শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের সৌন্দর্য
মো. মোতাহার হোসেন | Wednesday, 9 June 2021
আমাদের পারিবারিক, সামাজিক ও ধর্মীয় - সবদিক বিবেচনায়ই শিক্ষার্থীর কাছে শিক্ষক অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। মা-বাবার কোনো কথা যদি ছেলে-মেয়েরা খুব সহজেই অগ্রাহ্য করে, তবু শিক্ষক বলামাত্রই সে একেবারে মন্ত্রমুগ্ধের মতো কথাটা মেনে নিচ্ছে। শিক্ষার্থীদের উপর শিক্ষকের এই প্রভাব চিরন্তন। তবে স্থান, কাল ও পাত্রভেদে এর রকমফের হতে পারে। যে শিক্ষক তাঁর গুণ, মমতা, আর ভালবাসা দিয়ে শিক্ষার্থীদের মনকে নাড়া দিতে পারেন, তাঁর পক্ষে শিক্ষার্থীকে প্রভাবিত করে স্বপ্নের ঠিকানা দেখানো সম্ভব। যে শিক্ষকরা স্বভাবজাতভাবেই এমন, শিক্ষার্থীরা তাঁকে অত্যন্ত আপনজন মনে করে এবং নিজস্ব লক্ষ্যে পৌঁছে যেতে সেই শিক্ষকদের উপদেশ গ্রহণ করে।
শুধু সম্মান নয়, উদারতার দিক দিয়েও যেন শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের চেয়ে এগিয়ে যায়। ব্যক্তিগতভাবে আমি আমার শিক্ষার্থীদের উদারতার কাছে হেরে গেছি বহুবার। আমার ডাক্তার শিক্ষার্থীদের কাছে চিকিৎসার জন্য গেলে তারা এমন যত্নসহকারে আমার চিকিৎসা করে, আমি আশ্চর্য হয়ে যাই। কখনো বিব্রতবোধও করি। ভাবি, আমি তো স্কুলে ওকে এত সুন্দরভাবে, যত্ন নিয়ে পড়াইনি! আমারও তো সুযোগ ছিল ওর মতো শিক্ষার্থীদেরকে আরও ভালোভাবে পড়ানোর। তা তো আমি করিনি। নিজের কাছে নিজেকেই ক্ষুদ্র মনে হয় তখন। ডাক্তারদের কথা শুধু নয়, সকল শিক্ষার্থীদের কাছ থেকেই অধিকাংশ সময় আশাতীত সুন্দর আচরণ পাই। আমার যে ছাত্র বাসস্ট্যান্ডের টিকিট মাস্টার, সেও তো দৌড়ে আসে, আমাকে একটা ভালো সিট পাইয়ে দেয়ার জন্য। যে শিক্ষার্থী প্রশাসক, যে পুলিশ অফিসার; এককথায় যে যেখানে আছে, সবার কাছ থেকেই আমরা ‘ভিআইপি’ মর্যাদা পেয়ে থাকি।
কিন্তু আমরা কি আমাদের শিক্ষার্থীদের জন্য তেমন বিশেষ কিছু আদতে করতে পারি? আমাদের আরও কিছু করার আছে। ক্লাসের জন্য ভালো করে পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে, প্রয়োজনে বিভিন্ন শিক্ষার্থীদের মেধা, মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে কিছুটা গবেষণা করে সে অনুযায়ী পাঠ সাজিয়ে যদি ক্লাসটা নিতে পারি, তবে আমাদের শিক্ষার্থীরা ক্লাসে আরো আকৃষ্ট ও উপকৃত হবে। কাজটা একেবারে সহজ নয়। কিন্তু উন্নত দেশের ‘এলিট’ ক্লাবে আমরা যেহেতু ঢুকতেই চাচ্ছি, আমাদের শিক্ষার মানও তো উন্নত করার চেষ্টা করতে হবে।
ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশ, ওশেনিয়ার অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড, এশিয়ার জাপান ও চীন তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমন সুন্দরভাবে সাজিয়েছে যে সেখানকার শিক্ষার্থীরা অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে মানসম্পন্ন শিক্ষা পাচ্ছে। এমনকি আমাদের খুব কাছের দেশ ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ভারতও তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সে তুলনায় আমরা এখনও বেশ পিছিয়ে রয়েছি। আমাদের সরকারও প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্নভাবে ভালো একটা শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য। বিভিন্ন রকম ডিজিটাল প্রযুক্তি সরবরাহসহ এগুলো ব্যবহারের জন্য দেশ বিদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। তবে সকল প্রচেষ্টার সফলতা নির্ভর করবে শিক্ষকদের সক্রিয় ভূমিকার উপর। আমরা প্রশিক্ষণের পর প্রশিক্ষণ নিলাম, আর বাস্তবে কর্মক্ষেত্রে তা জোরালোভাবে কাজে লাগালাম না- তাতে লাভের আশায় গুড়েবালি।
তবে উন্নত দেশের শিক্ষকদের পেশাগত জীবনের মতো আমাদের দেশের শিক্ষকদের পেশাগত জীবন এত মসৃণ নয়, সেকথাও আমাদের মনে রাখতে হবে। আমাদের সম্মুখীন হতে হয় অনেক প্রতিকূলতার। সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকের শত শত পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য, শিক্ষকদের আছে টাইম স্কেল বা সিলেকশন গ্রেড সংক্রান্ত জটিলতা, আছে পদোন্নয়নের দীর্ঘসূত্রিতা। এখানকার অধিকাংশ সহকারী শিক্ষককে সারাজীবন একই পদে শিক্ষকতা করে কোনো পদোন্নতি ছাড়াই অবসরে যেতে হয়। এর চেয়ে বড় হতাশার বিষয় আর কী হতে পারে?
