শত লাখ কোটি ডলার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিচার
মার্ক কারনেই | Sunday, 31 October 2021
অর্থায়নের বিনিময়ে আমরা সেবা নেই। এটি আমাদের লক্ষ্য অর্জনের শক্তি। বাড়ি কেনা, সন্তানের শিক্ষার খরচ জোটানো, ব্যবসার পরিধি বাড়ানো কিংবা অবসর জীবনের সঞ্চয় – এ সব সেবাই এনে দেয় অর্থায়ন তথা অর্থনীতি। বৃহৎ পরিসরে সেবার এ সব ভূমিকা পালনে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মূল শক্তি কঠিন সংখ্যা। আমানত এবং ঋণ, লাভ এবং ক্ষতি, বিনিয়োগের ওপর লভ্যাংশ এবং ঝুঁকি গ্রহণের মূল্যের মতো সংখ্যার ওপরই ভর করে চলে তাদের কাজ।
জলবায়ু পরিবর্তনের ছুঁড়ে দেওয়া বিশাল হুমকির মুখে দাঁড়িয়ে দুনিয়ার মানুষ একযোগে টেকসই বিশ্বের দাবিতে সোচ্চার। জলবায়ু পরিবর্তন রোধের প্রয়াসে ১৯২ সরকার তাদের বিমূর্ত লক্ষ্যকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের কাঠামোতে সাজিয়েছে। বৈশ্বিক তাপবৃদ্ধিকে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা দেড় ডিগ্রি অর্থাৎ বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে প্রাক-শিল্পায়ন যুগের মাত্রায় বেঁধে দিতে চাইছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন প্রতিরোধের এই নজিরহীন অভিযানেও দিকনির্দেশনা দিচ্ছে সংখ্যা। দেড় ডিগ্রির যাত্রাপথকে সুগম করতে চাইলে, ভাগ্য নির্ধারণী গুরুত্বের গোটা দশক জুড়ে কার্বন নির্গমন প্রতি বছর ৭.৬ শতাংশ হারে কমাতে হবে।
তাহলে এখন মানব জাতি কোন অবস্থানে রয়েছে? ইতালির অংশীদারিত্বে যুক্তরাজ্য গত বছর কপ২৬’এর সভাপতিত্বের দায়িত্ব গ্রহণ করেছে। শূন্য নির্গমনের অঙ্গীকারাবদ্ধ দেশগুলো বিশ্বের মোট নিঃসরণ এক-চতুর্থাংশ থেকে বৃদ্ধি করে চার-পঞ্চমাংশ নিয়ে আসতে সম্মত হয়েছে। সাফল্যের মাপকাঠিতে একে বিশাল বলা ছাড়া বিকল্প নেই। তবে বাস্তবতার নিরিখে এখনো পর্যাপ্ত হওয়ার ধারে কাছেও যায়নি। সংখ্যার হিসাবে সাফল্যের ছোঁয়া পেতে হলে এখন একান্ত ভাবেই যা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে তা হলো বিশ্বের সরকারগুলোর উচ্চাভিলাষী জলবায়ু নীতিমালা আঁকড়ে এগিয়ে যাওয়া। কোম্পানিগুলোকে আগ্রাসী কর্ম তৎপরতা গ্রহণ করতে হবে। মূলধারার অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা থেকে বিশাল অংকের অর্থনৈতিক সহায়তার ঢালাও সহায়তার স্রোত বইয়ে দিতে হবে।

মার্ক কারনেই
এ সব লক্ষ্য অর্জনে কপের বেসরকারি অর্থায়ন কৌশলের ক্ষেত্রে ২৪টি প্রধান উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর ভিত্তিতে এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে যেখানে অর্থায়নের প্রতিটি সিদ্ধান্ত জলবায়ু পরিবর্তনের কষ্টি পাথরে যাচাই করে নেওয়া হবে। এ তৎপরতাকে বাড়তি এবং অতিমাত্রায় সক্ষমতা যোগাতে জাতিসংঘ এবং কপ২৬ সভাপতিত্ব উভয়ে সম্মিলিত ভাবে এবারে তৈরি করেছে গ্লাসগো ফাইনান্সিয়াল অ্যালায়েন্স নেট জিরো (জিএফএএনজেড)। প্রতি মহাদেশের প্রতিটি আর্থিক খাতের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী সংস্থাগুলোকে একত্রিত করেছে জিএফএএনজেড।
