logo

শ্রীহট্টে দিবাভ্রমণ                

শুভদীপ বিশ্বাস   | Thursday, 26 August 2021


এই কোভিডকালীন বিশাল লকডাউনের পর দু-চারজন বন্ধুবান্ধব মিলে ঘুরতে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে? অথচ সপ্তাহশেষের দিনটি ছাড়া ঘোরার তেমন কোনো অবকাশ নেই? চিন্তার কিছু নেই, বিশাল বড়সড় কোনো ট্যুর দিতে না পারলেও যদি দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মত করে একটা একদিনের, বা হালের ভাষায় ‘ডে ট্যুর’ দিতে চান, তবে সিলেট হতে পারে আপনার ঘোরার জন্য পয়সা উসুল করে দেয়ার মতো একটি জায়গা। চলুন তাহলে, সিলেটে একদিনে ঘোরার জন্য ছোট্টখাট্টো একটা পরিকল্পনা দেখে নিই।

ঢাকা থেকে সিলেট আসার জন্য আপনি হানিফ, শ্যামলী, মামুন, ইউনিক ইত্যাদি নানান বাস পাবেন সায়েদাবাদে। এছাড়াও, ঢাকার অনেকগুলো জায়গাতেই বাসগুলোর কাউন্টার আছে। ট্যুরের আগের রাতে দেখেশুনে একটা বাস পছন্দ করে বারোটা-সাড়ে বারোটার টিকিট করে উঠে পড়লেই হলো, কারণ সব বাসের ভাড়াই প্রায় কাছাকাছিই হবে।

আপনি সিলেট এসে নামবেন কদমতলী বাস টার্মিনালে, তখন একদম কাকডাকা ভোর, প্রায় ছ’ঘণ্টা বাসভ্রমণের পর অত্যাবশ্যকীয়ভাবেই আপনার পেট ক্ষিদেয় চোঁ চোঁ করছে। সেক্ষেত্রে আপনার উচিত হবে একখানা সিএনজিচালিত বাহন রিজার্ভ করে সিলেট শহরের জিন্দাবাজারের স্বনামধন্য পাঁচভাই  রেস্টুরেন্টে গিয়ে পছন্দমতো খাবার খেয়ে নেয়া, যেহেতু সামনে বিশাল একটি দিন আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।

খাওয়া শেষ হলে এবার রওনা দেয়া যাক ভ্রমণ-গন্তব্যগুলোর উদ্দেশে। সিলেট শহরের বাইরে ঘোরার মত অনেকগুলো জায়গাই আছে; জাফলং, বিছানাকান্দি, ভোলাগঞ্জ, রাতারগুল, লালাখাল ইত্যাদি। কাজেই, সবচেয়ে ভালো হয় সেই জায়গাগুলো যদি আগে ঘুরে আসা যায়। যদি আপনার দলটিতে চার-পাঁচজন মানুষ থাকে, তাহলে আপনি নিঃসংকোচে ১৫০০-১৮০০ টাকা দিয়ে জায়গাগুলোতে সারাদিন ঘোরার জন্য একটি সিএনজি রিজার্ভ করে নিতে পারেন।

এবার, প্রথমে ট্যুরিস্ট স্পটগুলোর একটু করে বর্ণনা দেয়া যাক। যেহেতু পাহাড় নিয়ে বাঙালির বেশ ভালোরকম একটা মুগ্ধতা কাজ করে, পাহাড় থাকা জায়গাগুলোর কথাই বলা যাক। পাহাড় দেখার জন্য আপনি যেতে পারেন জাফলং, বিছানাকান্দি কিংবা ভোলাগঞ্জে। তিনটিকেই মূলত মোটামুটি একই শ্রেণিতে ফেলা যায়। তিনটি জায়গাতেই পাহাড় আছে, নদী আছে, প্রচণ্ড গরমে নদীতে অবগাহনের সুযোগ আছে, আছে চোখধাঁধানো সব দৃশ্য। এদিক থেকে জাফলংয়ে দেখার মতো জায়গা কিছু বেশি, মূল জাফলং স্পটের আশেপাশেই আপনি সংগ্রামপুঞ্জি ঝর্ণা, মায়াবী ঝর্ণা ইত্যাদি জায়গা দেখে আসার সুযোগ পাবেন। সেদিক থেকে বিছানাকান্দি আর ভোলাগঞ্জ দুটোই মোটামুটি একইরকম, তবে বিশেষ করে ভোলাগঞ্জের পানি, রঙবেরঙের পাথর আর পাহাড়ের দৃশ্য পুরো জায়গাটিতে একটি আলাদা আবেদন এনে দিয়েছে।

আছে লালাখাল এবং রাতারগুল, দু’টিতেই আপনাকে মূলত নৌকাভ্রমণই করতে হবে, কিন্তু একটি আরেকটির সম্পূর্ণ বিপরীত। লালাখালের নামটিতে একটা লাল লাল ভাব থাকলেও এই জায়গাটি প্রসিদ্ধ কাকচক্ষু নীল পানির জন্য। তাছাড়া নৌকাভ্রমণের সময় বহুদূরের জেগে থাকা আবছা পাহাড়গুলো এক অপূর্ব নৈসর্গিক দৃশ্যের মুখোমুখি দাঁড়া করিয়ে দেয়!

