সবুজ প্রযুক্তি: নতুন উদ্ভাবন আসবে আসবে নতুন পথ
সৈয়দ মূসা রেজা | Monday, 22 November 2021
পরিবেশ বাঁচাতে চাই কম কার্বন নির্গমনকারী ‘সবুজ প্রযুক্তি।’ আর সবুজ প্রযুক্তির জন্য চাই রেয়ার আর্থ এলিমেন্টস (আরইই) নামে পরিচিত খনিজ ধাতবসহ আরো কিছু ধাতব। তবে আরইই’র শ্রেণিতে রয়েছে মাত্র ১৭ টি ধাতব।
বহুল আলোচিত জলবায়ুর লক্ষ্যমাত্রা স্পর্শ করতে হলে দুনিয়ার দরকার পড়বে আরো নতুন নতুন খনি। এটা অস্বীকার করার জো নেই। ‘নেটজিরো’জ ডারটি সিক্রেটস’শীর্ষক প্রচ্ছদ কাহিনিতে ব্রিটিশ সাপ্তাহিক নিউ সায়েন্টিস্টয়ের ১৩ নভেম্বরের সংখ্যায় বিষয়টি তুলে ধরেছেন নিজস্ব প্রতিবেদক গ্রাহাম লটন। অবশ্য, একই সমস্যাকে গত বছর তুলে ধরেন ফরাসি পুরষ্কার-জয়ী সাংবাদিক এবং ফরাসি শীর্ষস্থানীয় টিভি চ্যানেলগুলোর জন্য তথ্যচিত্র নির্মাতা গিঁয়ো পিট্রোন। নিজের লেখা বই ‘রেয়ার মেটালস ওয়ার- ডার্ক সাইড অব দ্যা এনার্জি অ্যান্ড ডিজিটাল ট্রানজিশন’এ এই বিষয়ে আলোকপাত করেন পিট্রোন।
বইয়ের সূচনায় পিট্রোন বলেন, দৈনিক যে প্রযুক্তি ব্যবহার করছি তা হয়ত বদলে যাবে। কিন্তু আমাদের জ্বালানি ব্যবহারের প্রাথমিক প্রয়োজন কখনোই বদলাবেনা। দুনিয়াকে সবুজ করে তোলার প্রয়োজনে কয়লা এবং তেলের বদলে জ্বালানির কোন উৎসকে ব্যবহার করব সে কথার সঠিক জবাব হয়ত কারো জানা নেই।…অধিকতর টেকসই বিশ্বকে একান্ত ভাবেই নির্ভর করতে হচ্ছে রেয়াল মেটালস নামে পরিচিত খনিজ উপাদানের ওপর।
কিন্তু ইচ্ছে করলেই সবসময় এসব গুরুত্বপূর্ণ ধাতবখনি খোঁড়া যাবেনা। প্রচ্ছদ কাহিনিতে ব্রিটিশ সাপ্তাহিক নিউ সায়েন্টিস্ট আরো জানায়, সবুজ প্রযুক্তির জন্য অত্যাবশ্যকীয় ধাতবগুলোর খনি দুনিয়াতে হাতে গোণা কয়েকটি দেশে রয়েছে। বিশ্বের বেশিরভাগ কোবাল্টের খনি রয়েছে আফ্রিকার অস্থিতিশীল দেশ ডেমোক্রাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো বা ডিআরসিতে। ‘আপনা মাংসে হরিণা বৈরী’র পদে ফেলে বিচার করলে হয়ত দেশটির অস্থিতিশীলতার কারণ ও চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে। সে সময় কেউ কেউ গেয়ে উঠতে পারেন, উল্টে-পাল্টে দে মা, লুটে-পুটে খাই।
বেশিরভাগ লিথিয়াম রয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ বলিভিয়া ও চিলিতে। ব্যাটারিতে ব্যবহারের উপযুক্ত বা ব্যাটারি মানের নিকেল মিলবে ইন্দোনেশিয়ায়। আর ৬০ শতাংশ রেয়ার আর্থ উৎপাদিত হয় চীনে।
ভূরাজনৈতিক দিক থেকে এমনটি এক সাগর আশঙ্কার বার্তাই নিয়ে আসে। গুরুত্বপূর্ণ ধাতব উৎপাদনকারী দেশ গুলোর সঙ্গে কোনো বাণিজ্যিক বিরোধ দেখা দিলে কিংবা দেশগুলোতে প্রাকৃতিক বিপর্যয় নামলে এসব ধাতবের সরবরাহে সমস্যা ঘটবে। সাথে সাথে দামের পাগলা ঘোড়া ও ধাই ধাই করে ছুটবে। এসব কারণ সামনে রেখে আইএইএ মনে করে নানা উৎস থেকে এসব পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
নতুন নতুন মজুদ খুঁজে বের করার জন্য সরকারগুলোকে সময় নষ্ট না করেই নামতে হবে ভূতাত্ত্বিক জরিপে। এ জরিপ হতে হবে নিবিড়। তবে বর্তমানে বিরাজমান পরিস্থিতিতে সবুজ প্রযুক্তির ধারাবাহিকতায় লাভের অঙ্ক ফুলে ফেঁপে বড় আকার ধারণ করবে অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, চিলি, ডিআরসি, ইন্দোনেশিয়া, পেরু এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে।
সবুজ প্রযুক্তি পরিবেশের জন্য নতুন সংকট ডেকে আনবে না!