এছাড়া, অনেক স্কুলে বছরের পর বছর প্রধান শিক্ষকের পদটি খালি পড়ে আছে। একজন সহকারী প্রধান শিক্ষক বা সহকারী শিক্ষক স্কুলের দায়িত্ব পালন করেন। তাদের এ পদে থেকেই অবসরে যেতে হয়। খুব কম ভাগ্যবানই আছেন, যাঁরা শেষমেশ প্রধান শিক্ষক হতে পারেন। চাকরি জীবনের শেষপ্রান্তে এসে পদোন্নতি পাওয়ায় তাঁদেরকেও কম দিনের মধ্যেই অবসরে চলে যেতে হয়। এ অবস্থার অবসান হওয়া জরুরি। তা নাহলে শিক্ষকদের মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততা আর আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করার মানসিকতা আশা করাটা বাস্তবসম্মত হবে না।
আশার কথা হলো, উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এসব জটিলতা নিরসনে ইতোমধ্যেই কাজ শুরু করেছেন। সহকারী শিক্ষক পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করে স্কুলগুলোতে শূন্যপদ পূরণের বিষয়টি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সহকারী শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকদের পদোন্নয়নের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে। আমি নিশ্চিত, এসব জটিলতার অবসান হলে সরকারি মাধ্যমিকে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে, যা সার্বিক পরিবেশকে অধিকতর শিক্ষাবান্ধব করার মাধ্যমে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়ে নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। শিক্ষার পরিবেশকে স্বতঃস্ফূর্ত করতে হলে, শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ উপকার করতে চাইলে সবকিছুর আগে শিক্ষকদেরকে হতাশামুক্ত করতে হবে। তখন তারা সব পিছুটান ভুলে শিক্ষার্থীদের দিকে সর্বোচ্চ মনযোগ দিতে পারবেন। আর শিক্ষার্থীরাও তখন শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ পেয়ে শিক্ষাগ্রহণে অধিকতর মনযোগী হওয়ার সুযোগ পাবে।
যাই হোক, উন্নত দেশগুলোতে শিক্ষার পরিবেশটা ভিন্ন। সেখানে শিক্ষার্থী-শিক্ষক সম্পর্ক শুধু আবেগের উপর নির্ভর করে না। সেসব দেশে এটা পেশাদারিত্বের বিষয়। শিক্ষাব্যবস্থাটা সেখানে এমনভাবেই সাজানো, যে একজন শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদের জন্য সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে কাজ করতে বাধ্য।
২০১০ সালে আমেরিকায় টিইএ পোগ্রামে প্রশিক্ষণ নেবার সময় আমাকে নেব্রাস্কা স্টেটের লিংকন শহরের নর্থ স্টার হাইস্কুলে দু’ সপ্তাহ কাজ করতে হয়েছিল। সেখানে স্কট ফ্রিজেন নামে এক শিক্ষকের সাথে আমি নবম শ্রেণির পাঠদানে অংশ নিতাম। পড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে আমরা শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষার্থী, সমাজব্যবস্থা, পরিবেশ ইত্যাদি নানান বিষয়ে আলাপ করতাম। তাকে একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম, ঠিকমতো কাজ না করার কারণে কোনো শিক্ষকের চাকরি চলে যায় কি না। তিনি বলেছিলেন, “কখনও কারও চাকরি যায় না।” আমি খুব অবাক হয়েছিলাম। এরপর তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করলেন, “যেহেতু সবাই জানে ভালোভাবে কাজ না করলে চাকরি হারাতে হতে পারে, তাই সবাই যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করতে চেষ্টা করেন।” আর তাই চাকরিও হারাতে হয় না। পেশাদারিত্বের বিষয়টি বোধহয় এমনই।
আমেরিকায় শিক্ষার্থীদেরকে সহযোগিতার উদাহরণস্বরূপ একটি ঘটনার কথা বলা যাক। একদিন নবম শ্রেণির ক্লাস টেস্ট নেবার সময় জন নামের এক শিক্ষার্থী বেঁকে বসল। সে কোনোমতেই পরীক্ষা দেবে না। অথচ ক্লাস টেস্টের নম্বর যোগ হবে মূল পরীক্ষার নম্বরের সাথে। স্কট সাহেব জনকে রাজি করাতে ব্যর্থ হয়ে কাউন্সেলরের সাহায্য চাইলেন। কাউন্সেলর ভদ্রমহিলা ক্লাসরুমে এসে জনের একবারে পায়ের কাছে বসে অত্যন্ত অনুনয়ের সাথে বুঝিয়ে-শুনিয়ে অবশেষে তাকে পরীক্ষা দিতে রাজি করাতে পারলেন। জন পরীক্ষা দিল। আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের প্রতি আমরা কি এমন সহানুভূতিশীল আচরণ করতে পারি না?