আর রাতারগুল হচ্ছে জলাভূমির বন, বা সোয়াম্প ফরেস্ট। বর্ষাতেই এর রূপ খেলে বেশি। নৌকায় করে ঘন বনের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় এই অপরূপ বনটির নিরবচ্ছিন্ন নীরবতায় আপনি মুগ্ধ হতে বাধ্য!

সমস্যা হচ্ছে, উপরোক্ত পাঁচটি জায়গাই আপনি একদিনে ঘুরে শেষ করতে পারবেন না, যদি ধীরেসুস্থে জায়গাগুলোর সৌন্দর্য উপভোগ করাটাই আপনার উদ্দেশ্য হয়। সেক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো হয় পাঁচটির মধ্যে যেকোনো দু’টি জায়গা ঘুরে আসার পরিকল্পনা নিয়ে রওনা হলে। যেহেতু জাফলং, বিছানাকান্দি, ভোলাগঞ্জ তিনটিই মোটামুটি একইরকম জায়গা, আপনি এদের মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে পারেন। আর, সাথে লালাখাল বা রাতারগুলের মধ্যে যেকোনো একটি, সেটা নির্ভর করে, আপনি নীল পানি বেশি পছন্দ করেন, নাকি জলাশয়ের মধ্যে রহস্যময় ঘন বন!

মনস্থির করতে না পারলে আপনি চাইলে নিচের জোড়াগুলোর মধ্যে থেকে যেকোনো একটি বেছে নিতে পারেন-

১। জাফলং-লালাখাল

২। বিছানাকান্দি-রাতারগুল (সবচেয়ে কম সময়ে ঘুরে আসার মতো)

৩। জাফলং-রাতারগুল

৪। লালাখাল-বিছানাকান্দি

৫। লালাখাল-ভোলাগঞ্জ

৬। ভোলাগঞ্জ-রাতারগুল

ধীরে-সুস্থে ইচ্ছেমতো দুটি অপার্থিব সুন্দর স্থান ঘুরে এসে বিকেলবেলা ফেরার সময় সিলেটে ঢোকার আগে আপনাকে অবশ্যই দেখে আসতে হবে সিলেটের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ, চা বাগান! হ্যাঁ, সিলেটে ঢোকার মুখেই আছে দু’টি সুন্দর চা-বাগান, লাক্কাতুরা এবং মালনীছড়া। লাক্কাতুরা চা বাগানের পাশেই আবার সিলেট ক্রিকেট স্টেডিয়ামটি অবস্থিত।

চা বাগানের অবারিত সবুজের মধ্যে কিছুক্ষণ কাটিয়ে আসার পর সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় শহরে ফেরত এসে ঘুরে আসতে পারেন হযরত শাহজালাল (রঃ) এর কিংবদন্তি মাজারে, নিজেকে কিছুক্ষণ আধ্যাত্মিকতার মায়াজালে ডুবিয়ে রাখার জন্য।

মাজার ভ্রমণ শেষে আপনজনদের জন্য কেনাকাটা করতে চাইলে মাজারের সামনে থেকেই তা সেরে নিতে পারেন।

এবার ফেরার পালা। আপনি যদি ভোরে ভোরে ঢাকায় পৌঁছাতে চান, তবে রাত বারোটা-সাড়ে বারোটার টিকিট কাটাই সমীচীন হবে। সেক্ষেত্রে, মাজারের সামনেই অনেকগুলি টিকিট কাউন্টার আছে, সেখানেই আপনি নির্দিষ্ট বাসের টিকিট পেয়ে যাবেন।

বাসে ওঠার আগের সময়টুকু কাটাতে পারেন শহর ঘুরে, ছোট্ট এই শহরটি খুব কম মায়াবী নয় কিন্তু। কে জানে, সবকিছুর শেষে রাতের বাসটা যখন একটু একটু করে সিলেট ছাড়তে শুরু করবে, আপনার বুক থেকে ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলেও আসতে পারে!

শুভদীপ বিশ্বাস বর্তমানে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ, তৃতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছেন। 

shuvodipbiswasturja1999@gmail.com