তবে এটি টেকসই ব্যবস্থার প্রতি আরেকটি অস্পষ্ট অঙ্গীকার নয়। ইচ্ছা বা কামনা যতই জোরাল হোক না কেন, সবুজ কোনো বোতম চেপে রাতারাতি শূন্য নির্গমন পেতে পারবো না আমরা। সবজায়গায় পরিবেশ বান্ধব বা অনুকূল তৎপরতা গড়ায় মানবজাতির পুরো অর্থনীতিকে নতুন করে লিখতে, সাজাতে ও খাতবদ্ধ করতে এবং নব নব প্রক্রিয়ায় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। পরিবেশ, সামাজিক এবং শাসন (ইএসজি)’এর মানদণ্ডে নিজেদের তৎপরতাকে বিচার করতে চায় না জিএফএএনজেড সদস্যরা। বরং আর্থিক তৎপরতাকে শূন্য নির্গমনে রূপান্তরের পথে সংখ্যার কঠোর শৃঙ্খলে আবদ্ধ পথ অনুসরণ করতে আগ্রহী তারা। সর্বশেষ ২০৫০ সালের মধ্যে আর্থিক খাতকে পুরোপুরি শূন্য নির্গমনের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকারই কেবল দেয়নি তারা, বরং দেড় ডিগ্রি উষ্ণায়নের মাত্রা অর্জন করতে ২০৩০-এর ভেতর গ্রিনহাউন গ্যাসের নিঃসরণ ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রার ন্যায়ভিত্তিক অংশীদারও হয়েছে । নির্গমন কমানোর বিস্তারিত পরিকল্পনা করছে। প্রতিবছর বিনিয়োগকারী এবং ঋণগ্রহীতা কোম্পানিগুলোর নির্গমন সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। যথার্থ টেকসই ব্যবস্থার জন্য নিরেট সুনির্দিষ্ট সন্দেহাতীত সংখ্যামালা একেই বলে।
এসব কিছুর সমষ্টি হলো, এমন এক আর্থিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা যা শূন্য নির্গমনের ওপর পুরোপুরি মনোযোগ দেয়। ফলে, কোম্পানি এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য সেরা-কর্ম অনুশীলন, বিজ্ঞানভিত্তিক রূপান্তর পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট রূপ-কাঠামো তুলে ধরতে হবে। এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শেয়ার এবং বিনিয়োগসহ সব কিছু মূল্যায়নের সুবিশাল তৎপরতা, মজুদ সম্পদের ব্যবহার হ্রাস করা এবং স্বচ্ছতা এবং দায়িত্বশীলতা। এই সম্পদ ব্যবহার হ্রাসের প্রভাব পড়তে পারে মজুদ কয়লার চার পঞ্চমাংশের ওপর। তেল ও গ্যাসের নিশ্চিত মজুদের আধাআধির ওপর।
আবার এর অর্থ দাঁড়াচ্ছে, বিকাশমান এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর বিকার্বনীকরণ বা কার্বন কমানোর জন্য ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন বা লাখ লাখ কোটি ডলারের পুঁজি বিনিয়োগ। অকল্পনীয় একটি সংখ্যা। এর আগে কেউ এ খাতে এমন বিপুল সংখ্যার কথা কল্পনা করতেও পারেননি। কিন্তু, এ ছাড়া টেকসই ব্যবস্থা অধরাই থেকে যাবে। জিএফএএনজেডের অঢেল সস্পদরাশিকে বিবেচনায় নিয়ে নতুন এক বৈপ্লবিক পদ্ধতি গ্রহণ সম্ভব। এতে উদীয়মান বাজার এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে বেসরকারি পুঁজি বিনিয়োগের পদ্ধতি তৈরি করা যাবে।
বিশেষ করে, প্রতি জাতিকে নির্গমন হ্রাসের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হবে এবং কয়লা ও অন্যান্য জীবাশ্ম জ্বালানি পর্যায়ে ক্রমে বন্ধ করতে হবে। এ লক্ষ্যে সরকারি এবং বেসরকারি আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার একযোগে দেওয়ার জন্য একটি দেশভিত্তিক মঞ্চের একান্ত প্রয়োজন রয়েছে।