সময়ের সাথে আমাদের দেশেও শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের আচরণের অনেক পরিবর্তন এসেছে। এখন শিক্ষার্থীদের মনস্তাত্ত্বিক দিকটি বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়। তাদেরকে মারধোর করা, বকাঝকা করা, তাদের উপর চড়াও হওয়ার মতো ঘটনা কমে এসেছে।
বৈশ্বিক মহামারী করোনার কারণে সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও পাঠদান কার্যক্রম চরমভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। কখন আমরা স্বাভাবিক পাঠদান কার্যক্রমে ফিরে যেতে পারবে, জানি না। কিন্তু এ লেখাটি লিখতে গিয়ে আমাকে কিছুটা নস্টালজিয়ায় তো পেয়েই বসেছে। মনে হচ্ছে আমি যেন দাঁড়িয়ে আছি একটি ক্লাসরুমে। যেখানে আমার সামনে উদগ্রীব হয়ে বসে আছে কিশোর বয়সী অনেক শিক্ষার্থী। তাদের চোখেমুখে স্বপ্নের হাতছানি। সারাজীবন আমি এমন জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীদের আশা কতটুকু পূরণ করতে পেরেছি? নাকি, কিছুই পারিনি? শিক্ষক হিসেবে আমি সবসময়ই অতৃপ্ত থেকেছি। কখনও মনে হয়নি যে, সর্বোত্তম ক্লাসটা আমি নিতে পেরেছি। বরং সবসময়ই মনে হয়েছে, আরও সুন্দর করে যদি পাঠদান করতে পারতাম, তবে কতই না ভালো হতো!
শিক্ষকতা শুধুমাত্র একটা চাকরি বা সাধারণ পেশা নয়। এটা একটা মহান ব্রত। একটা ছোট দিয়াশলাই দিয়ে যেমন বিশাল বড় আগুন জালানো সম্ভব, তেমনি নিজের প্রজ্ঞা, মননশীলতা ও সৃজনশীলতা দিয়ে শিক্ষার্থীর সুপ্ত প্রতিভাকে খুঁজে বের করে সেটাকে জাগিয়ে তোলে ও পরিচর্যা করে মহীরূহে পরিণত করাও শিক্ষকের পক্ষে সম্ভব। এই কাজটি যে শিক্ষক যত সুচারুভাবে করতে পারেন, তিনিই সফল হন। আর শিক্ষার্থীর সাথে তাঁর আত্মিক সম্পর্কও তত দৃঢ় হয়।
আমরা কিন্তু সবসময় সেসব শিক্ষার্থীর কথাই উল্লেখ করে থাকি, যারা সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু যে শিক্ষার্থী জীবনযুদ্ধে জিততে পারেনি, রিকশা, অটো বা সিএনজি চালায়, সে কি আমার শিক্ষার্থী না? তারও তো স্বপ্ন ছিল একটা সুন্দর জীবনের। হয়তো পারেনি। তাতে কী? সেওতো আমারই ছাত্র। আমি আমার সকল ছাত্রের মতো তারও কল্যাণ ও শান্তি চাই। কেউ কষ্টে আছে, একথাটা যেন শুনতে না হয়।
গরীব, ধনী, ছোট, বড় সকল শিক্ষার্থীই আমার অহংকার। যে যেখানেই আছে, সবার অন্তরের সুখটা যেন থাকে। রব্বুল আলামিন মহান আল্লাহ তা’ লার কাছে আমার এটুকুই চাওয়া।
মো. মোতাহার হোসেন নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক।