধূলিকণার সহনশীল মাত্রা ১৫০ মাইক্রোগ্রাম । কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিসংখ্যানে চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে জানা যায় প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ধুলোর পরিমাণ নগরীর বিভিন্ন স্থানে গড়ে ৩০০ মাইক্রোগ্রামের বেশি।

একসময় উন্নয়ন কাজের বদৌলতে কেবল মূল সড়কে ধুলাবালির প্রাদুর্ভাব থাকলেও বর্তমানে অলিগলির সড়কেও তা দৃশ্যমান। ধুলাবালি এত বেশি যে, শীত মৌসুমে রাস্তায় নামলে ধুলাবালি ও কুয়াশার মধ্যে পার্থক্য করা যায় না।

এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী ও পথচারীদের। ধুলাবালি থেকে রেহাই পায়না সড়কের পাশে থাকা বিভিন্ন স্থাপনাসহ দোকানপাট। সড়কের পাশে থাকা সবুজ পাতাগুলোও ধূসর হয়ে পড়ছে।

শুষ্ক মৌসুমে মানুষের ভোগান্তি চরমে পৌঁছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন অনুযায়ী কাজের আগে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নেওয়াসহ নিয়মিত পানি ছিটানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও তা মানছে না নগরীর সেবা সংস্থাগুলো।

সরকারি এবং বিদেশি সংস্থার অর্থায়নে বাস্তবায়িত মেগা প্রকল্পগুলোতেও পরিবেশের বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব না দেয়ায় পরিবেশ দূষণ ঘটছে। অথচ উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি প্রকল্প গ্রহণের শুরুতেই বিবেচনায় নেওয়ার কথা।

তাছাড়া চট্টগ্রাম শহরের খাল, নালাসমূহ পরিষ্কার করার সময় বর্জ্যসমূহ রাস্তার পাশে স্তূপীকৃত করে রাখা হয় যা অপসারণ ও পরিবহনের সময় রাস্তাঘাটে পড়ে মিশে যায়। পরবর্তীতে তা শুকিয়ে বাতাসের সাথে মিশে পরিবেশকে অস্বাস্থ্যকর করে তোলে।

এ ব্যাপারে কথা হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক ড. মোঃ শফিউল আলমের সঙ্গে।

“নগরীতে প্রতি বছর জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আবাসনের চাহিদা পূরণ করতে নগর এলাকায় পুরোনো ভবন ভাঙা, নতুন ভবন নির্মাণ ও নির্মাণসামগ্রী রাস্তার উপর যেখানে-সেখানে ফেলে রাখা হয়, যার কারণে বায়ুদূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে।”

“উন্নয়ন প্রকল্পে নিয়োজিত সরকারি সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি অনুসরণ না করায় বায়ু দূষণ দিন দিন তীব্রতর হচ্ছে,” যোগ করেন শফিউল আলম।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ু দূষণে নগরীর বাতাসে বেশি মাত্রায় পিএম থাকায় এবং দীর্ঘদিন ধূলাবালির পরিবেশে থাকার ফলে মানুষের ধমনীতন্ত্র, শ্বসনতন্ত্র এবং স্নায়ুতন্ত্র আক্রান্ত হচ্ছে বেশি। এ ছাড়া চোখের সমস্যা, বদহজম, অ্যালার্জিসহ ভাইরাসজনিত নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে শিশুরা। অন্তঃসত্ত্বা নারী ও শিশুদের এ ধূলাবালি থেকে আরও বেশি দূরে থাকা উচিত। এভাবে বায়ু দূষণ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে অকালমৃত্যুর হার বেড়ে যাবে।

পরিকল্পিত নগরায়নের মাধ্যমে শহরের মানুষ ও অন্যান্য শিল্প প্রতিষ্ঠান স্থাপন কমিয়ে এনে, পরিকল্পিতভাবে গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, ড্রেনেজ ও রাস্তার উন্নয়ন ও সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করার মাধ্যমে, সকল সংস্থার সমম্বয় এবং বায়ুশোধন যন্ত্রপাতি এটিপি (এয়ার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) ব্যবহার বাধ্যতামূলক করে আইন করলে চট্টগ্রাম নগর এলাকায় দূষণের পরিমাণ  উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব ।

 

মিনহাজুর রহমান শিহাব বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যায় পড়াশোনা করছেন।

imrulhasan30111999@gmail.com