আজ থেকে শুরু হতে যাওয়া গ্লাসগো বৈঠকে এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতি মিল রেখে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব এবং অর্থনৈতিক অঙ্গীকারমালা গ্রহণের প্রত্যাশা করা হচ্ছে। তবে একটি কথা সবার স্মরণে রাখতে হবে যে দ্রুত প্রতি বছর যদি ১০০ বিলিয়ন বা ১০ হাজার কোটি ডলারের কম প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায় তবে তাকে কাঙ্ক্ষিত সংখ্যা হিসেবে গণ্য করা হবে না। এ সংখ্যার দ্বারা জলবায়ু পরিবর্তন করা যাবে না।
সবুজ বা পরিবেশবান্ধব জীবনধারায় রূপান্তরের অনিবার্য পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে একটি কথাকেই আজ গুরুত্বের করে তুলেছে। সে কথাটি হলো, অর্থনীতি কখনোই ‘নিঃসঙ্গ শেরপা’ হয়ে কাজ করতে পারে না। দুনিয়ার সরকারগুলো শূন্য নির্গমন বা নেট জিরোর যে অঙ্গীকার করেছে এবারে তাকে বাস্তবায়নের স্পষ্ট, নির্ভরযোগ্য এবং সুনির্দিষ্ট কর্মসূচিতে তুলে নিতে হবে। জলবায়ুর পরিবর্তন ঠেকাতে পৃথিবীর সরকাররা জোট বেঁধেছে। এর মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে যে বাস্তবতা তা হলো, মানুষ যে নীতিমালাকে একান্ত প্রয়োজনীয় মনে করেছে তার ভিত্তিতেই জোটবদ্ধ হয়েছে।
এতে রয়েছে, কার্বন সংক্রান্ত মূল্য নির্ধারণ, অন্তঃদহন যান নিষিদ্ধকরণ, জীবাশ্ম জ্বালানিকে দেওয়া ভর্তুকি পর্যায় ক্রমে তুলে নেওয়ার জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা এবং পরিবেশ সংক্রান্ত আর্থিক বিষয়াদি বাধ্যতামূলক ভাবে প্রকাশ করা। যত বেশি এসব বাস্তবায়িত হবে তত বেশি আর্থিক প্রাথমিক বিনিয়োগের নিশ্চয়তা ও আত্মবিশ্বাস থাকবে। ফলে শূন্য কার্বন নিঃসরণের যাত্রার পথকে মসৃণ করবে। প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানকে উর্ধ্বমুখী এবং নির্গমনকে নিম্নমুখী হতে সাহায্য করবে।
এ সব কিছুই আমাদের দৃষ্টিকে নিয়ে যাচ্ছে চূড়ান্ত নিরেট সুনির্দিষ্ট সন্দেহাতীত সংখ্যা ১০০ ট্রিলিয়নে বা শত লাখ কোটি ডলারে। টেকসই জ্বালানি খাতকে কার্যকর করতে আগামী তিন দশকে ন্যূনতম প্রয়োজনীয় যে অর্থ যোগান দিতে হবে এটি সেই সংখ্যাই তুলে ধরছে।
গ্লাসগোতে আমরা এই ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের যোগান দেওয়ার অংশীদার কে কে হবে তা দেখতে পাবো। (স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরেই ৩১ থেকে ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতিসংঘের কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজের বা কপ এর ২৬তম সম্মেলন)। এ অর্থের মধ্যে কি আপনার ব্যাংক, বিমা, মিউচ্যুয়াল ফান্ড ব্যবস্থাপক বা অবসরকালীন তহবিলও পড়বে? তবে এ কথা ঠিক, আপনার টাকারও একটা ভূমিকা রয়েছে। ভবিষ্যতে সব অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে তাদের মুখের কথা দিয়ে নয় বরং তাদের সংখ্যা দিয়ে যাচাই করুন। তাদের আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে দূষণের কতোটা সম্পর্ক রয়েছে, তেল-গ্যাস-কয়লার মতো মজুদ সম্পদের ব্যবহার কতোটা কমিয়েছে, নিঃসরণ বন্ধ করেছে এবং শূন্য নির্গমনের পৌঁছাতে কি ধরণের সময়সীমা নির্ধারণ করেছে ইত্যাদি।
শেষ কথা হলো, মানুষ এবং আমাদের গ্রহের সেবায় নিরেট সুনির্দিষ্ট সন্দেহাতীত সংখ্যাগুলো যাচাই করতে হবে।
[মার্ক কারনেই ব্যাংক অব কানাডা ও ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের সাবেক গভর্নর। ফাইনান্সিয়াল টাইমস থেকে তাঁর নিবন্ধটির বাংলা রূপান্তর করেছেন সৈয়দ মূসা রেজা]