সবুজ প্রযুক্তি গ্রহণের জন্য আপাতত এক ধরণের তাড়নার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দুনিয়া। তবে এ তাড়না পরিবেশের নতুন সংকট ডেকে আনবেনা। এমনটাই বলছেন অনেকে।
জ্বালানি সংক্রান্ত চিন্তা আধার বা থিংক ট্যাংক কার্বন ট্র্যাকারের কিংসমিল বন্ড এ প্রসঙ্গে বলেন, “(জীবাশ্মর জ্বালানি থেকে সৃষ্ট যে) সমস্যা সমাধানের তৎপরতা চলছে সবুজ ধাতবের ব্যবহার বাড়লে সে ধরণের সমস্যা আবার দেখা দেবে না।”এরপর তিনি জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের একটা হিসাব দেন। তিনি জানান, “এখনকার জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে প্রতিবছর ১৩ বা ১৩০ কোটি টন জীবাশ্ম জ্বালানি তুলতে এবং প্রক্রিয়াকরণ করতে হয়। সমপরিমাণ সবুজ জ্বালানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ খনিজের পরিমাণ দাঁড়াবে চার কোটি ৩০ লাখ টন। অর্থাৎ পৃথিবীর প্রয়োজন পড়বে ৩০০ গুণ কম খনিজ ধাতবের।”তিনি জোর দিয়ে বলেন, এ কারণেই বলতে পারি, পরিবেশের ওপর এর প্রভাব পড়বে। তবে মাত্রা হবে অনেক কম।
গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন নিয়ে ও যুক্তি তুলে ধরেন আইইএ-র আরেক বিশেষজ্ঞ, জর্জ কামিয়া। একটা পেট্রোল-গাড়ি তার গোটা জীবনে যে পরিমাণ গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন করে তার অর্ধেক করে একটা বিদ্যুৎ-গাড়ি। বিদ্যুৎ-গাড়িতে যেসব খনিজ ধাতব,-লিথিয়াম, কোবাল্ট এবং ব্যাটারির নিকেল, ব্যবহার হয় সেগুলো আহরণের সঙ্গে জড়িত গ্রিন হাউস গ্যাসের হিসাব ও এর মধ্যে ধরা হয়েছে, জানান তিনি।
বারবার ব্যবহারে বাড়বে সুফল
শুধু তাই না। ব্যাটারি যদি নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ দিয়ে রিচার্জ করা হয় তবে এই গ্রিন হাউস গ্যাসের পরিমাণ আরো অর্ধেকে নামবে। জীবাশ্ম জ্বালানি একবার ব্যবহার করলেই পুড়ে শেষ। কিন্তু সবুজ প্রযুক্তিতে ব্যবহৃত খনিজ একাধিক বার ব্যবহারের সুবর্ণ সুযোগ থাকছে। কখনো কখনো শত শত বার ও ব্যবহারের অবকাশ থাকছে। বাতিল গাড়ির ব্যাটারি বারবার ব্যবহার করা হলে খনি খোঁড়ার প্রয়োজন ও কমে আসতে থাকবে।
অবশ্য, পুন ব্যবহারের চল এখনও আছে। তবে ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম বা তামার মতো ধাতুর বেলায় একথা খাটে। কিন্তু লিথিয়াম বা রেয়ার আর্থ এলিমেন্টসের ক্ষেত্রে এখনো শুরু হয়নি তেমন চল। আইএইএ’র বিশেষজ্ঞ জন টিম গোল্ড বলেন, মানুষকে এ অভ্যাস বদলাতে হবে।
অভ্যাস কতোটা বদলাতে হবে তার ও হিসাব দিয়েছে আইএইএ। এই হিসাবে বলা হয়েছে, ২০৩০ থেকে ২০৪০’এর মধ্যে সরবরাহচক্রে - তামা, কোবাল্ট, নিকেল এবং লিথিয়ামের মতো ধাতবের ক্ষেত্রে- পুন ব্যবহার যোগ্যের পরিমাণ প্রতিবছর এক লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ১২ লাখ টন করতে হবে। অর্থাৎ মোট চাহিদার ১০ শতাংশের যোগান এভাবে আসতে হবে। আর এমনটা করা গেলেই পুনব্যবহারের কাজটি আর্থিকভাবে লাভজনক পর্যায়ে যাবে।
এছাড়া, নতুন নতুন আবিষ্কারের ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে। তাতে নতুন পথ খুলে যাবে। ফটোভোলটাইক্স বা আলোকবিদ্যুৎ কোষের চাহিদা বাড়ার সাথে সাথে এ বিষয়টি ঘটেছে। এসব কোষের চাহিদার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ে রূপা ও সিলিকনের চাহিদা ও। কিন্তু চাহিদা সামাল দেওয়ার প্রযুক্তি বের করেন নির্মাতারা। আগের তুলনায় কম রূপা ও সিলিকন দিয়ে সৌর-তক্তা বা সোলার প্যানেল তৈরি করতে থাকেন তারা। একই ঘটনা রেয়ার আর্থ এলিমেন্টসেও ঘটবে। এ গোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা মাত্র ১৭ এবং এসব খনিজ ধাতবের একের সঙ্গে অনেকের মিল আছে।
এছাড়া, পুরো মাটি না খুঁজে আকরিক বের করে আনার কথা ও ভাবা হচ্ছে। বর্তমানে এ পদ্ধতিই উরেনিয়ামের উত্তোলনের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হচ্ছে। অন্যান্য ধাতবের বেলায় ও এ পদ্ধতি কাজে লাগান যেতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার পার্থ বিশ্ববিদ্যালয় এ পদ্ধতিতে তামা আহরণ নিয়ে কাজ করছে।
এ পদ্ধতি সফল হলে কেবল দূষণই কমবে না, রক্ষা পাবে জীব বৈচিত্র্য।
আরো পড়ুন: ‘দারোয়ান’-কে নিয়ে চিন্তায় পড়েছেন পরিবেশ বাদীরা!